নানা কারণে অনেকেই হারিয়ে যান, যদিও একসময় তারা খ্যাতি অর্জন করেন। ছোটবেলায় কাজী দীন মোহাম্মদ নামের একজন লেখককে জানতাম। তাঁর বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জে। তাঁর একটি বই গোলকচন্দ্রের আত্মকথা ছোটোবেলায়
আমাদের বাড়িতে দেখেছি। তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তরকে অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। লেখার হাত ছিল, কিন্তু নিষ্ঠা নিয়ে বেশি দূর যাননি। তাঁর একটি ছোটগল্প ‘জাঁদরেল উকিলের জীবনালেখ্য’। শিল্পকর্ম হিসেবে বাংলা সাহিত্যের সেরা লেখকদের বহু গল্পের সঙ্গেই তুলনীয়। আমি গল্পটি থেকে সামান্য অংশ উদ্ধৃত করছি :
‘আমার এ পরম উপভোগ্য জীবনালেখ্য শঙ্কাহীন চিত্তে দর্শকের সম্মুখে হাজির করিতে আমি নিজে কেন প্রবৃত্ত হইলাম, প্রথমেই তাহার জবাবদিহি করা জরুরি মনে করিতেছি। …আমি রামা, শ্যামা বা করিম, রহিম নহি, আমি প্রভাময় রত্নবিশেষ, নিভৃত স্থানের কুসুম।
‘এ পোড়া দেশের সাহিত্যিকেরা ইদানীং প্রেমিক-প্রেমিকার ট্র্যাজেডি বা কমেডিপূর্ণ জীবনী লিখিয়াই তাহাদের কর্তব্য সমাধা করিতেছেন। সুতরাং আমার জীবনালেখ্য অঙ্কনে যে সাহিত্যিকেরা কেহ হাত বা মন দিবেন সে ভরসা কম। এই কারণেই এই বিংশ শতাব্দীর বাংলার সংস্কারপ্রয়াসী শ্ৰীমুকুন্দ দাস তাহার বাউল যাত্রার সুরে গাহিয়া বেড়াইতেন–
‘এ দেশের এডিটর খবর রাখে ক’জনার?
রামা আজ দিল্লী যাবেন, শ্যামা যাবেন কাছাড়,
স্টারে নাচবেন কুসুমসুন্দরী, বাহ্বা খবরের বাহার!
‘আমি উকিল। উকিলদের বৃত্তিটা সুযোগসন্ধানী। ইহারা যথাসময়ে যথারীতি “হয়”কে নয় এবং “নয়”কে “হয়” করাতে পারেন।
‘…আমি উকিল। আমি হিন্দু না মুসলমান, সে প্রশ্ন কেহ করিবেন না। কবি নজরুলের ভাষার অনুকরণে আপনাদিগকে ভাবিতে হইবে–
‘হিন্দু না মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল জাদরেল উকিল, সন্তান মোর মার।
‘ভূমিষ্ঠ হইবার পর মুহূর্তে বাবা আমাকের আঁতুড়ঘরে দেখিতে আসিয়া নাক সিটকাইয়াছিলেন। এ কথা পরে আমি মায়ের কাছে শুনিয়াছি। বাপের নাক সিটকানো আঁতুড়ঘরের আশীর্বাদ। সুতরাং আঁতুড়ঘর হইতে বাবা বাহির হইতে না হইতেই নাকি একজন ভ্রাম্যমাণ জ্যোতিষী আসিয়া হাজির হইলেন। উঠানে পা দিয়াই তিনি নাকি বকিতে আরম্ভ করিলেন, “এ বাড়িতে একটি পুত্রসন্তান জন্মেছে। বড়-কপালে। সিংহলগ্নে ভূমিষ্ঠ হয়েছে-লগ্নের দশম স্থানে তার পাঁচটি গ্রহের সমাবেশ হয়েছে। এ ছেলে একটা জাদরেল কিছু না হয়ে যায় না। ছয়টা গ্রহের সমাবেশ হলে তো গ্রহের ঠেলার চোটে একেবারে পাগল হয়ে যেত। পাঁচটা গ্রহ জীবন-ভর একে খুঁচিয়ে নিয়ে বেড়াবে, একেবারে কাজ পাগলা করে তুলবে।” জ্যোতিষীকে আমার বাবার মা দুইটি টাকা দিয়া বিদায় করিয়াছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস আছে দেখিয়া কেহ যেন মনে না করেন যে আমি হিন্দু। কারণ এমন শুভমুহূর্তে মুসলমানেরাও জ্যোতিষীর গণনার মর্যাদা রক্ষা করিয়া থাকেন।
‘বাবার নাক সিঁটকানো আমার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দাঁতখিচুনিতে পরিবর্তিত হইল। আমার নিজের যখন দাঁত উঠে নাই সেই বয়স হইতে এক প্রকার দাঁতখিচুনি খাইতে শুরু করিয়াছি। এখন দাঁতখিচুনি প্রুফ হইয়া গিয়াছে। ওটা আর এখন গায়ে বিদ্ধ হয় না।
[জাঁদরেল উকিলের জীবনালেখ্য]
কাজী দীন মোহাম্মদ ছিলেন দুজন। আমি প্রথমে মনে করতাম তাঁরা একই ব্যক্তি। কিন্তু দুই কাজীর নামের বানানে সামান্য পার্থক্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর লিখতেন কাজী দীন মুহম্মদ। কথাশিল্পীর নামের বানান কাজী দীন মোহাম্মদ। ইনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। সাহিত্যসমাজের বাইরে নিজের জগতে নিভৃতে থাকতেই পছন্দ করতেন। দু-একবার তাঁকে কবি জসীমউদ্দীনের বাসভবন কমলাপুরের ‘পলাশ বাড়ী’তে দেখেছি। তার লেখার হাত ছিল। কিন্তু বাঙালি মুসলমান অনেকের যা হয়, সাধনা অব্যাহত রাখতে পারেন না। তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন চল্লিশের দশক পর্যন্ত। তার আরেকটি বই, সম্ভবত কিশোর উপন্যাস কেনাই ডাকু।
শৈশব-কৈশোরে যাদের লেখা পড়ে বড় হয়েছি, তাঁরা অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জসীমউদ্দীন নন; কিন্তু একটি শূন্যতা পূরণের কাজ তারা করেছেন। তাঁরা যে খুব বড় কিছু, সে রকম ধারণা তাঁরাও পোষণ করতেন না।
২০. সাহিত্যজগতের আদিখ্যেতা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ ও আমি কলকাতায় বেড়াতে গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচিহ্নগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে। আমরা কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রায় সব বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা কিনতাম। বাংলাদেশের তুলনায় ভারতে দৈনিক পত্রিকা খুব সস্তা। একদিন সকালবেলা পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ভেতরের পাতায় পাত্রী-পাত্র চাই প্রভৃতি বিজ্ঞাপনের পাশে ছোট্ট একটি খবর দেখে চকিত হই। আমার পিতৃপ্রতিম কথাশিল্পী শওকত ওসমানের মৃত্যুসংবাদ। তাকে গুরুতর অসুস্থ দেখে গিয়েছিলাম। বাঁচার আশা ছিল না। ঢাকা থেকে পাঠানো আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদদাতার সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি ছিল এ রকম :
‘বাংলাদেশের কবি ও লেখক শওকত ওসমান গতকাল মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন কারণ তাঁর বাবার মৃত্যুতেও তিনি শোক প্রকাশ করেছিলেন।’
