পাকিস্তানি আমলেওকলকাতা থেকে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক পূর্ববাংলায় এসেছেন বিভিন্ন সভা-সম্মেলন উপলক্ষে অথবা ব্যক্তিগতভাবে বেড়াতে বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। ১৯৫৭-র ফেব্রুয়ারিতে মওলানা ভাসানী আয়োজিত কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ভারত থেকে এসেছিলেন একদল খ্যাতিমান লেখক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ও লেখক হুমায়ুন কবির, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী আবদুল অদুদ, প্রবোধকুমার সান্যাল, নরেন্দ্র দেব, রাধারানী দেবী প্রমুখ। দেবব্রত বিশ্বাসসহ অনেকেই অনেকবার ঢাকায় এসেছেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে।
পাকিস্তান ও ভারতের সম্পর্ক ভালো না থাকায় সেকালে দুই দেশের নাগরিক, বিশেষ করে কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের আসা-যাওয়া সহজ ছিল না। পূর্ব বাংলার প্রকাশিত বইপত্র কলকাতার ব্যবসায়িক কারণে আমদানিকারকেরা নিতে আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু কলকাতার প্রকাশিত বইপত্র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ও চট্টগ্রামে আসত। সুতরাং, কলকাতায় কে কী লিখছেন, তা আমরা পড়তে পারতাম। কিন্তু পূর্ব বাংলার লেখালেখি সম্পর্কে সেখানকার বিদ্বানেরা থাকতেন অজ্ঞ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে দুই দেশের লেখকদের যাতায়াত ও যোগাযোগ বাড়ে। কিন্তু বেদনাদায়কভাবে লক্ষ করা গেল, ওপারের লেখকদের এ দেশের লেখকদের সম্পর্কে নির্ভুলভাবে জানার আগ্রহ কম। অনেকেই, বিশেষ করে যারা গৌণ, তাঁরা এখানকার সম্পর্কে আবোলতাবোল কথা বলেন। অনেকের নামটাও ঠিকমতো উচ্চারণ করেন না। বিখ্যাত কবি কায়কোবাদকে লিখতেন ‘কৈকোবাদ’, স্রেফ ইচ্ছাকৃত বিকৃতি। একটি অতি সোজা নাম শামসুর রাহমান, তাও ঠিকমতো বলেন না; একটু প্রবীণ গোছের যারা তারা কেউ বলেন ‘শাস’, কেউ ‘সামশুর’ কেউবা ‘রহোমান’। একই ভাষাভাষী হওয়া সত্ত্বেও যারা নামটাই শুদ্ধ উচ্চারণ করেন না, তাঁরা তাঁদের লেখা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করবেন, তা কী করে আশা করা যায়?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যখন পাসপোর্ট-ভিসার ঝামেলা ছিল না, বহু বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক বাংলাদেশে আসেন। এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়, মনোজ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ অনেক প্রবীণ ও নবীন, খ্যাত ও অখ্যাত কবি-লেখক। কবি জসীমউদ্দীনের বাসভবন ‘পলাশবাড়ী’ তখন ভারতীয় লেখক-বুদ্ধিজীবীদের সমাগমে প্রাণচঞ্চল। জসীমউদ্দীন আমাকে বললেন, মনোজ বসু ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ঢাকা শহরের দর্শনীয় জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতে। কবির একটি নীল রঙের হিলম্যান বা সস্কোভিচ গাড়ি ছিল। মনোজ বসুকে আমি বলধা গার্ডেন, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, ঢাকেশ্বরী মন্দির, কার্জন হল প্রভৃতি দেখাতে নিয়ে যাই। নজরুল, জসীমউদ্দীনের পুরোনো বন্ধু মনোজ বসুর সঙ্গে কথা বলে প্রীত হই। সরল-সোজা ধরনের মানুষ, মোড়লিপনার লেশমাত্র নেই। তাঁর ভুলি নাই, জলজঙ্গল, বন কেটে বসত, নিশি কুটুম্ব প্রভৃতি উপন্যাস; গল্পের বই বনমর্মর এবং ভ্রমণকাহিনি চীন দেখে এলাম প্রভৃতি ছাত্রজীবনে পড়ে আরাম পেয়েছি। মনোজ বসুর এক লেখায় পড়েছিলাম, ‘যশোরের রাজপুতুরের মতো কই মাছ’, সে কথাটি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতেই জসীমউদ্দীন তাঁর স্ত্রী বেগম মমতাজ জসীমউদ্দীনকে বললেন, ‘ও মনি, মনোজকে তো তাহলে যশোরের বড় কৈ খাওয়াতে হয়। শিগগির তুমি বাজারে পাঠাও। জসীমউদ্দীন তাঁর স্ত্রীকে আদর করে মনি ডাকতেন।
জসীমউদ্দীনের বাড়িতেই প্রথম দেখি প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক খুশবন্ত সিংকে। অনেক পরে আমি দিল্লিতে তাঁর সুজন সিং পার্কের ফ্ল্যাটেও গিয়েছি আমার ছেলে সৈয়দ নাসিফ মাকসুদ সম্পাদিত ইংরেজি ম্যাগাজিন Padma-র একটি কপি এবং গান্ধীবিষয়ক আমার একটি বই তাঁকে দিতে। আমার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে বাহাত্তরে ঢাকায় সত্যজিৎ রায়ের একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার নেওয়ার। আর দুই কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছি। ঢাকা ও কলকাতায় মৃণাল সেনের ফ্ল্যাটে তার সঙ্গে দীর্ঘ কথা হয়েছে। কথা হয়েছে তিনজন বিদগ্ধ ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বুদ্ধিজীবী ভবতোষ দত্ত, অম্লান দত্ত ও অশোক মিত্রের সঙ্গে। ঢাকার এক মাঠের ঘাসে বসে তিন ঘণ্টা গল্পসল্প করার সুযোগ পাই বলতে গেলে অলৌকিকভাবে। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী পরিতোষ সেনের সঙ্গে। তিনি আমাদের ঢাকারই মানুষ। যাদের নাম উল্লেখ করলাম, তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রেই যে সেরা, তাই নন, মানুষ হিসেবেও তাঁরা বড়। আদিখ্যেতা, ভণ্ডামি ও ফোপরদালালি তাঁদের চরিত্রে নেই। পূর্ব বাংলার মানুষ সম্পর্কে তাদের মধ্যে কোনো অশ্রদ্ধাবোধ লক্ষ করিনি।
অন্যদিকে কলকাতার অনেক লেখক এখানে এসে ঢাকা ক্লাব ও বনানী গুলশানের অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর বাড়ির আতিথ্য গ্রহণ করে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের চুটিয়ে প্রশংসা করেন, কিন্তু তাঁদের মনের ভাষা অন্য রকম। বাংলাদেশের শুধু মুসলমানদের নয়, এই ভূখণ্ডের হিন্দুদেরও চালচলন, ভাষার গ্রাম্যতা শুধু নয় তাদের দেশপ্রেম নিয়েও মশকরা ও কটাক্ষ করেন। সেখানকার একালের প্রবন্ধতে শুধু নয়, গল্প-উপন্যাসেও তা দেখা যায়। যেমন একজন লেখকের ভাষায় :
