যে ভৌগোলিক অবস্থানে আজকের বাংলাদেশ, যার রাজনৈতিক রূপ গ্রহণ করতে শুরু করে ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে, তারপর ১৯৪৭-এ এক চরিত্র গ্রহণ করে এবং ১৯৭১-এ যে স্বয়ংসম্পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্রের রূপ গ্রহণ করে, তার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন আবুল মনসুর আহমদ : ছোট এবং বড়, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ, দু’রকম ভূমিকাই তিনি পালন করেছেন। আমি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে চাই, যদি ১৯৪৭-এর পর খাজা নাজিমুদ্দিনদের হাতে ক্ষমতা না থেকে আবুল মনসুর ও তার সমধর্মীদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হতো, অন্তত তাঁদের পরামর্শ গৃহীত হতো, তাহলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতো– সমাজ হতো সাম্প্রদায়িকতামুক্ত। অনুরূপভাবে ১৯৭১-এর পর যদি তাদের পরামর্শে বাংলাদেশ শাসিত হতো তাহলে ‘সোনার বাংলা না হোক অন্তত শান্তিতে বসবাসযোগ্য এক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হতো। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় একটি দশক জীবিত ছিলেন তিনি, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাকে শ্রদ্ধা করেছেন কিন্তু তার পরামর্শ গ্রহণ করার প্রয়োজন মনে করেননি তাঁর পুত্রপ্রতিম শেখ মুজিব। আবুল মনসুরের মতো মধ্যপন্থী মানুষ প্রগতির জন্য কখনোই বাধা নন, কারণ তাঁরা রক্ষণশীল হতে পারেন কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল নন –তাঁরা মুখর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ও সকল রকম অন্যায়-অবিচার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে।
সুতরাং তাদের চিন্তা, মেধা, প্রজ্ঞা ও মানবপ্রেম একটি জাতি গঠনে অত্যন্ত প্রয়োজন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা। আবুল মনসুর আহমদ এই নীতিগুলোর কোনোটারই বিরুদ্ধে ছিলেন না। সমাজতন্ত্রী তিনি ছিলেন না, কিন্তু সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কোনো কর্মসূচির তিনি বিরোধিতা করতেন না। আর গণতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ তিনি ছিলেন পুরোপুরি।
দুই
যে স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭১-এ অভ্যুদয় ঘটে, তা একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের প্রস্তুতি অনেক দিনের এবং সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ছিল জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বহু মানুষের। নিজস্ব ভূখণ্ডে স্বশাসিত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা, তা এই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে সুপ্ত ছিল, তাকে জাগিয়ে তোলার জন্য অসংখ্য মানুষ বিচিত্রভাবে কাজ করেছেন। সেই ভূমিকা সবচেয়ে বেশি পালিত হয়েছে সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে।
ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের অধিবাসী আবুল কালাম শামসুদ্দীন ১৯২০ ২১ সালে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন এবং তার পরপরই ক্ষণজীবী মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক মোহাম্মদীতে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পিছিয়ে থাকা মুসলমানসমাজকে কীভাবে সচেতন করে তোলা যায়, সে জন্য তিনি সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চাকে বেছে নেন। প্রচারণামূলক ও মননশীল রচনা শুধু নয়, বিদেশি ক্ল্যাসিক সাহিত্য, বিশেষ করে রুশ লেখক তুর্গেনিভের অনেক রচনা তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। তাতে তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। তবে সাংবাদিকতাকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তিনি বাস্তবিক পক্ষে বাংলাদেশে আধুনিক সাংবাদিকতার অন্যতম জনক। দৈনিক ছোলতান, দৈনিক আজাদসহ কয়েকটি কাগজে তিনি সম্পাদক ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ষাটের দশকের শুরুতে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক জেহাদ। দৈনিক জেহাদ ছিল আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের সমর্থক কাগজ, তাতে আবদুল গাফফার চৌধুরী, নির্মল সেন প্রমুখ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকেরা চাকরি করতেন। সেটি ছিল একটি আধুনিক দৈনিক। পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছিল অল্প দিনে, কিন্তু বছর দেড়েকের মধ্যে দৈনিক জেহাদ বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৬৪ সালে আইয়ুব সরকার প্রতিষ্ঠিত প্রেস ট্রাস্ট অব পাকিস্তান প্রকাশ করে দৈনিক পাকিস্তান– বাংলা ভাষার একটি সর্বাধুনিক কাগজ। আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, সানাউল্লাহ নূরী, ফজল শাহাবুদ্দিনসহ আধুনিক বহু কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দৈনিক পাকিস্তানে যোগ দেন, যাদের প্রায় সবাই ছিলেন কমবেশি প্রগতিশীল ঘরানার মানুষ। আবুল কালাম শামসুদ্দীন ১৯৭১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত দৈনিক পাকিস্তান-এর সম্পাদক ছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান-এর সাংবাদিকতার মান ছিল খুবই উন্নত। ছাপা হতো আধুনিক যন্ত্রে। পৃষ্ঠাও ছিল উপমহাদেশে বাংলা ভাষার যেকোনো দৈনিকের চেয়ে বেশি।
দৈনিক পাকিস্তান-এর মহিলা বিভাগটি ছিল উঁচুমানের। সেটি সম্পাদনা করতেন মাফরুহা চৌধুরী। তিনি একজন ছোটগল্পকার হিসেবে ষাটের দশকে খ্যাতিমান ছিলেন। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলোর মধ্যে অরণ্য গাঁথা ও অন্যান্য গল্প, কোথাও ঝড়, স্থলিত নক্ষত্র, বিদীর্ণ প্রহর প্রভৃতি নাম করেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কবি তালিম হোসেনের স্ত্রী। তিনি এবং কবি আহসান হাবীব এক কামরায় বসতেন। কবি-লেখকেরা লেখা নিয়ে তাদের কাছে যেতেন। সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হতো। নতুন লেখকদের তারা পরামর্শ দিতেন। একটি চমৎকার সাহিত্যিক পরিবেশ ছিল। দৈনিক পাকিস্তান-এর মহিলামহল অনেক নতুন লেখিকা তৈরি করেছে।
