দৈনিক পাকিস্তানে নারী সাংবাদিকেরাও কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রিপোর্টিংয়ে হাসিনা আশরাফ খুব নাম করেছিলেন। তিনি ছিলেন দৈনিক পাকিস্তান-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আলী আশরাফের স্ত্রী। আবুল কালাম শামসুদ্দীনের নেতৃত্বে দৈনিক পাকিস্তান উপমহাদেশের একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিকে পরিণত হয়।
সাংবাদিকতার অবসরে আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহিত্যচর্চা করেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চা মধ্যপ্রাচ্যপন্থী ছিল না। তবে আদর্শের দিক থেকে তিনি ছিলেন মুসলিম প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী। তাঁর দৃষ্টিকোণ প্রবন্ধগ্রন্থটি ১৯৬০-এ প্রকাশ করেছিল ইস্ট বেঙ্গল পাবলিশার্স, পঞ্চাশের দশকের খ্যাতিমান সাহিত্যের বইয়ের প্রকাশক। বইটি সেকালে খুবই পঠিত ছিল। তুর্গেনিভের অনুবাদ হলেও গল্পগ্রন্থ ত্রিস্রোতা এবং উপন্যাস খরতরঙ্গ চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে খ্যাতি অর্জন করেছিল।
ইস্ট বেঙ্গল পাবলিশার্সে আব্বার সঙ্গে বইপত্র কিনতে যেতাম পঞ্চাশের শেষ দিকে। ষাটের শুরু থেকে যেতাম আমি নিজেই। ভালো ভালো বই পাওয়া যেত। মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের ভাষা ও সাহিত্য, আবুল ফজলের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা, রণেশ দাশগুপ্তের উপন্যাসের শিল্পরূপ, ইবনে ইমামের জলেস্থলে ও চিত্রবিচিত্র সেখান থেকেই কিনেছিলাম। সেকালে বইয়ের দোকানের ম্যানেজারের সঙ্গেও কথা বলতে ভালো লাগত। কাপড়চোপড় বা সোনার দোকানের সেলসম্যান আর বইয়ের দোকানের সেলসম্যানকে একরকম মনে হয়নি। সেকালে অনেক সেলসম্যানকে দেখতাম ক্রেতা না থাকলে তারা বসে বসে বই পড়ছেন। খুবই অল্প বেতনের ওই কর্মচারীদের বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ছিল।
ভাষাবিজ্ঞানী ও ধ্বনিতত্ত্ববিদ মুহম্মদ আবদুল হাই যে অতসী নামে একটি ছোটগল্পের বই লিখেছিলেন, তা মানুষ ভুলেই গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অত্যন্ত যোগ্য শিক্ষক ছিলেন প্রফেসর হাই, মানুষ হিসেবেও ছিলেন সৎ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তিনি ছিলেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান। তাঁর স্বার্থান্বেষী সহকর্মীরা কিছু টাকাপয়সা-সংক্রান্ত মিথ্যা অপবাদ রটান তাঁর সম্পর্কে। তা তাঁর কানে যাওয়ায় তিনি খুবই বিব্রত ও মর্মাহত হন। সম্ভবত দুশ্চিন্তা নিয়ে অন্যমনস্কভাবে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন। ট্রেনের ধাক্কায় ১৯৬৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যু ছিল বাংলা বিভাগের জন্য শুধু নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি।
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কাজী আবুল হোসেন ছিলেন একজন জনপ্রিয় উপন্যাস লেখক। বহু উপন্যাস তিনি লিখেছেন, যা অনেকেই বলবেন ‘সস্তা, কিন্তু সেকালে ছিল বহুপঠিত। তাঁর উপন্যাসগুলোর বেশির ভাগই বেরিয়েছিল ইসলামিয়া লাইব্রেরি থেকে। তিনি বসতেনও সেখানে। আমি আব্বার সঙ্গে গিয়ে সেখানে তাঁকে দেখেছি। তিনি যে কোনো প্রভাবশালী লেখক নন, সে বোধ তাঁর ছিল এবং ছিলেন অমায়িক ও সজ্জন। ইস্ট বেঙ্গল প্রকাশ করেছিল কাজী আবুল হোসেনের উপন্যাস বনজ্যোৎস্না, চমৎকার লেখা, নামটিও তেমন সুন্দর। তার সতীনের ঘর কিনেছিলাম ইসলামিয়া লাইব্রেরি থেকে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরী নামের একজন কবি ও কথাশিল্পী ছিলেন। তাঁর বেশ কয়েকটি গল্প ও কবিতার সংকলন ছিল। বাণ নামে তার একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছিল ইস্ট বেঙ্গল। তার আরেকটি উপন্যাস প্রেম পরিণয়। ইস্ট বেঙ্গলই বের করেছিল শাহেদ আলীর ছোটগল্পের সংকলন কৃষ্ণপক্ষ, যদিও তিনি বিখ্যাত তার জিব্রাইলের ডানার জন্য। জিব্রাইলের ডানা পড়ে সত্যজিৎ রায় প্রশংসা করেছিলেন এবং এই গল্পের অবলম্বনে ছবি করা যায়, সে মন্তব্যও নাকি করেছিলেন। শাহেদ আলীর আরেকটি গল্প সংকলন একই সমতলে। শাহেদ আলী ইসলামপন্থী ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে কোনো রকম গোঁড়ামি ছিল না, সংস্কারও নয়। তাঁর সম্পাদনায় ইসলামিক একাডেমি (বর্তমানে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন) থেকে প্রকাশিত হতো শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকা সবুজ পাতা ষাটের দশকে এবং স্বাধীনতার পরেও। সেটি ছিল একটি পরিচ্ছন্ন চমৎকার সাময়িকী। সবুজ পাতা তৈরি করেছে বহু লেখককে। সেটি যে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পত্রিকা, তা মনে হতো না। সত্তরের দশক পর্যন্ত সবকিছুতেই উন্নতমানকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। বই ও পত্রপত্রিকায় ছাপার ভুল সেকালে খুব কমই হতো।
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে মুসলমানদের অনেকেই গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনায় মনোযোগ দেন। চট্টগ্রামের মাহবুব-উল আলম নজরুলের সঙ্গে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তাঁর মোমেনের জবানবন্দী একটি আত্মজৈবনিক রচনা। বইটি একসময় খুবই পরিচিত ছিল এবং পঠিত হতো। আমি আমার কৈশোরে বইটি পড়েছি এবং কিছুকাল আগেও পড়ে দেখেছি, সাহিত্যকর্ম হিসেবে তার মূল্য রয়েছে। ছোটগল্পও তিনি লিখেছেন। তবে উপন্যাস বা উপন্যাসধর্মী ‘মফিজন’ প্রশংসিত হয়েছিল।
চিন্তাশীল লেখক হিসেবেই আবুল ফজলের খ্যাতি। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের তিনি একজন। তবে তিনিও অনেক গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর উপন্যাস চৌচির ও জীবন পথের যাত্রী বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের সমস্যা নিয়ে রচিত। আবুল ফজল ছিলেন আমার খুবই শ্রদ্ধাভাজন। তিনি আমাকে বলেছেন, মধ্য পঞ্চাশে প্রকাশিত রাঙা প্রভাত উপন্যাসটি তাঁর সেরা রচনা। তিনি সমাজসচেতন ও বক্তব্যপ্রধান লেখক, ভাষার দিকে মনোযোগ দেননি। তাঁর চিন্তাশীল প্রবন্ধগুলো গুরুত্বপূর্ণ, গল্প-উপন্যাস পাঠকপ্রিয় হয়নি।
