বিরল ব্যতিক্রম বাদে, যে রাষ্ট্রের নাগরিকই হোক না কেন, কপটতা ও ছলছলামি বাংলাভাষীদের মধ্যে খুব বেশি। বাংলাদেশের বইয়ের বাজারটা ধরে রাখতে ভারতের অন্য কোনো ভাষার লেখকেরা নন, কলকাতার কিছু লেখক ঢাকায় এসে এখানকার বঙ্গসন্তানদের লেখালেখির খুব সতর্কভাবে উচ্চ প্রশংসামূলক কিছু কথাবার্তা বলেন। তাতে এখানকার সস্তা খ্যাতিলোভী অনেকের খুশির সীমা থাকে না। পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নানা রকম দোষ আছে, কিন্তু ফোপরদালালিতে বাংলাভাষীদের জুড়ি নেই। যে সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই, সে সম্পর্কেও অযাচিতভাবে কথা বলা তার চাই।
হাজারো উদাহরণ দেওয়া যায়, সর্বশেষটি দিতে পারি। গত ১০ অক্টোবর কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের এক বইয়ের দোকানে ‘বাংলা সাহিত্য উৎসব’ নামক এক অনুষ্ঠান হয়েছে। প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় এবং সেখানে কলকাতা ও বাংলাদেশের লেখকদের সঙ্গে বাংলাদেশের উপহাইকমিশনারও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে কলকাতার কথাশিল্পী সমরেশ মজুমদার তার বক্তৃতায় বলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষায় বেশ আঞ্চলিকতার ব্যবহার হয়। আরবি শব্দ প্রয়োগ করা হয়।
মজুমদার মহাশয়ের এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্যের অর্থ যেমন অস্পষ্ট নয়, তেমনি আমার কাছে তা বোধগম্যও হয়নি। তিনি বাংলা সাহিত্য বলেননি, বলেছেন ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’। বাংলা সাহিত্য বলতে তিনি সম্ভবত তাঁদের প্রদেশের লেখকদের সাহিত্যকেই বোঝান। সেই বাংলাদেশে সাহিত্যের ভাষায় ‘আঞ্চলিকতার ব্যবহার’ জিনিসটি কী? তাঁদের দেশের সাহিত্যে কি আন্তর্জাতিকতার ব্যবহার বেশ হয় নাকি?
তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য ও তাঁর ভাষা নিয়ে আরও কিছু মন্তব্য করেন, তাতে যে কারও মনে হতে পারে তিনি সুনীতি চাটুজ্জ্যের চেয়ে কম ভাষাতাত্ত্বিক নন। ওই অনুষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “তিনি [মজুমদার] একপর্যায়ে “জামাই” শব্দটির ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের খোঁচা দেন। তিনি বলেন, “জামাই” শব্দটি তো মেয়ের জামাই বলেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বুঝবেন। কিন্তু বাংলাদেশে জামাই মানে “বর”।
মজুমদার জামাই শব্দটি নিয়ে বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের ‘খোঁচা’ দিতে গিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন, দুই বাংলার ভাষায় ব্যবধান নিয়ে কী তত্ত্ব খাড়া করতে চেয়েছেন, তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের বা যেকোনো স্থানের বাংলা ভাষার কেউ যদি বলেন : ‘বিয়ের দিন জামাইয়ের সঙ্গে তার বন্ধুরাও খেতে বসেছিল।’ এই বাক্যে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের ভাষাগত পার্থক্যটা কী? খোঁচা যদি কেউ কাউকে দিতে চায় এবং সেই খোঁচায় আঘাত পেয়েও যদি কেউ দাঁত কেলিয়ে হাসতে চায়, তা তাদের ব্যাপার। ভাষা নামক বেচারার তাতে কিছুই যায়-আসে না।
আমরা বাংলাভাষীরা অসাম্প্রদায়িকতার ভাণ করে মানুষকে ধোকা দিয়ে খুবই মজা পাই। মজুমদারও মজা পান। ওই অনুষ্ঠানেই তিনি ‘মজা’ শব্দটি নিয়েও ভাষাতাত্ত্বিক পাণ্ডিত্যের প্রকাশ ঘটান। বাংলাদেশের কেউ যখন বলে, এই খাবারটি খুব মজা’, তখন পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা অবাক হয়ে ভাবে, লোকটা বলে কী, খাওয়ার জিনিস আবার মজা হয় কী করে, মজা মানে তো আনন্দ-ফুর্তি।
বাংলাদেশের লেখকেরা আরবি শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করেন –এ এক অতি অসত্য কথা। বাংলাদেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অনেক অমুসলমানের অনুমানপ্রসূত ধারণা যে তারা অবধারিতভাবে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করবেই। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিক তা করেছেন, কিন্তু দেশের মানুষ তা পছন্দ করেনি। বাংলাদেশের কোনো লেখকই খুঁজে খুঁজে আরবি শব্দ তাঁর লেখায় ব্যবহার করেন না। ধারণা করি, মজুমদার বাংলাদেশের কোনো লেখকের লেখাই, তিনি যাদের আতিথ্য গ্রহণ করেন, তাঁদের লেখাও পাঠ করেননি। পাঠ করলে দেখতে পেতেন, বাংলাদেশের লেখকদের ভাষা অন্য যেকোনো অঞ্চলের বাংলাভাষী লেখকদের চেয়ে শুধু সাবলীল নয়, প্রাঞ্জলও।
ঢাকায় যতই বেড়াতে বা জনসংযোগে আসুন, মজুমদার মহাশয়ের ধারণা নেই, কি বিষয়বস্তুর দিক থেকে, কি ভাবের দিক থেকে, কি রচনাশৈলীর দিক থেকে, বাংলাদেশের তরুণ লেখকদের কেউ কেউ যথেষ্ট ভালো লিখছেন। তাঁদের কোনো দিক থেকে আনুকূল্য নেই, প্রচার নেই, পৃষ্ঠপোষকতা নেই। তবে বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে একদিন তাঁদের কেউ নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠা পাবেন।
বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা, ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা এবং যে। এক শতাংশের মাতৃভাষা নয়, তারাও বাংলা বলতে পারেন। বাংলা ভারতের একটি প্রাদেশিক ভাষা। ভারতের প্রাদেশিক ভাষা তামিল, তেলেগু, মালয়ালাম প্রভৃতি। কিন্তু ওইসব ভাষাভাষী মানুষ যতটা জাতীয়তাবাদী পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীরা তা নন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা হিন্দিতে কথাবার্তা বলতে অস্বচ্ছন্দবোধ করে না। কিন্তু তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ, রাজস্থানে নিজেদের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার হয় না। বাংলাদেশের লেখকদের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের উপদেশমূলক মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়।
২১. বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা বাঙালির সাকিন
১৯৪৭ সালের বহু আগে থেকেই পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য পার্থক্য ছিল। সে পার্থক্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এমনকি ধর্মীয়। পূর্ব বাংলা মুসলমানপ্রধান ও কৃষিভিত্তিক, এখানকার বাঙালি সংস্কৃতিতে ইসলামি উপাদান বেশি। পশ্চিমবঙ্গ হিন্দুপ্রধান, সেখানকার সংস্কৃতিতে হিন্দুধর্মের উপাদান বেশি থাকাই স্বাভাবিক। পূর্ব বাংলার মানুষের কথাবার্তা, চালচলন ও মনমানসিকতা পশ্চিমবঙ্গীয়দের থেকে আলাদা। কোন দিকেরটা বেশি ভালো, তা নিয়ে তর্ক করা গ্রাম্যতা, যারটা তার কাছে ভালো।
