আবদুল মতিন মাঝে মাঝে রোমে গিয়ে শামসুদ্দীনের সঙ্গে এবং প্যারিসে গিয়ে ওয়ালীউল্লাহর সঙ্গে দেখা করেছেন। শেষ জীবনে শামসুদ্দীনের সঙ্গে তাঁরই সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ছিল। রোমে শামসুদ্দীন প্রায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন। লেখালেখিতেই বেশি সময় ব্যয় করতেন। ওয়ালীউল্লাহর মতো তাঁরও গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল বাংলার গ্রামের মানুষ, যে মানুষদের থেকে তিনি বহুদিন ছিলেন দূরে।
দু-এক বছর পর পর আবদুল মতিন ঢাকায় আসতেন। লন্ডনেও তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ঢাকায় আসতেন একুশের বইমেলার সময়। অনেকগুলো বইও তিনি লিখেছেন। ঢাকায় এলে তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতাম। আমার বাড়িতে হোক বা অন্য কোথাও হোক। রেস্তোরাঁয় তিনি আমাকে খাওয়াতেন। তাঁর কাছে শুনতাম শামসুদ্দীনের রোমের দিনযাপনের কথা। নিতান্ত নিঃসঙ্গ। এক অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকতেন। নিজেই রান্নাবান্না করে খেতেন। তাঁর শেষটি ছিল খুবই করুণ। একা ঘরে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ডাক্তারকে জরুরি ফোনে জানানোর সময় পাননি। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পরে সরকারি লোকজন ঘর থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে। কারও থেকে শুনে আমি তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রচার করি।
কাশবনে কন্যা এবং কাঞ্চনমালা উপন্যাস দুটির জন্যই শামসুদ্দীনের খ্যাতি। একসময় লালসালু, সূর্যদীঘল বাড়ি এবং কাশবনের কন্যার নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হতো। পূর্ব বাংলার গ্রামের দরিদ্র মুসলমানদের জীবনালেখ্য।
নদীমাতৃক পূর্ব বাংলার গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝির পরে আর যে দুটি উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে তার মধ্যে অমরেন্দ্র ঘোষের চর কাসেম এবং অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমার অল্প বয়সে আমি চর কাসেম পড়েছি। অমরেন্দ্র ঘোষও ছিলেন নদীবহুল বরিশালের অধিবাসী। চল্লিশের দশকে বা পঞ্চাশে তিনি বাংলাদেশে খ্যাতিমান ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে গিয়ে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ও মিলনে বিশ্বাস করতেন। কলকাতার মূলধারার হিন্দু কথাশিল্পীরা তাঁকে পছন্দ করতেন না। শুনেছি, তিনি কলকাতায় ছিলেন প্রায় পরবাসী।
অমরেন্দ্র ঘোষের পূর্ব বাংলা থেকে চলে যাওয়ায় পূর্ব বাংলার কথাসাহিত্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার আরেকটি উপন্যাসও প্রশংসিত হয়েছিল : পদ্মদীঘির বেদেনী। পঞ্চাশের শুরুতে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস দক্ষিণের বিল (দুই খণ্ড)। সাম্প্রদায়িকতা একটি বহুমাত্রিক বিষয়। তা যে শুধু অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যেই বিদ্বেষ ও দূরত্ব সৃষ্টি করে তা-ই নয়, স্বধর্মাবলম্বীর মধ্যেও বিভেদ তৈরি করতে পারে। অমরেন্দ্র ঘোষ ছিলেন একজন সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি –অনেকের মতো ছদ্মবেশী অসাম্প্রদায়িক নন। আমাদের এখানে অদ্বৈত মল্লবর্মণকে নিয়ে যথেষ্ট লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু অমরেন্দ্র ঘোষ হারিয়ে গেছেন। আশির দশকে আমি মুক্তধারার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহাকে অনুরোধ করেছিলাম অমরেন্দ্র ঘোষের চর কাসেম পুনর্মুদ্রণের জন্য। তিনি আমাকে বলেছিলেন একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখে দিতে, কিন্তু নানা কারণে আর হয়ে ওঠেনি। চর কাসেম-এর কলকাতায় সংস্করণ হয়েছিল কিন্তু সমাদৃত হয়নি।
শিল্পকর্ম হিসেবে দুর্বল এবং ভাষা সুপাঠ্য না হলেও কাজী আফসারউদ্দিন। আহমদের চর ভাঙা চর উপন্যাসেও ঢাকা অঞ্চলের নদীতীরের মানুষের জীবনের কথা আছে। বই হিসেবে প্রকাশের আগেই মোহাম্মদীতে চর ভাঙা চর ধারাবাহিক বের হয়েছে। তখনই পড়তাম। তিনি ছিলেন মানিকগঞ্জে আমাদের এলাকার মানুষ। ঢাকায় থাকতেন পুরানা পল্টন নিজের বাড়িতে। আমরা নতুন লেখকেরা তাঁর বাড়িতে যেতাম। তাঁর স্ত্রী বেগম জেবু আহমদ শিশুদের জন্য লিখে নাম করেছিলেন। জেবু আহমদ ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ডন-এর সম্পাদক এবং পরে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেনের বোন।
জীবনানন্দ দাশ, অমরেন্দ্র ঘোষ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম বরিশালের অধিবাসী। জীবনানন্দের সঙ্গে শামসুদ্দীনের ব্যক্তিগত পর্যায়ে খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। অমিশুক নির্জন স্বভাবের মানুষ হিসেবে সবাই জীবনানন্দকে জানে। শামসুদ্দীন ছাত্রজীবন থেকেই তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। জীবনানন্দ দ্বারা ছাত্রজীবনে তিনি প্রভাবিত হয়ে কিছুদিন পদ্যচর্চাও করেছেন।
১৯৫৪-র অক্টোবরে দুর্ঘটনায় যখন জীবনানন্দ মারা যান, তখন শামসুদ্দীন ঢাকায়। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমানসহ ঢাকার তরুণ কবি সাহিত্যিকেরা একটি শোকসভার আয়োজন করেন। সেখানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন শামসুদ্দীন। তাতে তিনি বলেছিলেন :
‘বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় প্রথম জীবনানন্দের কবিতা পড়েছিলাম। তারপর কলকাতায় কবিতার পুরোনো সংখ্যাগুলো কেনার জন্য একদিন ‘কবিতা ভবনে’ যাই। তখন বুদ্ধদেব বাবুই প্রথম তার আশ্চর্য কবিত্বশক্তির কথা বারবার উল্লেখ করেছিলেন। স্কুলে পড়ি তখন, ম্যাট্রিক দেব। সেই কালে আমরা দুই বন্ধু তাঁর অনুসরণে কবিতা লেখার প্রয়াস করেছিলাম।’
