পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে কুমিল্লায় ঘণ্টাকয়েক অবস্থানকালে বলেছিলেন : ‘পূর্ববঙ্গের অধিবাসীরা নিষ্ঠাবান, দৃঢ়সঙ্কল্প, সরলচিত্ত। এরা বুদ্ধির অভিমানে বিদ্রূপের দ্বারা বড় কথাকে ছোট করে দেয় না।’ ঠাকুর ছিলেন বাঙালির মহত্তম সৃষ্টিশীল প্রতিভা। কথাবার্তা দায়িত্ব নিয়ে বলতেন। কলকাতা থেকে কুমিল্লায় এসে এখানকার মানুষকে ‘খুশি’ করতে পামপট্টি দিয়ে কথা বলার পাত্র তিনি ছিলেন না। ১৯৭২ থেকে পশ্চিমবঙ্গের কিছু লোক মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে অনবরতই বলেন ‘দুই বাংলা এক’– এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি নিম্নমাঝারিদের পক্ষে করা সম্ভব, রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীর পক্ষে নয়। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেছেন, আমরা নিজেদের বাঙালি বলি কারণ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, অন্য কোনো কারণে নয়। অর্থাৎ তামিল, মারাঠি, পাঞ্জাবিদের মতো বাঙালিরা এথনিক বা নৃজনগোষ্ঠী নয়। বাঙালিরা একটি সংকর জাতি। একই রক্ত সবার মধ্যে প্রবাহিত নয়। তার সংমিশ্রণ ঘটেছে বহু জাতির রক্তের।
পূর্ব বাংলার কবি-সাহিত্যিক নবীনচন্দ্র সেন, গিরিশচন্দ্র সেন, দীনেশচন্দ্র সেন, গোবিন্দচন্দ্র দাস, কালীপ্রসন্ন ঘোষ প্রমুখ পশ্চিমবঙ্গের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের থেকে যথাযথ মর্যাদা ও উপযুক্ত স্বীকৃতি পাননি। দীনেশচন্দ্র সেন বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আশাহত হয়েছিলেন এবং গোবিন্দ দাস রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে হতাশ হয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। জোড়াসাঁকো থেকে ফিরে এসে গোবিন্দ দাস লিখেছিলেন, ‘কবিবর রবীন্দ্রনাথের… সহিত প্রায় ঘণ্টাখানেক কথোপকথন হইয়াছিল। তাহার আলাপে সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম বটে কিন্তু একটু গর্বের গন্ধ পাইয়াছিলাম। গর্বটা বঙ্কিমবাবু বা রবিঠাকুর করলে মানায়, কিন্তু কলকাতার নিম্নমাঝারিরা করলে বিরক্তির উদ্রেক না করে পারে না।
পলাশীর যুদ্ধের পর ২০০ বছর বঙ্গের প্রাচীনতম নগরী ঢাকা ছিল অবহেলিত। ওই সময়কালেই কলকাতাকে ব্রিটিশ শাসকেরা গড়ে তোলে এশিয়ার একটি অতি আধুনিক মহানগরী হিসেবে। সেখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা চূড়া স্পর্শ করে। যেকোনো মহানগরীতেই স্থানীয়রা সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার পায়, তাদের ভূমিকা পায় প্রাধান্য। দূরবর্তীরা বঞ্চিত হয় সুযোগ-সুবিধা থেকে। পূর্ব বাংলার মানুষের হয়েছিল সেই দশা। কলকাতার উঠতি বিত্তশালীদের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা দিয়ে পেরে ওঠা কঠিন ছিল। যদিও কলকাতা সমৃদ্ধি লাভ করে পূর্ব বাংলার কৃষকদের টাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলায় একটি নতুন আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে দেখা দেয় স্বশাসিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। পাকিস্তান আন্দোলনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বাত্মক। তাদের স্বশাসিত হওয়ার সেই স্পৃহাকে কেউ যদি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে গালমন্দ করে আনন্দ পান, তাহলে বলার কিছু থাকে না। প্রতিটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের পেছনেই একধরনের সাম্প্রদায়িকতা কাজ করে।
১৯৪৭-এ ঢাকা পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পেলে এখানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে এবং নবজাগরণ ঘটে। কলেজ পর্যন্ত পড়া শিক্ষিত শ্রেণির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। নতুন রাষ্ট্রে সরকারি চাকরিতে ঢোকার সুযোগ আসে। কৃষক শ্রেণি ও নিম্নমধ্যবিত্তদের ভেতর তৈরি হয় একটি মধ্য-শ্রেণি, যারা বই ও পত্রপত্রিকা পাঠ করত এবং সমাজ ও দেশ নিয়ে ভাবত। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে তাদের মধ্যে যেমন ছিল দেশাত্মবোধ তেমনি সুবিধাবাদিতা।
পূর্ব বাংলার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নতুন যাত্রা শুরু হয় অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায়। ১৯৫০ থেকে ঢাকায় তথা পূর্ব বাংলায় শিল্প সাহিত্যের যে চর্চা শুরু হয়, তার সঙ্গে খানিকটা তুলনা করা চলে জার্মানিতে ৪৭ গোষ্ঠী’র শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে। যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত জার্মানির তরুণ একদল লেখক সিদ্ধান্ত নিলেন অতীতের ধারাবাহিকতায়ই নতুন শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতে হবে, তবে তার বিষয়বস্তু, ভাষা ও চেতনা হবে একেবারেই নতুন। ওই গোষ্ঠীর বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন হাইনরিশ ব্যোয়েল, গুন্টার গ্রাস, সিগফ্রিড লেজ প্রমুখ।
১৯৪৭-এর পরে পূর্ব বাংলার শিল্প-সাহিত্যে তাঁদের মতোই ভূমিকা পালন করেন শিল্পী জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শামসুদ্দীন আবুল কালামসহ বহু কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক। তাঁদের সবার সৃষ্টিশীলতার শক্তি সমান ছিল না। তবে বেদনাদায়ক হলো পূর্ব বাংলার বহু উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান হিন্দু পরিবার ১৯৪৭-এর পর স্বদেশ ছেড়ে চিরদিনের জন্য ভারতে চলে যাওয়ায় পূর্ব বাংলার সমাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের হিন্দুবিদ্বেষী রাজনৈতিক আবহাওয়ায় হিন্দুরা নিরাপত্তার অভাব অনুভব করেছেন। তারা খুব সংগতভাবেই মনে করেছেন নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সমাজে তারা যথাযথ মর্যাদা পাবেন না, যদিও এই মাটিতেই তারা মুসলমানদের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করেছেন হাজার বছর।
