আমি বুঝতে পারলাম আনন্দবাজার-এর প্রতিনিধি এতটুকু রিপোর্ট নিশ্চয়ই পাঠাননি, সম্ভবত দেরিতে গেছে বলে কাটছাঁট করে এইটুকু ছেপেছেন, পরদিন বিস্তারিত থাকবে। কলকাতার আরেকটি গৌণ কাগজেও শওকত ওসমানের মৃত্যুসংবাদ একটুখানি বেরিয়েছিল। পরদিন আগ্রহ নিয়ে সব পত্রিকা তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। শওকত ওসমানের নামগন্ধ নেই। ভাবলাম, রোববারের সাহিত্য সাময়িকী বিভাগে থাকবে তাঁর সম্পর্কে লেখা। না, কোথাও কিছু নেই। আনন্দবাজারসহ কয়েকটি বড় কাগজের সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার জানাশোনা ছিল। কেউ কেউ অনেক দিনের বন্ধু। কোথাও কোনো লেখা না থাকা সম্পর্কে একজনকে বললাম, তিনি বললেন, ‘হতে পারেন “শৈকত সাহেব” বাংলাদেশের কবি, এখানে তাঁর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে কী হবে?
শওকত ওসমানের জন্ম হুগলী জেলার এক গ্রামে। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। চল্লিশের দশকেই তিনি কলকাতায় লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে যুক্ত। অবিচল অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ছিলেন এবং লেখালেখি করেছেন। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের বিয়োগাত্ম ঘটনার পর ভারতে চলে যান এবং প্রায় এক দশক ভারতেই ছিলেন।
তাঁর মাতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গে সত্তর ও আশির দশকে তাঁর অবস্থান সুখকর ছিল না। হুমায়ুন কবির ও আতোয়ার রহমান প্রতিষ্ঠিত চতুরঙ্গ পত্রিকার অফিসে থাকতেন এবং অতি কষ্টে জীবনযাপন করেছেন। স্টোভে কোনো রকমে নিজে রান্না করে খেতেন। তাঁর দিনলিপি লেখার অভ্যাস ছিল। সেই দিনগুলোর কথা তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখে গেছেন। মুখেও তিনি অনেক সময় আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন। একদিন দেশ পত্রিকা অফিসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও পূর্ণেন্দু পত্রীর রুমে যান। তাঁরা তাঁকে চিনতেন। গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ বসতে বললেন না। পূর্ণেন্দু পত্রী শুধু বললেন, ‘কেমন আছেন ওসমান সাহেব?’ সেই যে তিনি ওখান থেকে চলে আসেন, আর কোনো দিন ও-মুখো হননি।
শওকত ওসমানই একমাত্র বাঙালি মুসলমান লেখক, যার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব খ্যাতিমান লেখকের ব্যক্তিগতভাবে জানাশোনা ছিল। তাঁর মৃত্যুতে সেখানকার কেউ তাঁর সম্পর্কে কয়েক পঙক্তি লেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। শুধু তিনি নন, বাংলাদেশের কারও সম্পর্কেই নন।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন লেখক মারা গেছেন। তাঁদের সবারই কলকাতায় বা দিল্লিতে রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধব ছিলেন। যেমন জীবদ্দশায় তেমনি মৃত্যুর পরে কেউ তাদের স্মরণ করে দুই লাইন লেখেননি।
রশীদ করীম কোনো সামান্য কথাশিল্পী নন। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ। তাঁর শিক্ষাজীবনও কলকাতায় এবং লেখকজীবনের শুরুও কলকাতায়। ‘৪৭-এর বেশ পরে শওকত ওসমানের মতো তিনিও স্বদেশ ছেড়ে ঢাকায় আসেন। তাঁর উপন্যাস উত্তম পুরুষ, প্রসন্ন পাষাণ, আমার যত গ্লানি প্রভৃতি সুখপাঠ্য এবং আধুনিক ফিকশন। তাঁর বাড়িতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রভৃতি এসে খানাপিনা করেছেন এবং আড্ডা দিয়েছেন। একবার তেমন আয়োজনে শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমিও ছিলাম। রশীদ করীম ছিলেন সুশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমান এবং মার্জিত স্বভাবের মানুষ। মতামত প্রকাশে স্পষ্টভাষী। কাউকে তোয়াজ করে কথা বলতেন না। সুনীলবাবুর সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক বিষয়ে অনেক ব্যাপারে মতপার্থক্য ছিল। সে যা-ই হোক, পশ্চিমবঙ্গের পাঠকেরা যে রশীদ করীমকে চেনেন, সে ভরসা কম। কিন্তু সেখানকার লেখকদের তাঁর সম্পর্কে জানা উচিত, কারণ তিনি বাংলাদেশের একজন প্রধান ঔপন্যাসিক। তাঁর মৃত্যুসংবাদটাও ওখানে কোনো পত্রিকা ছাপেনি দুই লাইনে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে বিশিষ্ট যারা গত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল, আহমদ শরীফ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন প্রমুখ রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিক ও তাদের পত্রপত্রিকা তাদের স্মরণ করে ছোটখাটো প্রবন্ধ-নিবন্ধ বা স্মৃতিচারণামূলক রচনা লেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। শামসুর রাহমানের বহু গুণগ্রাহী কলকাতায় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কিঞ্চিৎ লিখেছিলেন দু-একজন, তবে তাঁর মতো কবির যা প্রাপ্য, তার পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগও নয়। তিরিশের কবিদের পরে শামসুর রাহমানের চেয়ে বড় কবি বাংলা ভাষায় আর কে আছেন, আমার জানা নেই।
বাংলাদেশের সাহিত্যসমাজ পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যসমাজকে সহোদর ও সহযোগী মনে করে। ওখানকার অত্যন্ত গৌণ কবি-সাহিত্যিকেরাও ঢাকায় এলে তাঁদের অতি সমাদর করা হয়। ইদানীং রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশেরও অনেকে কলকাতায় গেলে কল্কে পান। জীবদ্দশায় তা যে তারা পাচ্ছেন, তাতেই তারা খুবই প্রীত ও গর্বিত। তা-ও ভালো, কারণ মৃত্যুর পরে কেউ তাদের মনে করবে না।
বাংলাদেশের সাহিত্যসমাজ ও মিডিয়ার মাত্রাজ্ঞান নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন তোলেন, তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের অতি গৌণ কেউ চোখটা বুজতে না বুজতেই বাংলাদেশে তাদের নিয়ে হাহাকার শুরু হয়। চব্বিশ ঘণ্টা না যেতেই অনেক কাগজ ফেঁদে বসে প্রকাণ্ড প্রবন্ধ। গত কয়েক মাসে এমন কেউ কেউ গত হয়েছেন, বাংলাদেশের পাঠকের কাছে তাঁদের অনেকের নামটাও পরিচিত নয়, কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে হপ্তা না পেরোতেই এমন সব সন্দর্ভ রচিত হয়েছে, যেন তাদের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের এক স্তম্ভ ধসে পড়ল। এসব আদিখ্যেতায় সাহিত্যের কোনো উপকার হয় না। বরং ক্ষতিই হয় –দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি। মনে হয়, কলকাতার লেখকেরা বাংলাদেশে নিয়োগ দিয়েছেন তাঁদের অবৈতনিক পিআরও বা জনসংযোগ কর্মকর্তা।
