‘দেশ বিভাগের পর এ দেশে পূর্ববঙ্গের মানুষেরা চলে এসেছিলেন প্রাণ বাঁচাতে। জলস্রোতকেও হার মানানো সেই আসাটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মন থেকে মানতে পারেনি কোনোদিন। এই কিছুকাল আগেও এক জাতি-গোত্রের হলেও শুধু পূর্ববঙ্গীয় বলেই এপারের বাঙালি বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে নারাজ ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষরা এই জনরাশিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।…..
‘স্বাধীনতার পর ১৯৪৭-এ যারা এদেশে এসেছিলেন, সেই লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত তখন তাদের শিশুরা প্রতিনিয়ত শুনে এসেছে তাঁদের দেশ আছে ওপারে। সেই দেশে গোয়ালভরা গরু আর মাঠভরা ফসলের ছড়াছড়ি। সেই শিশু শুনেছে তার ঠাকুদা, ঠাকুর্মা যে ভাষায় কথা বলেন এখানকার মানুষ সেই ভাষায় কথা বলে না। সে দেখছে তার বাবা বাড়িতে যে ভাষায় কথা বলেন বাইরে তা না বলার চেষ্টা করেন। তার রক্তে বুড়িগঙ্গা, পদ্মার জল খলখল করে ঠাকুর্মার সূত্রে। এই ছেলেটি যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। তার ঘঁটি সহপাঠীরা ব্যঙ্গ করে উচ্চারণের এবং সে মনে মনে ভাবে তার দেশ ছিল ওপার বাংলা।…..
‘দেশপ্রেম ইত্যাদি তার কাছে আশা করা যায় না। যে অর্থে মানুষ চাকরি বাঁচাবার জন্যে অফিসের প্রতি অনুগত সেই অর্থেই তার মানসিকতা এদেশের প্রতি কেন্দ্রীভূত। নিজের জায়গা বা বাড়ি মনে না করলে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়ই। টানটা না থাকায়, মমতা না থাকায় ভালোবাসা জন্ম দিতে পারে না।…..
পরবাসীর কাছে স্বাদেশিকতাবোধ আশা করা যায় না।’
[সাকিন-নেই, সমরেশ মজুমদার]
সাতচল্লিশের পর পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দুরা ভারতে গেছে, কিন্তু সবাই কি ‘প্রাণ বাঁচাতে’ গেছে? না গেলে তাদের কি এ দেশে মেরে ফেলা হতো? এই লেখাটির রচনাকাল নব্বইয়ের দশকের শেষ বা এই শতাব্দীর শুরুর দিক। পূর্ব বাংলা থেকে যেসব হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে গেছে, তাদের দেশপ্রেম ও স্বাদেশিকতাবোধ নেই, এই রায় দেওয়া তাদের প্রতি চরম অবিচার ও অসম্মান। তারা ভারত রাষ্ট্রটিকে ভালোবাসে না–তা ভাবাই যায় না। পার্টিশন ও উদ্বাস্তু নিয়ে বাংলা, হিন্দি, উর্দুতে বহু গল্প উপন্যাস লেখা হয়েছে। সাদাত হাসান মান্টো লিখেছেন, ওয়ালীউল্লাহও লিখেছেন; ঋত্বিক ঘটকসহ অনেকে করেছেন অবিনশ্বর ছবি, কিন্তু এই তত্ত্ব বা মারাত্মক মতবাদ কেউ প্রচার করেননি।
মজুমদার পড়াশোনা করে অথবা গবেষণা করে দেখেছেন বাংলাদেশের কবি ও কথাশিল্পীরা ‘বেশ আরবি শব্দ প্রয়োগ করেন’ তাঁদের লেখায়। একজন ভাষাবিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই জানেন ‘সাকিন’ শব্দটি এক শ এক ভাগ আরবি, এর মধ্যে অণু পরিমাণও সংস্কৃত নেই। অথচ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হয়েও তিনি তাঁর রচনার। নামকরণ করেছেন একটি নিখাদ আরবি শব্দ দিয়ে– ‘সাকিন নেই’।
বাংলা ভাষার এই লেখকের এ রচনাটি থেকেই আমরা জানতে পারলাম, একালের পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের কাছে ‘ঢাকার ভাষা যতটা অপরিচিত, হিন্দি তার দশ শতাংশও নয়। বাঙালি ছেলেদের একাংশ [মেয়েদের নয়] হিন্দিতে কথা বলে গর্বিত হয়, যদিও তাতে আমিতাভ বচ্চনের ভঙ্গি মিশে থাকে। হতভাগ্য বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ তাদের প্রিয় বাংলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ভাষায় কথা বলে না, বাংলায় কথা বলে তারা ‘গর্বিত’।
২২. শামসুর রাহমানের জন্মদিন সমাচার
বাঙালির মুখে উচ্চারিত কথা আর তার মনের ভেতরের অনুচ্চারিত কথা দুই রকম, বলতে গেলে একেবারেই বিপরীত। কারও আনন্দের সংবাদে তার অন্তরটায় তুষের আগুন জ্বলতে থাকে। সে আগুন কখনো চাপা থাকে, কখনো দপ করে জ্বলে ওঠে। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্যে হিংসার আগুন আরও বেশি।
৫০ বছর বয়সের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির পরিমাণ বিপুল। যদি তিনি ৪৯ বছর বয়সে মারা যেতেন অথবা আদৌ নোবেল পুরস্কার না পেতেন, তা হলেও তিনি তার সময়ের বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখক ও কবি। যেকোনো মানুষের মতো রবীন্দ্রনাথও প্রশংসা, সম্মান ও স্বীকৃতি পছন্দ করতেন। শান্তিনিকেতনের তার অনুরাগী ও ভক্তরা তাঁর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে সংবর্ধিত করার উদ্যোগ নেন। তাঁদের দেখাদেখি তার বিভিন্ন পেশার বন্ধুরাও তাঁকে সংবর্ধনা ও অভিনন্দন প্রদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ওই উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ মনে মনে খুশি হলেও তাঁর আশঙ্কা হয় সংবর্ধনা উপলক্ষে খরচ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজন হবে টাকার এবং সে জন্য চাঁদা তোলা নিয়ে গোল বাধতে পারে। তার ওই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক ছিল না।
যখন সংবর্ধনার সিদ্ধান্ত পাকা হয়ে যায়, তখন বিনয়বশত রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারকে লিখেছিলেন, এই সমস্ত বাহ্য আড়ম্বরের উদ্যোগ আয়োজনে আমি যে কিরূপ সংকোচ অনুভব করিতেছি তাহা অন্তর্যামীই জানেন।’ অন্তর্যামী সব মানুষের অন্তরের সব কথাই জানেন। কোন ব্যাপারে কে কতটা সংকোচ বোধ করেন আর কতটা সন্তুষ্ট, তা অন্তর্যামীর বিলকুল জানা। রবীন্দ্রনাথের সংকোচটা ছিল এই কারণে যে তিনি তাঁর স্বদেশবাসী ও স্বসম্প্রদায়কে অতি ভালোভাবে জানতেন। তাঁর ভাষায় ‘ঘটা করে তাঁর জন্মোৎসব’ করতে গেলে ব্যয় সংকুলানের জন্য ‘চাদার টাকা লইয়া মনোমালিন্য না হয়েই পারে না। যা হোক, শেষ পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে কলকাতা টাউন হলে ‘পঞ্চাশোর্ধ পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১২ সালের ২৮ জানুয়ারি। যদিও তাঁর জন্মদিনটি ছিল আরও কয়েক মাস আগে– ১৯১১ সালের ৬ মে।
