সংবর্ধনা সভায় শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কথাশিল্পী রশীদ করীম তাঁর সংক্ষিপ্ত অভিভাষণে বলেছিলেন :
‘শামসুর রাহমানের কবিতা সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে তাঁর কবিতার প্রবল সমসাময়িকতার কথা, যে কারণে পাঠকের সঙ্গে অবিলম্বেই তার যোগাযোগ ঘটে যায়। এটাও তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তার একটি কারণ। গত তিরিশ বছর ধরে আমাদের এই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংকটাপন্ন ঘটনাবলীর কোনো অভাব দেখিনি আমরা। সেই সব মুহূর্তে শামসুর রাহমানের কবিতা প্রায় একজন অভিভাবকের মতোই আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের হৃদয়ে যে আবেগ ও উৎকণ্ঠা স্তব্ধ হয়ে ছিল, তাকে তিনি ভাষা ও প্রাণচাঞ্চল্য দিয়েছেন। জাতির চেতনা শামসুর রাহমানের কবিতার সঙ্গে মিশে গেছে। আবার শামসুর রাহমানের কবিতাও জাতির চেতনার সঙ্গে মিশে গেছে।
‘… কবিতার যে রাজ্যে শামসুর রাহমানের অভিযান, সেই বহির্বিশ্বে তিনি প্রায় দিগ্বিজয়ী। কিন্তু বড় ইচ্ছে হয়, দৃশ্যময়তা, চিত্রময়তা ও গীতময়তার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটু নিবিড় চিন্ময়তা তিনি আমাদের মতো তাঁর অজস্র ভক্ত-পাঠক ও অনুরাগীদের উপহার দেন।’
২১২ সদস্যবিশিষ্ট সংবর্ধনা পরিষদে কবি, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, চিত্রপরিচালক, নাট্যশিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সুফিয়া কামাল, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, হাসান হাফিজুর রহমান, বেলাল চৌধুরী, আখতারুজ্জমান ইলিয়াস, আসাদ চৌধুরী, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, শামসুজ্জামান খান, ইমদাদুল হক মিলন, হুমায়ুন আজাদ, সুভাষ দত্ত, ফজলে লোহানী, রামেন্দু মজুমদার, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমদ, কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, রফিকুন নবী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী প্রমুখ। খাটাখাটনির জন্যও আমার না থেকে উপায় ছিল না।
শামসুর রাহমানের সমসাময়িক যারা সংবর্ধনায় যুক্ত হননি, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ।
সংবর্ধনা উপলক্ষে ব্যক্তিগতভাবে চাঁদাবাজি না করে প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয়েছিল। টাকা দিয়েছিল অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ও ফিলিপস লিমিটেড।
৫০তম জন্মদিন ঘটা করে এবং তাঁর অনুজপ্রতিমদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় অতি সুন্দরভাবে উদ্যাপান হলেও তাঁর ৬০তম জন্মদিন উদযাপন কিঞ্চিৎ বিপত্তি ঘটে। সমসাময়িক কেউ এগিয়ে এলেন না। তাঁর সমসাময়িক ও বন্ধুস্থানীয় কেউ এ কথাও আমাদের বলেন, শুধু কি একজনের জন্মদিনই পালন করবেন?
শামসুর রাহমানের ৬০তম জন্মদিন কিন্তু ২৪ অক্টোবর উদ্যপান হয়নি। একদিন পিছিয়ে আনা হয় –২৩ অক্টোবর। ৬০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও তাঁর সমসাময়িক এবং কথিত বন্ধু অনেকেই যোগ দেননি।
শামসুর রাহমান ছিলেন সৎ, সজ্জন ও নিরহংকার মানুষ। ধান্ধাবাজির লেশমাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। জন্মতারিখটি নিয়ে তাঁর মনে খুঁতখুঁত ছিল। এর মধ্যে কলকাতা থেকে তার এক গুণগ্রাহী বা ভক্ত ঢাকায় আসেন। পঞ্জিকা গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতিতে তার ছিল কিছু জ্ঞান। তাঁর সামনে জন্মদিনের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা ওঠে। কলকাতায় গিয়ে তিনি পাজী-পঞ্জিকা ঘেঁটে এবং জ্যোতিষীদের সঙ্গে কথা বলে জানান, ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবরই পৃথিবীর আলো দেখে থাকবেন শামসুর রাহমান। এখানকার বাংলাবাজারের জ্যোতিষীরাও তাতে সমর্থন দেন। শামসুর রাহমানের জন্মদিন সমাচার সম্পর্কে লিখতে গেলে বসওয়েলের ড. জনসনের জীবনীর মতো একটি প্রকাণ্ড গবেষণাগ্রন্থ লিখতে হয়।
ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের মতো শামসুর রাহমানও বলতেন, ‘আমাকে যখন চোখের সামনে জ্যান্ত দেখতে পাচ্ছেন, তাতে একদিন যে জন্মেছিলাম তাতে কি কোনো সন্দেহ আছে?
শুধু সমসাময়িক হলেই কারও ঘনিষ্ঠ হওয়া যায় না। শামসুর রাহমানের যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরা অনেকে এখনো বেঁচে আছেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে যারা গবেষণা করবেন, তাদের উচিত তাদের থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করা। কোনোক্রমে যেন ভুল তথ্য প্রতিষ্ঠা না পায়। সব মানুষের মতো শামসুর রাহমান শুধু জন্মগ্রহণ করেননি, তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকার জন্য।
২৩. জীবনানন্দ ও শামসুদ্দীন আবুল কালাম
মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্প উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই বিকশিত হয় কলকাতায়। তার সিকি শতাব্দী পরে উনিশ শতকের ষাটের দশকে ঢাকায় খুব ছোট আকারে মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্প যাত্রা শুরু করে। ঢাকায় মুদ্রণ ও প্রকাশনাশিল্পের পথিকৃৎদের মধ্যে ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এবং কবি ও গদ্যলেখক হরিশ্চন্দ্র মিত্র। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গালা যন্ত্র নামক ছাপাখানা থেকে বহু ছোট-বড় বই প্রকাশিত হয় ১৮৬০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। ওই সময়সীমায় আরও অনেক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকায়। কুড়ি শতকের শুরুতে ঢাকায় স্থাপিত হয় মনোমেশিন– সেকালের সবচেয়ে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র। একটি-একটি করে সিসার তৈরি হরফ সাজিয়ে কম্পোজ করার পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রে টাইপ করলেই হয়ে যেত মেশিনেই কম্পোজ। তারপর তা সংশোধন করে প্রয়োজনমতো মেকআপ দিয়ে হতো বই ছাপা। ঢাকায় প্রথম যে ছাপাখানায় মনোমেশিন স্থাপিত হয়, তার নাম আলেকজান্ডার স্টিম মেশিন প্রেস। সেটি ছিল নবাবপুরে। ওই প্রেস থেকে ঢাকায় উন্নতমানের বই প্রকাশিত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষ দশকেই গড়ে ওঠে বাংলাবাজারে বইপাড়া, যেমন কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট ও কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের (বর্তমানে বিধান সরণি) বইয়ের জগৎ।
