আবুল মনসুর আহমদ পূর্ব বাংলার গ্রামীণ মুসলমানদের জীবনের রূপকার। তাঁর গদ্য পরিশীলিত নয়, তিনি বিষয়বস্তুর ওপর বা বক্তব্যের ওপর জোর দিয়েছেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলের গ্রাম্য শব্দ তিনি বেশি ব্যবহার করেছেন, শুধু সংলাপে নয়, ন্যারেশনেও। তবে সব ক্ষেত্রে সে ব্যবহার যথোপযুক্ত হয়নি। ভাষার প্রশ্নে তাঁর নিজস্ব বক্তব্য ছিল। তাঁর সঙ্গে অনেকেই একমত নন। অবশ্য তাতে তার গুরুত্ব কমে না। যে থিসিস তিনি দেবার চেষ্টা করেছেন তা বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্য আর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যের ভাষা কখনোই হুবহু এক হবে না।
আবুল মনসুরের চিন্তাধারার সঙ্গে আমরা ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে বাঙালি মুসলমানসমাজের অনেক চিহ্নিত প্রগতিশীলদের চিন্তায় যে অসংগতি লক্ষ করা যায় তার মধ্যে তা অনুপস্থিত। তিনি গা বাঁচিয়ে অথবা চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে কথা বলতেন না। যা ভাবতেন একান্তে তাই ব্যক্ত করতেন প্রকাশ্যে সকলের মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সম্মেলন ১৩৫১-তে (১৯৪৪) মূল সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন :
‘ধর্ম ভূগোলের সীমা ছাপিয়ে উঠতে পারে, কিন্তু তমদ্দুন ভূগোলের সীমা এড়াতে পারে না, বরঞ্চ সে-সীমাকে আশ্রয় করেই সংস্কৃতির পয়দায়েশ; এখানেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সরহদ্দ। এখানেই পূর্ব পাকিস্তান একটি ভৌগোলিক সত্তা। এই জন্যেই পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা ভারতের অন্যান্য জাত থেকে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ধর্মীয় ভ্রাতাদের থেকে একটা স্বতন্ত্র আলহিদা জাত।’
অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গ যে পাকিস্তানের একটি অবিচ্ছেদ্য নয় বিচ্ছিন্ন অংশ তা স্বীকার করে নিয়েই এই অঞ্চলের বাঙালি জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি আলোচনায় ব্রতী হন।
পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য মাহফিল আয়োজিত চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’-এ তিনি ‘পাক-বাংলার কালচার ও ভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে অধিকাংশ আলোচকের সঙ্গে অভিন্ন মত পোষণ করেননি বলেই ‘ইসলামকেই পূর্ব বাংলার সংস্কৃ তির একমাত্র নিয়ন্ত্রণী শক্তি হিসেবে গণ্য করেননি। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলার কৃ ষ্টি ও ভাষার পার্থক্য স্বীকার করে নিয়ে, ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক-সামাজিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা পুনর্গঠনের ওপর তিনি জোর দেন।
মাসিক মোহাম্মদীতে (কার্তিক ১৩৫০/১৯৪৩) ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শীর্ষক এক নিবন্ধে আবুল মনসুর পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি এবং তার পরিচালকদ্বয় আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং মুজীবুর রহমান খাঁর প্রশংসা করে লিখেছিলেন :
‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত রূপায়ণের ভাবী রূপ নিয়ে মুসলিম বাংলার চিন্তানায়কদের মধ্যে এখন থেকেই আন্দোলন আলোচনা খুব স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়েছে। এই বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি যে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকায় অভিনয় করেছে, সে সম্বন্ধে বাঙলার মুসলমান এমনকি, এদের সীমিতাংশও, আজো পুরোপুরি সচেতন হননি।… বস্তুত পাকিস্তান দাবিকে একটা রাজনৈতিক, এমনকি নির্বাচনী শ্লোগান থেকে একটা ইনটেলেকচুয়াল আইডিয়্যালিজমে রূপান্তরিত করেছে প্রধানতঃ এই দুই ব্যক্তির মনীষা। আমি একাধিকবার স্বীকার করেছি, প্রধানতঃ এদের প্রেরণায় আমি পাকিস্তানের আদর্শবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। কায়েদ-ই-আজমের মনে যাই থাক, বাংলায় পাকিস্তানবাদ নিশ্চয় পার্লামেন্টারি কচকচিতে খেই হারিয়ে ফেলতো যদি না এই দুই ব্যক্তি নানা বিপদ ও অপ্রীতি অগ্রাহ্য করে নিশিদিন কলম চালিয়ে পাকিস্তানবাদকে এই ইনটেলেকচুয়াল রূপ দিতেন…।
