পদক পুরস্কারে লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিকেরা উপকৃত হয়েছেন সন্দেহ নেই; কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক শাসকের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের বশে রাখা। এবং তাঁরা বশংবদ ছিলেনও, ব্যতিক্রম দু-একজন ছাড়া। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লেখকদের কলম থেকে কোনো শক্ত লেখা বের হতো না। যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চলছে এবং বাংলার মানুষ চাইছে স্বায়ত্তশাসন, তখন তারা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদদের সহায়তা করেননি। তবে হঠাৎ একদিন তাঁরাই পাকিস্তানি শাসকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন ১৯৭০-এর নির্বাচনের পর। নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর লেখকেরা আইয়ুব সরকারকে গালাগাল শুরু করলেন। শেখ মুজিবের যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অবধারিত, আইয়ুব-ইয়াহিয়া থেকে পাওয়ার আর কিছুই নেই, তখন ১৯৭১-এর ২৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান লেখক শিল্পী সমাজ’-এর পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শুনেছি সংবর্ধনায় যেতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না, কবি লেখকদের পীড়াপীড়িতে যান।
বাংলাদেশের লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিকদের বঙ্গবন্ধু খুব ভালো চিনতেন। মঞ্চে বসে পরিচিত কবি-সাহিত্যিকদের দিকে তাকিয়ে তাঁদের ভালো করে দেখে তিনি তার ভাষণে বলেন :
‘জনগণ যখন অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছিল, তখন একশ্রেণির শিল্পী, সাহিত্যিক-কবি…মৌলিক গণতন্ত্রের প্রশস্তি গেয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা কি আজ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন যে তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করেছেন?’
স্পষ্টভাষী মুজিব সেদিন আরও একটু খোলাসা করে বলেছিলেন : ‘যে মৌলিক গণতন্ত্র ও ডিক্টেটরি শাসনের পতন ঘটানোর জন্য বাংলার বীর ছাত্র-জনতা-শ্রমিক বুকের রক্ত দিয়েছে, তাদের (আইয়ুবদের) গুণকীর্তন করে, প্রবন্ধ লিখে, বেতার কথিকা প্রচার করে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ পয়সা রোজগার করেছেন। বিএনআরের অর্থানুকূল্যে বই প্রকাশ করেছেন।’
[দৈনিক পাকিস্তান]
তাঁর ওই বক্তব্যে অনেক কবি লেখকই মাথা নিচু করে থাকেন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো তাঁরাই স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানকে গালাগালি করে আওয়ামী লীগ সরকার ও জিয়াউর রহমানের সরকার থেকে পদক পুরস্কার ও সুবিধা নিয়েছেন।
১৮. রাষ্ট্রীয় খেতাব
ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকেরা এ দেশে তাদের সহযোগী ও তাবেদারদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন এবং সেসব পেয়ে তারা ধন্য হয়েছেন।
ইংরেজদের অধীনতা যারা মেনে নিয়েছেন, তাঁদের নানাভাবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম দিয়েছে একটি শ্রেণিকে ব্যবসা বাণিজ্য ও দালালি করে বিত্তবান হওয়ার সুযোগ। অকাতরে তাদের মধ্যে বিতরণ করেছে ভূসম্পত্তি। তারপর ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি প্রথার প্রবর্তন করে বাংলার মানুষকে চিরদিনের জন্য শোষণের শিকারে পরিণত করে। অবশ্য সেই সব অনুগ্রহভাজন বিত্তবানের ছেলেমেয়েরাই কেউ কেউ দু-তিন পুরুষ পরে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে এককালের সুবিধাভোগীদের সন্তানদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বহু জমিদার-জোতদারের সন্তানদের আত্মত্যাগ অসামান্য।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় ব্রিটিশ শাসকদের যারা বিশ্বাসভাজন, তাদের তারা বিভিন্ন খেতাব দিয়ে ভূষিত করতেন। সবচেয়ে বড় সামন্তপ্রভুদের বা জমিদারদের খেতাব দিতেন ‘নবাব বাহাদুর’ ও ‘নবাব’ এবং ‘মহারাজা’ ও ‘রাজা’। নবাব বাহাদুর ও নবাব দিতেন মুসলমানদের এবং মহারাজা ও রাজা হিন্দুদের। যেমন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুর এবং নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়। তা ছাড়া সরকারের অনুগত বিশিষ্ট ব্যক্তি, জমিদার, সরকারি কর্মকর্তারা পেতেন খান বাহাদুর/ ‘রায় বাহাদুর’ এবং ‘খান সাহেব/ ‘রায় সাহেব। খান সাহেব ও রায় সাহেব ছিল সবচেয়ে ছোট খেতাব। মাসে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত যাদের আয় ছিল অথচ সমাজে যারা সম্মানিত, তাঁদের মধ্যে হিন্দুরা পেতেন রায় সাহেব এবং মুসলমানরা পেতেন খান সাহেব খেতাব। ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে বহু খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর এবং খান সাহেব ও রায় সাহেব ছিলেন। খেতাবধারীদের সাধারণ মানুষও সম্মান দিতেন। বহু কবি-সাহিত্যিক খেতাব পেয়েছেন।
সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান শুধু পদক-পুরস্কারই প্রবর্তন করেননি, তিনি ব্রিটিশ শাসকদের মতো চালু করেন খেতাব। সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা এবং সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাদের অবদান রয়েছে, এমন শিল্পী সাহিত্যিক ও সমাজসেবীদের তিনি ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে ওই খেতাব দিয়ে ভূষিত করতেন। অনুগত ও বিশ্বস্ত সরকারি, আধা-সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভূষিত করা হতো খেতাবে।
আইয়ুব-প্রবর্তিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব ছিল হিলাল-ই-পাকিস্তান, তারপর হিলাল-ই কায়েদে আজম, সিতারা-ই পাকিস্তান, সিতারা-ই-সুজাত, সিতারা-ই ইমতিয়াজ, সিতারা-ই খিদমত, তমঘা-এ-ইমতিয়াজ, তমঘা-ই-কায়েদে আজম প্রভৃতি। খেতাবপ্রাপ্তরা নামের শেষে সংক্ষেপে খেতাব লিখতে পারতেন এবং লিখতেনও। যেমন সৈয়দ মুর্তজা আলী এবং কবি ও আমলা সানাউল হক পেয়েছিলেন ‘সিতারা ই-কায়েদে আজম। তিনি তাঁর প্যাডে লিখতেন সানাউল হক এসকিউএ অথবা ইংরেজিতে S.Q.A।
