অশেষ অভাব ও অজ্ঞতার অন্ধকারে পড়ে থাকা বাঙালি মুসলমানকে অশিক্ষিত কাঠমোল্লা ও ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রতারণা করে আসছিল। ইসলামের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে, বিচিত্রভাবে প্রতারণা করে একটি শ্রেণি বৈষয়িকভাবে উঠেছিল ফুলে-ফেঁপে। তারা সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতাদের থেকেও আনুকূল্য পেত। ওই ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের সরাসরি আঘাত করা কঠিন ছিল। নজরুল তাঁর জনপ্রিয়তা ও হিমালয়তুল্য ব্যক্তিত্বের জন্য খানিকটা পেরেছিলেন। অন্য কারও পক্ষে তা সহজ ছিল না। আবুল মনসুর আহমদ সেই ঝুঁকি নেন। তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন সাংবাদিকতা ও আইন ব্যবসাকে। নেশা হিসেবে বা সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য সাহিত্য ও রাজনীতি। আবুল মনসুরের ব্যঙ্গগল্প বা রম্যরচনা আয়না (১৯৩৫) বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য কাজ। তাঁর আরেকটি রসরচনা ফুড কনফারেন্স (১৯৪৪)। দুটি গ্রন্থে যে বিষয় দুটিকে তিনি আঘাত করেছিলেন, সেই ধর্ম ব্যবসা ও সুবিধাবাদী নষ্ট রাজনীতি আজও আমাদের দেশ ও সমাজকে পেছনের দিকে টানছে।
আয়না সম্পর্কে নজরুল লিখেছিলেন, ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু [কথা] শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে-সমস্ত মানুষ হরেক রকম মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপমূর্তি– বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুশোখপরা এই বহুরূপী বনমানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিক্সের আখড়ায়, সাহিত্যসমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’
নজরুল আরও বলেছিলেন, ‘বন্ধুবরের রসাঘাত কশাঘাতেরই মত তীব্র ও ঝাঝালো।’
আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। তিরিশের দশক থেকে তিনি বাঙালি মুসলমানসমাজে একজন প্রতিনিধি-পুরুষ। সাংবাদিকতা করেছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন, রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছেন এবং সমাজের –বিশেষ করে মুসলমানসমাজের –দোষ ও দুর্বলতাগুলো দূর করতে কিছুটা সংস্কারের কাজও করেছেন। সমাজের অন্যায়-অসংগতি তাঁকে পীড়া দিয়েছে। সেসবের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের প্রগতিশীল মানুষ।
মুসলমানসমাজের আধুনিক সাংবাদিকতার যারা পথিকৃৎ, আবুল মনসুর তাঁদের মধ্যে প্রধান। ১৯২০ এবং ‘৩০-এর দশকে বিভিন্ন কাগজে তিনি কাজ করলেও ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে নিখিল বঙ্গ প্রজা পার্টির মুখপত্র দৈনিক কৃষক এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। একটি অসাম্প্রদায়িক কাগজ হিসেবে সেটি প্রশংসিত হয়েছিল। তবে খুব বেশি সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা ফজলুল হকের দৈনিক নবযুগে যোগ দেন। প্রধান সম্পাদক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, কিন্তু সম্পাদনার মূল দায়িত্ব পালন করতেন আবুল মনসুর। নজরুল তখন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছিলেন। নবযুগে থাকাকালেই তিনি বাক্ ও স্মৃতিশক্তি হারান।
সাংবাদিকতায় আবুল মনসুরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান দৈনিক ইত্তেহাদ, প্রকাশিত হয় ১৯৪৭-এর জানুয়ারিতে, মালিকানা ছিল অখণ্ড বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর। কাগজ হিসেবে ইত্তেহাদ ছিল আধুনিক ও প্রগতিশীল এবং অসাম্প্রদায়িক। যদিও মুসলমানসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা তাতে প্রাধান্য দিয়ে তুলে ধরা হতো। ১৯৫০ সালে ইত্তেহাদ বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের বাড়িতে ইত্তেহাদ আসত কলকাতা থেকে। মওলানা আকরম খাঁর আজাদ ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী এবং ইত্তেহাদ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী। চল্লিশের দশকের শেষ দিকে ইত্তেহাদ বহু মুসলমান তরুণকে সাংবাদিকতা শিখিয়েছে, পরে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাঁরা খ্যাতিমান হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোহাম্মদ মোদাব্বের, কে জি মুস্তফা, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, খোন্দকার আবদুল হামিদ, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রীস, কথাশিল্পী রশীদ করীম, সিরাজুদ্দীন হোসেন প্রমুখ। আমাদের বাড়িতে ইত্তেহাদ-এর বহু পুরোনো কপি ছিল। তার সাহিত্য বিভাগ, মহিলা বিভাগ, শিশু কিশোরদের পাতা, সিনেমার পাতা, খেলাধুলার পাতা প্রভৃতি ছিল মানসম্মত। তার চেয়েও বড় কথা, মুসলমান সমাজ তখন জেগে উঠেছে। সে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে সব ক্ষেত্রে। সে চাইছে আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে এবং নিজেদের বিকশিত করতে। বাঙালি মুসলমান পুরুষ শুধু নয়, বাঙালি নারীও ঘরের বাইরে এসে নিজের শক্তির স্বাক্ষর রাখতে চাইছে। বাঙালি মুসলমান খেলাধুলায় আগ্রহ দেখাচ্ছে। অগ্রগামী হিন্দুদের সঙ্গে খেলার মাঠে ও জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সিনেমার মতো নতুন শিল্পমাধ্যমে তার আগ্রহ দেখা যায়। মুসলমান শিশু কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা অঙ্কুরিত করার প্রয়াস দেখা দিয়েছে চল্লিশের দশকে। মুসলিম লীগ চাইছে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে স্বশাসন। মুসলমানসমাজ তাতে গভীরভাবে সাড়া দিচ্ছে।
আবুল মনসুর আহমদ একজন বিশিষ্ট সৃষ্টিশীল লেখক, বরং তার অন্যান্য পরিচয়ের মধ্যে লেখক পরিচয়ই প্রধান। আয়না ও ফুড কনফারেন্স-এর রম্য ছোটগল্পগুলো সাহিত্যকর্ম হিসেবে অসামান্য। তিনি কয়েকটি উপন্যাসও লিখেছেন। শিল্পকর্ম হিসেবে সেসব উপন্যাস কতটা উত্তীর্ণ, তার চেয়ে বড় কথা, তাতে তিনি আঁকতে চেয়েছেন একটি সময়ের বাঙালি মুসলমানের বাইরের ও ভেতরের চিত্র। তাঁর উপন্যাস তিনটি– সত্যমিথ্যা, জীবনক্ষুধা ও আবেহায়াত। তিনি সমাজের সমস্যার কথা বলতে চেয়েছেন। জীবনক্ষুধায় চল্লিশের শেষের বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের মনোজগৎকে তুলে ধরতে পেরেছেন। বাংলা উপন্যাস নিয়ে যখন আলোচনা হয়, যেখানে আবুল মনসুর আহমদ বিশেষ গুরুত্ব পান না। বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের দুর্বলতা সেখানে।
