বিএনআরের শেষ ও নিন্দনীয় পরিচালক ছিলেন হাসান জামান। তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের পৃষ্ঠপোষক। তিনি ছিলেন হিন্দুবিরূপ, রবীন্দ্রসংগীত বিরোধিতার প্রশ্নে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা সরকারকে সমর্থন দেন যখন জসীমউদ্দীন, মুহম্মদ কুদরাত-ই-খুদাসহ পূর্ব বাংলার প্রধান কবি-সাহিত্যিকেরা সরকারি নীতির তীব্র বিরোধিতা করেন।
বিএনআর একেবারেই রাজনীতিনিরপেক্ষ শিল্প-সাহিত্য-দর্শনসংক্রান্ত বহু বই পুস্তিকা যেমন বের করেছে, তেমনি তার মূল কাজ ছিল আইয়ুব প্রবর্তিত ‘মৌলিক গণতন্ত্র বিষয়ে প্রচারমূলক বই-পুস্তিকা প্রকাশ করা। বিশেষ করে, এমন কিছু বই বের করেছে, যা সাম্প্রদায়িকতা দোষে দূষিত। পাকিস্তানের নতুন প্রজন্মের তরুণেরা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করতেন। তাঁরা ৪৭-পূর্ব সময়ের হিন্দু জমিদার মহাজনদের নিপীড়ন শোষণের বিষয়টিকে অতীতের একটি অধ্যায় হিসেবেই বিবেচনা করেছেন– বর্তমানের হিন্দুরা তার জন্য দায়ী নন। কিন্তু পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকার সেই অতীতকে অব্যাহত স্মরণ করিয়ে দিতে চেষ্টা চালিয়ে যেত। অত্যাচারী ও শোষক হিসেবে মুসলমান জমিদারেরা কিছুমাত্র কম ছিলেন না তা সবাই জানেন।
পাকিস্তান আমলের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান, তাঁরা এদিকেও ছিলেন ওদিকেও ছিলেন। তারা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, আবার প্রয়োজনে সরকারের মৃদু সমালোচনাও করেছেন। বিএনআরের দরজা সবার জন্যই ভোলা ছিল। মফস্বলের বহু অখ্যাত কবি-লেখকের গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধের বই প্রকাশ করেছে। হাসান জামান লেখকদের প্রাপ্য টাকা পাণ্ডুলিপি গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরিশোধ করতেন। তাতে বহু অসচ্ছল লেখক আর্থিকভাবে উপকৃত হয়েছেন। বই প্রকাশিত হওয়ায় লেখক হিসেবে তারা পেয়েছেন পরিচিতি, একজন অবহেলিত লেখকের জন্য তা বড় প্রাপ্তি।
খ্যাত-অখ্যাত এমন লেখক খুব কমই ছিলেন ষাটের দশকে, কবীর চৌধুরী ও হাসান জামানের সময় বিএনআর থেকে যাদের বই প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬৮-৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনআর নিয়ে যখন সমালোচনা হচ্ছিল, তখন হাসান জামান আত্মরক্ষার জন্য চাতুর্যের আশ্রয় নেন। পত্রিকায় ফলাও করে বিরাট এক বিজ্ঞাপন দেন এই মর্মে যে ‘বিএনআর কাদের বই প্রকাশ করে গর্বিত। দেখা গেল, প্রগতিশীল শিবিরের অনেক লেখক আছেন তাঁদের মধ্যে। (অবশ্য ওই তালিকায় আহমদ শরীফ এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নামও ছিল, কিন্তু তাদের কোনো বই বিএনআর থেকে প্রকাশিত হয়নি, অথবা তারা কোনো পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে রয়্যালটির টাকাও নেননি।)
উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের উদ্গাতা মওলানা ভাসানী যখন আইয়ুবের ‘দুর্গ জ্বালিয়ে দেওয়ার’ ডাক দিয়ে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন শুরু করেন, তখন একদিন উন্মত্ত জনতা নবাব আবদুল গনি রোডে বিএনআর কার্যালয় জ্বালিয়ে দেয়। (রেলভবনের পাশে)। টেবিল-চেয়ার-আলমারি পুড়ে ছাই হয়। অনেক ভালো ভালো রচনার পাণ্ডুলিপিও ভস্মীভূত হয়। গুদামে যেসব বই ছিল, সেগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আধা-পোড়া বই কয়েক দিন রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। অনেক বই ছাপা হয়েছিল নিউজপ্রিন্টে। ১০-১২টি বই আমি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। ওই সময় একদিন উত্তরবঙ্গ থেকে আসা একজন লেখককে হাইকোর্টের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখি। কারণ জিজ্ঞেস করে জানি, তিনি ইতিহাসমূলক একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন, একটা চেকও পেয়েছেন, বইটি ছাপা হচ্ছিল, কিন্তু সব শেষ।
লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা হাসান জামানের পিএইচডি থিসিস ‘Rise of the Muslim Middle Class in India and Pakistan’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
হাসান জামান ও তাঁর গোত্রের সবাই তাদের বিশ্বাসে অনড় ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের সাবলীলভাবে বিরোধিতা করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও স্বপ্ন উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিয়তির পরিহাস এই যে তার বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান এবং তাঁর ছেলে ও ভাগনে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। ১৯৭৮-তে হাসান জামান সৌদি আরবে মারা যান।
১৭. আইয়ুব আমলের সাহিত্যপুরস্কার
আইয়ুব আমলের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার ছিল ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স প্রেসিডেন্ট পুরস্কার’। ১৯৫৮ সালে জেনারেল মুহম্মদ আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পরপরই তিনি এই পুরস্কার প্রবর্তন করেন ‘গৌরবজনক সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু শুরু থেকেই এই সম্মানজনক পুরস্কারটি ছিল বৈষম্যমূলক। পুরস্কারের নীতি হিসেবে বলা হয়েছিল কমপক্ষে পাঁচ হাজার এবং ঊর্ধ্বপক্ষে দশ হাজার টাকা ও তৎসহ প্রেসিডেন্টের পদক প্রদানের রীতি রয়েছে এই পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে। শুধু সাহিত্যকর্মের জন্য নয়, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার দেওয়া হতো বিজ্ঞান, চিত্রকলা, খেলাধুলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে গৌরবজনক অধ্যায় সৃষ্টির জন্যও। কৃতী ব্যক্তিদের এ ধরনের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।
