আদমজী পুরস্কার দেওয়া হতোকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী প্রভৃতি বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য বইয়ের জন্য। প্রতিটি পুরস্কারের মান ছিল পাঁচ হাজার টাকা। লেখক সংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের পরামর্শক্রমে স্থায়ী চেয়ারম্যান মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পুরস্কারপ্রাপ্তদের মনোনীত করতেন। ১৯৬০ থেকে আদমজী পুরস্কার চালু হয়। প্রথম বছর পান আবদুস সাত্তার ও রওশন ইয়াজদানী, ১৯৬১তে রশীদ করীম ও আবদুর রাজ্জাক, ১৯৬২তে কাজী আবদুল মান্নান ও শওকত ওসমান, ‘৬৩তে শামসুর রাহমান ও শহীদুল্লাহ কায়সার, ‘৬৪তে আহসান হাবীব ও জহির রায়হান, ‘৬৫তে সুফি মোতাহার হোসেন ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং ‘৬৬তে আবুল ফজল ও ফররুখ আহমদ পুরস্কৃত হন। আদমজী পুরস্কারের যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। যে বইটির জন্য পুরস্কার দেওয়া হতো, সেটি ভালো বিক্রি হতো। তাতে লেখক-প্রকাশক উভয়েই উপকৃত হতেন।
আরেকটি মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার ছিল দাউদ পুরস্কার। ১৯৬৩ সালে ‘দাউদ ফাউন্ডেশন’ এই পুরস্কার প্রবর্তন করে। বাংলা ভাষার জন্য দশ হাজার এবং উর্দু ভাষার সাহিত্যকর্মের জন্য দশ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হতো গবেষণা, জীবনী ও ইতিহাস গ্রন্থের জন্য, বিশেষ করে পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত বিষয়সমূহের ওপর গবেষণামূলক কার্যের জন্য। প্রতিটি পুরস্কারের মান ছিল পাঁচ হাজার টাকা। ষাটের দশকে দাউদ পুরস্কার পেয়েছেন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ (১৯৬৩), জগলুল হায়দার আফরিক (১৯৬৩), আকবর উদ্দিন ও আশরাফ সিদ্দিকী (১৯৬৪), মুনীর চৌধুরী ও আনিসুজ্জামান (১৯৬৫), আবদুস সাত্তার ও মুন্সী রইসউদ্দীন (১৯৬৬) প্রমুখ।
পুরস্কার পাওয়ার কারণে কোনো কোনো বই ও তার লেখক জনপ্রিয়তা পেতেন। যেমন একজন লেখক জগলুল হায়দার আফরিক। তিনি পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর ভ্রমণকাহিনি সিন্ধু নীলাভ দেশ নামক সুখপাঠ্য বইটির জন্য। ষাটের দশকে বইটি জনপ্রিয় ছিল। জগলুল হায়দার আফরিক চাকরি করতেন দৈনিক আজাদে। আজাদের হিসাব বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন তিনি এবং আকরম খাঁর বিশেষ আস্থাভাজন। তিনি অনেকগুলো ভাষা জানতেন। শুনেছি আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দিসহ সাত আটটি ভাষা জানতেন। চল্লিশের দশকে তিনি অনেক দিন মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন। তাঁর ইংরেজিতে একটি বই ছিল Call of the Red Sea. পঞ্চাশের দশকে তার একটি বই পরদা নশিন হওয়া পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। ষাটের দশকে তাঁর একটি উপন্যাস দেখেছি, নাম বিপ্লবী নায়িকা। স্বাধীনতার আগেই তিনি মারা যান। আমি তাঁকে দেখেছি। তিনি বিশেষ সজ্জন ছিলেন।
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের জন্য আরও যারা দাউদ পুরস্কার পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আশরাফ সিদ্দিকী, সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল হক, আবদুস সাত্তার, মাযহারুল ইসলাম প্রমুখ। যে বইয়ের জন্য লেখকেরা দাউদ পুরস্কার পেয়েছিলেন, তার সবই যে বিশেষ মূল্যবান বই, তা বলা যায় না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বইটির চেয়ে বইয়ের লেখককেই পুরস্কৃত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সেকালে ন্যূনতম মানসম্পন্ন না হলে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়া কঠিন ছিল।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ১৯৬৪ থেকে একটি সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করে। ন্যাশনাল ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা মমতাজ হাসান ছিলেন শিল্প-সাহিত্যের একজন সমঝদার। ষাটের দশকে আমাদের প্রধান চিত্রশিল্পী ও লেখকদের মুখে মমতাজ হাসানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনেছি, তিনি ছিলেন তাঁদের অকৃপণ পৃষ্ঠপোষক। পূর্ব পাকিস্তানে চিত্রকর্ম বিক্রি হতো না বললেই চলে। সে জন্য পঞ্চাশের দশকের চিত্রশিল্পীদের অনেকেই করাচি-লাহোরে যাতায়াত করতেন ছবি বিক্রির জন্য। তারা কেউই নিরাশ হননি। বিশেষ করে, কোনো রকমে মমতাজ হাসানের সঙ্গে গিয়ে পরিচিত হতে পারলে ভাগ্য খুলে যেত। তিনখানা বই লিখে একজন খ্যাতনামা লেখক যা রোজগার করতেন, দু-তিনটি ছবি ন্যাশনাল ব্যাংকে গছাতে পারলে তার কয়েক গুণ বেশি উপার্জন করতেন একজন শিল্পী। মমতাজ হাসান শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টরই নন, সম্ভবত পাকিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবও হয়েছিলেন।
দাউদ বা আদমজী পুরস্কারের চেয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কারের বিষয় ছিল কিছুটা ভিন্ন। প্রতিবছর ২৫ হাজার টাকা পুরস্কারের জন্য বরাদ্দ করা হয়। বাংলা ভাষায় রচিত দুটি গ্রন্থের জন্য পাঁচ হাজার করে দশ হাজার, একইভাবে উর্দু দুটি গ্রন্থের জন্য দশ হাজার এবং ইংরেজি ভাষায় রচিত একটি বইয়ের জন্য পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হতো। এই পুরস্কারটিতে বাঙালি লেখকেরা যথেষ্ট উপকৃত হয়েছিলেন।
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর বাংলা ও উর্দুতে লেখা দুটি গবেষণাগ্রন্থের জন্য দুটো পুরস্কার দেওয়া হতো এবং পাকিস্তানের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো যেতে পারে, এমন বিজ্ঞানবিষয়ক দুটি বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের লেখকদের পাঁচ হাজার করে দশ হাজার টাকা পুরস্কার ছিল। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর ইংরেজিতে রচিত একটি বইয়ের লেখককে ন্যাশনাল ব্যাংক পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দিত।
