সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘প্রেসিডেন্ট পুরস্কার’ দেওয়া হতো বাংলা ও উর্দু সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের। সম্ভবত পাকিস্তানের অন্য কোনো ভাষায় কোনো কবি সাহিত্যিক এই পুরস্কার ষাটের দশকে পাননি। পশ্চিম পাকিস্তানে সিন্ধি ও পাঞ্জাবি ভাষার কবি-লেখকও ছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পুরস্কার কমিটি গঠন করে দিত, সেই কমিটির সুপারিশমতো মনোনীত হতেন পুরস্কারপ্রাপ্তরা। প্রতিবছর পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্টে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা করা হতো।
একই পুরস্কার কেউ পাবেন পাঁচ হাজার টাকা, কেউ পাবেন দশ হাজার টাকা, কেন এই বৈষম্য, তা সেকালে আমাদের বোধগম্য ছিল না। যারা বাংলা সাহিত্যে পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁদের কাছেও ব্যাপারটি স্পষ্ট ছিল না। জিনিসটি নিয়ে যে আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা প্রশ্ন তুলবেন, সে সাহসও ছিল না কারও। কেউ কেউ, বিশেষ করে যারা পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছেন, মর্মবেদনায় ভুগতেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলতেন না। অথচ প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল। গণতান্ত্রিক সমাজে অযৌক্তিক কাজের সমালোচনা এমন কি প্রতিবাদ হয়ে থাকে।
আমরা তখন তরুণ লেখক, সুতরাং ওই পদক-পুরস্কার নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা ছিল না। লক্ষ করেছি, যাঁর সাহিত্যকর্ম কম তিনি পেয়েছেন দশ হাজার টাকা এবং যার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রয়েছে তিনি পেয়েছেন পাঁচ হাজার টাকা। বাংলা সাহিত্যে প্রথম বছর (১৯৫৮) প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পান মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। নিঃসন্দেহে তিনি যোগ্যতম ব্যক্তি। তিনি পান দশ হাজার টাকা। তাঁর সঙ্গে একই বছর পুরস্কৃত হন কবি জসীমউদ্দীন। সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অপরিমেয়। তাঁকে দেওয়া হয় পাঁচ হাজার টাকা। জসীমউদ্দীনের মন খারাপ হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
১৯৫৯ সালেও ওই একই ব্যাপার ঘটে। আজাদ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী মুসলিম লীগের সাবেক নেতা মওলানা আকরম খাঁ পান দশ হাজার টাকা। ১৯৬০ সালে কবি গোলাম মোস্তফা পান পাঁচ হাজার টাকা।
১৯৬১ সালে কবি ফররুখ আহমদ পান পাঁচ হাজার টাকা এবং একই সঙ্গে মহিউদ্দীনও পান পাঁচ হাজার টাকা। ১৯৬২ সালে মহিউদ্দীন দ্বিতীয়বার একই পুরস্কার পান পাঁচ হাজার টাকা। বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের অবদান আর মহিউদ্দীনের অবদান কি সমান? তা ছাড়া একই পুরস্কার পরপর দুই বছর একই ব্যক্তির পাওয়ার যুক্তি কোথায়?
রাষ্ট্রীয় পদক-পুরস্কারের অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। সে গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়, মর্যাদারও। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই অনেক রকম সাহিত্য পুরস্কার প্রচলিত রয়েছে। ভারতে আছে জ্ঞানপাঠ, আকাদমি পুরস্কার প্রভৃতি। যে উদ্দেশ্যেই আইয়ুব সরকার ‘প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রবর্তন করুক, কাজটি খারাপ ছিল না। মনোনয়ন ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতিত্বমূলক হওয়ায় পুরস্কারটির মর্যাদাহানি ঘটে এবং যারা পুরস্কৃত হন তাঁরাও গৌরব থেকে হন বঞ্চিত।
গণতন্ত্রহীন অনুন্নত দেশে সরকারি পুরস্কারের একটি নেতিবাচক দিক আছে, আর তা হলো তাতে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের শুধু নয়, পুরস্কারপ্রত্যাশী লেখকদের প্রতিবাদী চেতনা নষ্ট করে দেওয়া। সত্য উচ্চারণ থেকে তারা বিরত থাকেন। অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ জোর দিয়ে করতে পারেন না। আইয়ুবের সামরিক একনায়কী শাসনামলেও সেটি লক্ষ করা গেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী নেতারা লড়াই করেছেন, নির্যাতিত-নিপীড়ন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, বিরল ব্যতিক্রম বাদে লেখক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অতুলনীয় সুবিধাবাদী।
১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পান আবুল ফজল পাঁচ হাজার টাকা, পরের বছরও তিনি আবার পুরস্কার পান পাঁচ হাজার টাকা। মহিউদ্দীন ও আবুল ফজল পরপর দুবার পুরস্কার পান পাঁচ হাজার পাঁচ হাজার করে দশ হাজার টাকা। ১৯৬৬ সালে মুহাম্মদ এনামুল হক পেলেন পাঁচ হাজার টাকা, কিন্তু ‘৬৭ সালে বন্দে আলী মিয়া পেলেন দশ হাজার টাকা। সঙ্গীতে ওস্তাদ আয়েত আলী খান পেলেন দশ হাজার টাকা।
১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পান শওকত ওসমান। তার পুরস্কারপ্রাপ্তির খবর শুনে প্যারিস থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁকে ২৫ আগস্ট ‘৬৮ এক চিঠিতে লেখেন, “শুনলাম বড় পুরস্কার পেয়েছ তাই লিখছি। অবশ্য এটা একটা অজুহাত, কারণ তুমি একটা পুরস্কার পেয়েছ তা কী এমন বড় খবর। পুরস্কারে খুশি হওয়ার কথা, তোমার নয়, আমাদেরও নয়। অন্য একটা দিক আছে বৈকি কিন্তু ওটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ও বিষয়ে অন্যদের মন্তব্য করার অধিকার আছে বলে– মনে হয় না।’
(সৈয়দ আবুল মকসুদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য, দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৮৩, পৃ. ২৩৪)
ওয়ালীউল্লাহ যে লিখেছিলেন পুরস্কারের অন্য একটা দিক, তা হলো আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। যখন চালের মণ ছিল ৩০ টাকা এবং সোনার ভরি ১২০ টাকার কম, সেই সময় পাঁচ হাজার/দশ হাজার টাকা বিপুল টাকা। মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারটি যেহেতু ইসলামাবাদ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিত, সুতরাং তার জন্য ঢাকা থেকে লেখকেরা কতভাবে কী পরিমাণ তদবির করতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথবা তারাই পুরস্কার পেতেন, যারা সরকারের আস্থাভাজন।
