সেকালে সমগ্র পাকিস্তানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ মর্যাদা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে দেওয়া হতো খুবই সম্মান। মমতাজ হাসান, কুদরতুল্লাহ শাহাব প্রমুখের সুপারিশেন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলীর স্থায়ী চেয়ারম্যান করা হয় পদাধিকারবলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে। লেখক বা প্রকাশককে বই জমা দিতে হতো। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিশিষ্ট একাডেমিশিয়ানরা ছিলেন বিচারকমণ্ডলীর সদস্য।
ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কারের প্রশ্নে একজনের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে। তিনি ডাক্তার মোহাম্মদ মোর্তজা। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের ডাক্তার। তার চেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি আমাদের মতো তরুণদের বাম সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন। তাঁর দীক্ষায় আমাদের বহু বন্ধু ষাটের দশকে বাম ধারার রাজনীতিতে এসেছেন। মস্কো-পিকিং দুই ধারার কমিউনিস্টদের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাংলা পরিভাষার কাজ তিনি করছিলেন। ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী প্রমুখ চাইতেন বাংলায় ডাক্তারি পড়বেন আমাদের ছাত্ররা মেডিকেল কলেজগুলোতে। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কার প্রথম বছরই পান মোহাম্মদ মোর্তুজা। যে বইটির জন্য তিনি পুরস্কার পান তার নাম ‘জনসংখ্যা ও সম্পদ। তাঁর এই পুরস্কারপ্রাপ্তিতে আমরা ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। প্রথম বছর আরেকটি ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কার দুই ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল ড. এ কে এম আমিনুল হককে তাঁর চিল-ময়না-দোয়েল-কোয়েল বইটির জন্য আড়াই হাজার টাকা এবং অধ্যক্ষ আবুল কাশেমকে তাঁর একটি রসায়নবিষয়ক বইয়ের জন্য আড়াই হাজার টাকা। ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকায় এসে ফুলার রোডে গিয়ে যখন শুনলাম আলবদর বাহিনী ডা. মোর্তজাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে, বেদনার সীমা ছিল না। অগণিত শহীদের তালিকায় যুক্ত হলো ফজলে রাব্বি, আলীম চৌধুরী, মোহাম্মদ মোর্তজাদের নাম।
১৯৬৫-তে ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কার পেয়েছিলেন মোহাম্মদ আবদুল জাব্বার তাঁর খগোল পরিচয় এবং গোলাম আজম সিদ্দিকী তাঁর পাকিস্তানের অর্থনীতি বইয়ের জন্য। এই পুরস্কারটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো এই জন্য যে তা আমাদের বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির দাবি বাস্তবায়নে সহায়ক ছিল। পুরস্কারের কারণে অনেকেই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক বই লেখায় প্রেরণা ও উৎসাহ পেতেন। ১৯৭০ সালে কবীর চৌধুরী একটি অনুবাদ বইয়ের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কার পান।
ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মাধ্যমেই প্রতি দুই বছর পরপর ‘ইউনেসকো পুরস্কার দেওয়া হতো। সেটাও দেওয়া হতো বাংলা ও উর্দু বইয়ের লেখককে। প্রতিবছর তিনটি বাংলা বই এবং তিনটি উর্দু বইয়ের লেখকের প্রত্যেকের জন্য ৪০০ ডলারের সমপরিমাণ টাকা বরাদ্দ ছিল। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পরের বছরই এই পুরস্কার চালু হয়। সাধারণ বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক পারস্পরিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছাড়াও নাটক-উপন্যাসের মতো সৃষ্টিশীল বইয়ের জন্যও ‘ইউনেসকো পুরস্কার দেওয়া হতো। ইউনেসকো পুরস্কারপ্রাপ্ত কয়েকজন কবি-লেখক হলেন জহুরুল হক (সাত সাঁতার), খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন (যুগস্রষ্টা নজরুল), রাজিয়া মাহবুব (খাপছাড়া), আহসান হাবীব (রত্নদ্বীপ), আলাউদ্দিন আল আজাদ (কর্ণফুলী), আবদুল গনি হাজারী (কতিপয় আমলার স্ত্রী), আবদুল গাফফার চৌধুরী (কৃষ্ণপক্ষ), শাহ ফজলুর রহমান (মহাশূন্যে অভিযান) প্রমুখ। ইউনেসকো পুরস্কারপ্রাপ্ত বইগুলোর মধ্যে সাত সাঁতার, যুগস্রষ্টা নজরুল, কর্ণফুলী বাংলা সাহিত্যে টিকে গেছে।
আইয়ুব সরকার আরেকটি পুরস্কার চালু করেছিল। তার নাম ‘জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা পুরস্কার। এই পুরস্কারটিই ছিল বিতর্কিত। নাটক, শিশুসাহিত্য-বিষয়ক বইয়ের লেখকদের এই পুরস্কার দেওয়া হতো। বড়দের নাটকের জন্য দেওয়া হতো তিনটি পুরস্কার। প্রতিটির মান এক হাজার টাকা। সেকালে সেটাও কম টাকা নয়। প্রায় ১০ ভরি সোনার মূল্যের সমান। বড়দের নাটকের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন নূরুল মোমেন, মুনীর চৌধুরী, আশকার ইবনে শাইখ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সিকান্দার আবু জাফর, প্রাবন্ধিক আবদুল হক প্রমুখ। মুনীর চৌধুরী নিহত হওয়ার কথা শুনে মমতাজ হাসান গভীর দুঃখ পেয়েছিলেন বলে তাঁর ভাই শামসেদ চৌধুরীর কাছে শুনেছি।
কিশোর উপযোগী দুজন জীবনীলেখককে ‘জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা পুরস্কার’ দেওয়া হতো। একটি পুরস্কারের মান ছিল ৭৫০ টাকা, আরেকটির মান ৫০০ টাকা। অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েদের পড়ার উপযোগী একটি কবিতার বইয়ের জন্য ছিল একটি এক হাজার টাকার পুরস্কার। ছোটদের জন্য লেখায় পুরস্কার পেয়েছিলেন আহসান হাবীব, ফয়েজ আহমদ, জহুরুল হক, মোহাম্মদ নাসির আলী, কবি আজিজুর রহমান, রাজিয়া মাহবুব প্রমুখ।
এ ছাড়া ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তান (পরে যার নামকরণ হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র) বই প্রডাকশন পুরস্কার প্রবর্তন করেছিল। ১৯৬২ সালে এই পুরস্কার চালু করে। বইয়ের অঙ্গসজ্জার জন্য বড়দের বইয়ের দুটি (প্রথম ও দ্বিতীয়) এবং শিশু-কিশোরদের বইয়ের জন্য দুটি পুরস্কার ছিল। সেটা পেতেন প্রকাশকেরা। প্রথম পুরস্কার এক হাজার টাকা, দ্বিতীয় পুরস্কার ৫০০ টাকা। প্রচ্ছদশিল্পীদের ন্যাশনাল বুক সেন্টার দুটি পুরস্কার দিত। প্রতিটির মান ৫০০ টাকা।
