রবীন্দ্রনাথের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংবর্ধনার আয়োজনে বাঙালি কবিদের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। উদ্যোক্তাদের সবাই ছিলেন গদ্যলেখক, বিজ্ঞানী ও সামন্ত ভূস্বামী। যেমন প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, বিনয়কুমার সরকার, মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এবং একমাত্র কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। কবি-নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ ছিলেন রবীন্দ্রবিরোধীদের শিবিরে। রবীন্দ্রবিরোধীরা যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পণ্ড করার চেষ্টা করেছিলেন, সে কথা তাঁর জীবনীকার প্রশান্ত পাল লিখেছেন। রবীন্দ্র সংবর্ধনায় কলকাতার একশ্রেণির কবি-সাহিত্যিক সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তাতে রবীন্দ্রনাথ খুবই ব্যথিত হন।
আমাদের কালের বাংলা ভাষার প্রধান কবি যে শামসুর রাহমান, সে প্রশ্নে তাঁর সমসাময়িকদের অন্তর্দাহ থাকলেও কারোরই সন্দেহ ছিল না। তার একশ্রেণির গুণগ্রাহী (তাঁদের নাম আমি বলব না) তার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে সংবর্ধিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সে কথা শামসুর রাহমানকে বলায় তিনিও রবীন্দ্রনাথের মতো প্রীত হন বটে, তবে সংকোচও প্রকাশ করেন। সংকোচটা কৃত্রিমও ছিল না। রবীন্দ্রনাথের যে সমস্যা ছিল না, শামসুর রাহমানের সে সমস্যা ছিল। সমস্যাটি হলো তিনি জানতেন না যে তাঁর জন্মদিনটি কবে।
জন্মোৎসব করতে হলে ব্যক্তিটির জন্মের তারিখটি তো জানতে হবে। যদিও আজকাল অনেকেই কোনো একটা তারিখে জন্মদিন উদযাপন করতে সংকোচ বোধ করেন না। শামসুর রাহমানের এক অনুজপ্রতিম (তার নামও আমি বলব না) পরামর্শ দেন, তার আম্মা কোনো রকমে কাছাকাছি কিছু বলতে পারেন কি না। তার আম্মাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পরে জানান যে, কার্তিক মাসের প্রথম দিকের বুধবার বাচ্চুর জন্ম।
জন্মদিন যে উদ্যপান করার জিনিস, তা শামসুর রাহমানের পরিবারের কেউ জানতেনই না। তাঁর পরম সাদাসিধা স্নেহময়ী আম্মা তো ননই। একটি সূত্রে কার্তিক মাস ও বুধবার পাওয়া যাওয়ার পর তার এক/একাধিক প্রীতিভাজন বাংলাবাজার থেকে লোকনাথ পঞ্জিকা সংগ্রহ করেন। কথিত জ্যোতিষী একজনকে ডেকে আনা হয় দৈনিক বাংলায় শামসুর রাহমানের কামরায়। গুনেটুনে বের করা গেল যে শামসুর রাহমান মর্ত্যধামে চক্ষু মেলেন ১৯২৯ সালের ২৪ অক্টোবর। এটি জানার পর তিনি একটি বিবৃতিমূলক কবিতাই লেখেন : ‘উনিশ শো ঊনত্রিশ সালে চব্বিশ অক্টোবরে/ জন্মেছি ঢাকায় আমি ছায়াচ্ছন্ন গলির ভেতরে/ ভোরবেলা নিম্নমধ্যবিত্ত মাতামহের নিবাসে,’…
[বিচিত্রা, ঈদুল আজহা সংখ্যা, ১৯৮২]
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ অক্টোবরই যদি জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে এবার এবং এর আগেও অনেক বছর যাবৎ তাঁর জন্মদিন ২৩ অক্টোবর উদ্যাপান হয় কীভাবে? অনেকের তিনটে জন্মদিনও থাকে, কিন্তু শামসুর রাহমানের মাত্র দুটি জন্মদিন হলো কেমন করে? অবশ্য সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহরও তিনটে জন্মদিন পাওয়া গেছে, যদিও তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৯২২ সালে। সরকারি কাগজপত্রে তাঁর জন্মদিন ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২২। ওয়ালীউল্লাহর ৬০তম জন্মদিন ১৯৮২-তে বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বরই উদ্যাপন করে।
এবার বাংলা একাডেমি শামসুর রাহমানের ৮৭তম জন্মদিন যথাযথ মর্যাদায় উদ্যাপন করেছে। তার সমসাময়িক কবি-লেখকেরাই ছিলেন বক্তা। আবেগের আতিশয্যে হোক অথবা স্মৃতিবিভ্রাটবশত হোক, ওই অনুষ্ঠানে তাঁর সমসাময়িক এক কবি-কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন : ‘শামসুর রাহমান যখন তরুণ ছিলেন তখনো তাঁর জন্মদিনে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আজও মনে পড়ে, মায়ের কোলে বসে জন্মদিনের খাবার খাচ্ছেন তিনি।’
[সমকাল, কালের কণ্ঠ, প্রথম আলো, ২৪ আগস্ট ২০১৫]
শামসুর রাহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে যারা ঘনিষ্ঠ, তাঁরা জানেন ৫০ বছর বয়সের আগে তাঁর বাড়িতে এবং সারা পৃথিবীর কোথাও তাঁর জন্মদিন পালিত হয়নি। তার আম্মা ছিলেন খুবই পরহেজগার মহিলা। যা তিনি জানেন না, কস্মিনকালেও সে সম্পর্কে বানিয়ে বলতে জানতেন না। শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম সন্তান। পুত্রের জন্মের সময়টি তার মনে ছিল, দিন-তারিখ ভুলে গিয়েছিলেন। যা হোক, তার ৫০তম জন্মদিন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চমৎকারভাবে অনুষ্ঠান করে উদ্যপান হয়। সেদিনের সংবর্ধনার অভিজ্ঞানপত্রে বলা হয়েছিল :
‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। আমাদের মধ্যে কবি তুমি নিঃসন্দেহে। দীর্ঘ তিরিশ বৎসরে তারুণ্য থেকে প্রৌঢ়ত্বে যেতে যেতে অনেকখানি পথ, অনেক বাঁক ও বন্ধুরতা পার হতে হয়েছে তোমাকে, কিন্তু কবিতার রাজতিলক তোমার ললাট থেকে কখনো মোছেনি। আমাদের ব্যক্তিক আনন্দ-সংকটে, জাতির গৌরবে কি দুর্দিনে আমাদের হাতে হাত রেখে চলেছে শামসুর রাহমানের কবিতা। আমাদের আনন্দ গর্ব ও ভালোবাসা তাকে নিয়ে।
‘পঞ্চাশ বৎসর বড়ো কম সময় হলো না, তিরিশ বৎসরের একতী কাব্যচর্চাও এদেশে দুর্লভ। সময় ও সাধনার সিদ্ধিতে যিনি জয়ী, কাল তাকে জয়মাল্য পরাবেই; আমরা যারা তোমার সহগামী, সতীর্থ ও অনুজ, এই উৎসবে শরিক হতে পেরে আমরা নিজভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞ।’
