কৃতী ব্যক্তিদের কাজের স্বীকৃতি অপ্রত্যাশিত নয়। পদক-পুরস্কারে মানুষের মর্যাদা কতটুকু বাড়ে তার চেয়ে বড় কথা, আমাদের মতো গরিব দেশে তারা আর্থিকভাবে কিছুটা উপকৃত হন। পশ্চিম পাকিস্তানি চিত্রশিল্পী জোবায়দা আগা এবং আমাদের কামরুল হাসান একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের পদক পান দশ হাজার টাকা করে। উভয়েই গুণী শিল্পী। পুরস্কার পাওয়ার পর কামরুল হাসান, তিনি তখন আইয়ুব প্রতিষ্ঠিত ডিজাইন সেন্টারের চিফ ডিজাইনার, তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন:
‘শিল্প-সাহিত্যের এই ধরনের পুরস্কার নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। এতে ব্যক্তিগতভাবে কোনো শিল্পীকে মর্যাদা দেওয়া হয় নাই। বরং শিল্পীর সাধনার এবং শিল্পীর রং ও তুলির মাধ্যমে যে পরিবেশ ও সমাজের চিত্র প্রকাশিত হইয়াছে তাহাকেই এই পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হইয়াছে।’
নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালন করে যদি কেউ পদক পুরস্কার খেতাব পান, তা নিয়ে তাঁরা গর্ব করতেই পারেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘তমঘা ই-পাকিস্তান’ (টিপিকে) পেয়েছিলেন তার যোগ্যতায় বাংলাদেশের যখন তিনি অর্থমন্ত্রী, তখনো ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ তিনি পেয়ে থাকবেন তার যোগ্যতার জন্য। তবে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজের পুরস্কার নেওয়া শোভন নয়।
১৯. একটি অবহেলিত অধ্যায়
আমরা যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি, সেখানে যে আধুনিক সমাজ গঠিত হয়েছে, তা নির্মাণের পেছনে কত মানুষের অবদান ও শ্ৰম কাজ করেছে, তা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে বহু খ্যাত-অখ্যাত মানুষ কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা না করে নীরবে কাজ করে গেছেন একটি বসবাসযোগ্য সমাজ নির্মাণের জন্য। আজ বেগম রোকেয়ার নাম প্রতিদিন উচ্চারিত। তাঁর নামে রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্যই তাঁর অবদান বড়। তবে তাঁর যে নারীবাদী আন্দোলন, তা উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আজ আমাদের দেশে নারীদের বিভিন্ন সংগঠন, পরিষদ, সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারীদের জন্য রয়েছে বহু বড় বড় এনজিও। তাতে বিদেশি অর্থায়নও প্রচুর। কিন্তু কোনো নারীবাদী সংগঠন কি কখনো স্মরণ করে ডাক্তার লুঙ্কর রহমানের নামটি? যিনি ১৯২০-এর দশকে, রোকেয়ার জীবদ্দশায়ই কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নারী-তীর্থ’ নামের সেবাশ্রম এবং নারী-শক্তি নামে পত্রিকা।
যশোর জেলার অধিবাসী এবং পেশায় হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, লুৎফর রহমান প্রথম জীবনে কিছুকাল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনি ছিলেন আদর্শবাদী ও যুক্তিবাদী মানুষ। শিক্ষকতায় গিয়েছিলেন জীবিকার জন্য নয়, মানুষ তৈরি করার ব্রত নিয়ে। তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল উঁচু, কিন্তু সংগতি ছিল কম। বিত্তবান তিনি ছিলেন না, ছিল না তার কোনো বিত্তবান হিতৈষী। সীমিত শক্তি নিয়ে একটি উন্নত সমাজ গঠনের জন্য তিনি আমৃত্যু কাজ করেছেন। কোনো আনুকূল্য পাননি কোনো দিক থেকে। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি ১৯৩৬ সালে কলকাতায় মারা যান। তিনি তাঁর ঘরে দরিদ্র যক্ষ্মা রোগীদের রেখে চিকিৎসা করাতেন এবং একপর্যায়ে নিজেই যক্ষ্মায় সংক্রমিত হয়ে মারা যান। সুমহান আদর্শবাদিতা।
রোকেয়া ছিলেন উচ্চমধ্যশ্রেণির প্রতিনিধি, সাধারণ দরিদ্র, নির্যাতিত-নিপীড়িত নারীদের ব্যাপারে তাঁর বিশেষ দুশ্চিন্তা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশে নির্যাতিত-নিপীড়িত নারীর সংখ্যাই বেশি। শুধু পেটের দায়ে বহু যুবতী ও অসহায় নারী পতিতালয়ে গিয়ে আশ্রয় নিত। লুত্ফর রহমান তাদের খোঁজ নিতেন। তাদের নিঃশব্দ কান্না তার বুকে বাজত। তিনি তাদের অনেককে পতিতালয় থেকে বের করে এনে সমাজে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। একবার যে নারী দেহব্যবসা করেছে, আমাদের সমাজ তাকে আর ঠাই দেবে না। একপর্যায়ে লুৎফর রহমান তার নিজের ঘরেই তাদের। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। আশপাশের মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়। তিনি তাঁর কর্মসূচির নাম দেন ‘নারী-তীর্থ’। সেখানে রোকেয়া একদিনও যাননি, কবি গোলাম মোস্তফা, নজরুল ইসলাম গেছেন। নজরুল ছাড়া তিনি আর কারও থেকে কোনো সমর্থন পাননি। লুৎফর রহমান পত্রিকা বের করেন নারী-শক্তি নামে। বাঙালি মুসলমানসমাজ উন্নত ও মহৎ কিছু কখনো দেখেনি। তাই কলকাতার কোনো বিত্তবান মুসলমান তাঁর মহৎ কর্মে এগিয়ে আসেননি।
লুৎফর রহমানের উপদেশমূলক রচনাবলি বহুপঠিত। বাংলা একাডেমিও তার রচনাবলি প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া পাইরেট সংস্করণ হয়েছে তার প্রবন্ধগ্রন্থ উচ্চ জীবন, মহৎ জীবন, উন্নত জীবন, মানব জীবন, সত্য জীবন প্রভৃতি। ছেলেদের মহৎ কথা তার একটি চমৎকার বই। লুৎফর রহমান একজন সৃষ্টিশীল লেখকও ছিলেন। তাঁর উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে পথহারা, প্রীতি উপহার, বাসর উপহার, রায়হান প্রভৃতি। একজন সৃষ্টিশীল লেখক, সংস্কারক ও সমাজকর্মী হিসেবে লুৎফর রহমান সমাজের মূলধারা থেকে যে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দাবি করেন, তা তিনি পাননি। ফলে তাঁর বইপত্র বাজারে রয়ে গেলেও ব্যক্তি লুৎফর রহমান হারিয়ে যান। আমরা প্রভাবশালী ও বিত্তবানের পায়ে অর্ঘ্য দিতে অভ্যস্ত– তাঁর অবদান যত সামান্যই হোক।
