আমাদের কয়েকজন আত্মীয়ের ঢাকায় ছাপাখানা ও প্রকাশনার ব্যবসা ছিল পাটুয়াটুলী, ইসলামপুর, তাঁতীবাজার, বাংলাবাজার, প্যারীদাস রোড, প্রসন্ন পোদ্দার লেন, পাতলা খান লেন প্রভৃতি এলাকায়। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে, ভাষা আন্দোলনের অল্পকাল পরে, পাটুয়াটুলী দ্য বেঙ্গল প্রিন্টিং ওয়ার্কস নামক এক বড় ছাপাখানায় প্রায়ই যেতাম আব্বার সঙ্গে। একদিন সেখানে দেখি, কয়েকজন ভদ্রলোক গল্পগুজব করছেন। ওই প্রেসে মুদ্রিত হয়েছে একটি বই। এর মধ্যে এক ঘি বিক্রেতা সেখানে গিয়ে হাঁক দেন। প্রেস মালিক তাকে ডাকেন এবং একটি পাত্রে সম্ভবত পাঁচ সের (কেজি) ঘি দিতে বলেন। মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন একই ব্যক্তি। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল প্যারাডাইস লাইব্রেরি, যা ছিল বাংলাবাজারে। প্রকাশক যাকে ওই পাঁচ কেজি ঘি উপহার দিলেন, তাঁর নাম সরদার জয়েনউদ্দিন। উপলক্ষ নয়ান ঢুলী নামক একটি গল্পগ্রন্থের প্রকাশ। নয়ান ঢুলীর লেখক জয়েনউদ্দিন।
আজকাল স্রেফ আবর্জনা ধরনের বইয়েরও প্রকাশনা উৎসব হয়। খ্যাতিমান লেখকেরা ঘটা করে টিভি চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে মোড়ক উন্মোচন করেন। রঙিন কাগজের প্যাকেট খুলে বুকের কাছে বইটি ধরে ছবি তোলেন। তারপর একটি পঙক্তি না পড়েও হড়হড় করে বইটির লেখক ও বইটির প্রশংসা করেন। এ কাজটি আমাকেও মাঝে মাঝেই করতে হয়। বলতে হয় : এ বই আমাদের সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। মনে মনে বলা হয় : এই ঘোড়ার ডিম প্রকাশ কাগজ ও কালির স্রেফ অপচয়।
নয়ান ঢুলীর একটি কপি উপহার পেলেন আমার আব্বা। বইটি নাড়াচড়া করে দেখে আমার অভূতপূর্ব অনুভূতি হলো। সেই প্রথম আমি একটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মের ঘ্রাণ উপভোগ করি। সেই থেকেই নতুন বাঁধাই করা বইয়ের ঘ্রাণ নিতে আমার ভালো লাগে। কেমন এক মদির গন্ধ।
ওই প্যারাডাইস লাইব্রেরি থেকেই প্রকাশিত হয় শামসুদ্দীন আবুল কালামের গল্পগ্রন্থ পথ জানা নাই। তার আগেই প্রকাশিত হয়েছিল তার আরেকটি গল্পের বই শাহের বানু। পথ জানা নাই-এর কাগজ, বাঁধাই ও প্রচ্ছদপট ছিল নয়ান ঢুলীর চেয়ে উন্নত। পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে আমার অল্প বয়সেই আমি পথ জানা নাই এবং নয়ান ঢুলী পড়ি।
শামসুদ্দীন আবুল কালাম প্রথম লিখতেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন নামে। আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সঙ্গে নাম মিলে যাওয়ায় বন্ধুবান্ধবের পরামর্শে তিনি নাম পরিবর্তন করেন। শামসুদ্দীনকে আমি তখনো কাছ থেকে দেখিনি। পাটুয়াটুলীতে তিনি তাঁর প্রকাশকের অফিসে যেতেন এবং কখনো যেতেন। বাংলাবাজার প্যারাডাইস লাইব্রেরিতে, যে লাইব্রেরির ম্যানেজার ছিলেন আমাদের পরিবারের একজন। আমার সেই ভাইয়ের কাছেই তাঁর কথা শুনতাম। তাঁকে আমি কাছে দেখি কয়েক বছর পরে আজিমপুর কলোনিতে।
শামসুদ্দীনকে কাছ থেকে না দেখার আরেক কারণ, তিনি আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের কিছুদিন পরেই কোনো এক বৃত্তি নিয়ে অথবা চাকরি নিয়ে ইতালির রোমে যান। পরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) এবং বিশ্বখাদ্য কার্যক্রমে ভালো পদে নিযুক্ত ছিলেন। বিদেশে চাকরি অনেকেই করেছেন, কিন্তু তাঁরা মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় দেশে আসতেন। শামসুদ্দীনের দেশে না আসার একটি কারণও ছিল। তাঁর স্ত্রী তাকে ছেড়ে অভিনেতা ও অসামান্য আবৃত্তিকার গোলাম মোস্তফাকে বিয়ে করেন। তখন মহিলা একটি কন্যাসন্তানের মা। দাম্পত্য জীবনের এই ট্র্যাজেডিতে শামসুদ্দীন প্রচণ্ড আঘাত পান। তাঁর বেদনার কথা তার বন্ধুবান্ধবেরা জানতেন।
শামসুদ্দীন আবুল কালামের প্রথম জীবন থেকে শেষ পর্যন্ত যিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তাঁর নাম আবদুল মতিন। তিনি আমারও অগ্রজপ্রতিম ছিলেন এবং আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। আবদুল মতিন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল। মতিন চৌধুরীর শ্যালক। ঢাকা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় আবদুল মতিন বামপন্থী রাজনীতি এবং প্রগতি লেখক ও শিল্পসংঘের একজন সক্রিয় কর্মী। ছিলেন। তিনি ছিলেন ফজলুল হক হলের ছাত্র। ছোটগল্প, কবিতা লিখতেন এবং ঢাকা-কলকাতার ভালো ভালো পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। পাকিস্তান অবজারভারে কাজ করেছেন। ১৯৬০ সালে তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ষাটের দশকে লন্ডনে পাকিস্তান অবজারভার-এর বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন।
অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ও সজ্জন ছিলেন আবদুল মতিন। তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও শামসুদ্দীন আবুল কালামের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রেখেছেন। ১৯৭১-এর ১০ অক্টোবর প্যারিসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মারা গেলে আবদুল মতিনই প্রথম তাঁর মৃত্যুসংবাদ ঢাকা ও কলকাতায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। তিনি লন্ডন থেকে প্যারিসে গিয়ে আনমারি ওয়ালীউল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন। তখন মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে। কলকাতায় শওকত ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শওকত ওসমান তাঁর বন্ধু ওয়ালীউল্লাহর আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ শুনে প্রায় পাগলের মতো হয়ে যান। ১৬ ডিসেম্বরের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি আমাকে আবদুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়ালীউল্লাহ সম্পর্কে লেখার তাগিদ দেন।