এই পাকিস্তানবাদের ইনটেলেকচুয়াল রূপটি সেকালের প্রধান বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কেমন ছিল তা সংক্ষেপে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে আবুল মনসুরের ধারণায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার যে চরিত্র গ্রহণের কথা ছিল ১৯৪৭ এর পর তারা দেখলেন এ এক অন্য পূর্ববঙ্গ। মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক নেতারা ততদিনে পূর্ব বাংলা দখল করে নিয়েছেন। এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন একদল ভাড়াটে কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা পূর্ব বাংলার দুর্দশা দেখে প্রথম দিকেই মর্মাহত ও হতাশ হন। আবুল মনসুরও হতাশ হন। তিনি সেই শ্রেণির বুদ্ধিজীবী যিনি দিল্লির শাসকদের মনোভাবের সঙ্গেও একমত নন, অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসক-শোষকদের সঙ্গে গাটছড়া বাধারও বিরুদ্ধে। তবে তিনি মোটেই উগ্র নন, যা বলার নিচু কণ্ঠে শান্তভাবেই বলেন। তাঁর ভাষায়, গোটা পাকিস্তান অর্থ ছিল কার্যতঃ ‘পশ্চিম পাকিস্তান।’ তিনি আর পরিষ্কার করে বলেন : ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় রূপ “পূর্ব পাকিস্তান” বা ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ যাই হোক ভাষা-সাহিত্য-কালচার-সংস্কৃতিতে যে আমরা একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ও অপরদিকে ভারত হইতে সম্পূর্ণ পৃথক, এসব ব্যাপারেই যে আমাদের নিজস্বতা ও স্বকীয়তা আছে, এটা আমার অনড় দৃঢ় মত।’ [আত্মকথা] ।
আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন প্রথমত পূর্ব বাংলার একজন খাঁটি বাঙালি, তারপর একজন মুসলমান এবং এই দুইয়ের সমন্বয়ে হয়ে উঠেছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি মুসলমান। ওই বাঙালি মুসলমান হওয়াটাই তার জন্যে হয়েছিল সমস্যা। তাঁর লেখা পড়ে এবং জীবন পর্যালোচনা করে মনে হয় না তিনি কিছুমাত্র সাম্প্রদায়িক ছিলেন। অনেক বাঙালি মুসলমান নেতার মতো একেবারেই ভারতবিদ্বেষী ছিলেন না, হিন্দুবিদ্বেষী তো ননই। তাঁর ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ ও শব্দ বন্ধ তাঁকে ভুল বোঝার পথ করে দেয়। তার মধ্যে পূর্ববঙ্গীয়তা ছিল পুরোপুরি; কিন্তু হিন্দু-বিরূপতা ছিল না একেবারেই। যেমন তিনি পূর্ব বাংলাকে বলেছেন ‘মুসলিম বাংলা’, কথাটিতে আমরা শঙ্কিত হতে পারি কারণ পদ দুটিতে ধ্বনিত হয় যেন সাম্প্রদায়িক চেতনা। কারণ পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতি ভুট্টোর মুখেও শোনা গেছে কথাটি ‘৭০-এর দশকে। ভারতের প্রতিরক্ষমন্ত্রী জগজীবন রাম ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বাংলাদেশকে অখ্যায়িত করেছেন ‘দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র’ বলে। এ সব কথায় সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটে না। আবুল মনসুরকে সমর্থন করার জন্য বলছি না, বস্তুত তাঁর লেখা পাঠ করে সহজেই বোঝা যায় যে কথাটিতে তিনি বোঝাতে চাইতেন ‘মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গ’। অবহেলিত পূর্ব বাংলাই ছিল তাঁর চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। সেটা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধি থেকে নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতার চেতনাপ্রসূত।
