হাসান জামান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের রিডার। তিনি ছিলেন ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানবাদী। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। বেশ কয়েকটি বইয়ের তিনি ছিলেন। রচয়িতা, যেমন ইসলাম ও কমিউনিজম, সমাজ সংস্কৃতি সাহিত্য, Basis of the Ideology of Pakistan প্রভৃতি। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক হলেও তিনি ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষাবিদ। চল্লিশের দশকে। তিনি ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদী পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নিবেদিত কর্মী।
পঞ্চাশের দশকে মুসলমান লেখকদের মধ্যে যারা ‘পাকিস্তানি তমদ্দুন’, ‘পাক বাংলা সাহিত্য’ প্রভৃতি তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন, হাসান জামান তাঁদের একজন। তাঁদের বক্তব্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্য মূলধারার বাংলা সাহিত্যের মতো হবে না, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্যের মতোও হবে না, তা হবে পাকিস্তানের নীতি আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ‘পাক-বাংলা সাহিত্য’। অন্য কথায় ‘মুসলমান বাংলা সাহিত্য’। সে সাহিত্যের বিষয়বস্তু শুধু নয়, তার ভাষা, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-অলংকার সবই হবে মূলধারার বাংলা সাহিত্য থেকে অন্য রকম। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের অব্যবহিত আগে এক আলোচনা সভায় খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন এক প্রবন্ধে বলেন, ‘আমাদের সাহিত্যে উপমা-প্রয়োগের যে ধারা চলছে তার পরিবর্তন দরকার, কারণ সেগুলো রাঢ়-বাংলার সংস্কৃতির অনুসারী ও পাকিস্তানি তমদ্দুনের পরিপন্থী।
[‘পাক-বাংলা সাহিত্য উপমা’]
১৯৫৮ সালে, সামরিক শাসন জারির আগে, আমেরিকার রকফেলার ফাউন্ডেশনের অর্থানুকূল্যে ঢাকায় এক বড় আকারের সাহিত্যবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগকে। ওই সেমিনারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, খান সারওয়ার মুর্শেদ, নূরুল হোসেন, হাসান জামান, কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, কবি আবুল হোসেন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আসকার ইবনে শাইখ প্রমুখ। সেকালে ইসলামপন্থী ও সেকুলারপন্থীদের মধ্যে বিশেষ বিভাজন ছিল না, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধেরও অভাব ছিল না।
ভাষা আন্দোলনের আট মাস পরে ‘৫২-র অক্টোবরে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এক ‘ইসলামী সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল পাকিস্তানে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীভূত করার অভিপ্রায় এবং সুষ্ঠু ইসলামভিত্তিক চিন্তা-প্রবাহ সৃষ্টি করা। সম্মেলনের সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ এবং আবদুল গফুর। সম্মেলনের লক্ষ্য সম্পর্কে ঘোষণা করা হয় :
‘আমরা যদি পাকিস্তানকে “ইসলামী রাষ্ট্র” হিসাবে গড়ে তুলতে চাই তবে প্রথমে “ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ” সম্বন্ধে আমরা পরিষ্কার ধারণা করে নেব। আমরা আধুনিক দুনিয়ার বিভিন্ন মতবাদ ও সমস্যাবলীর তুলনায় ইসলামকে যাচাই করে নিতে চাই। ইসলামই যে শ্রেষ্ঠতম মানবকল্যাণকর আদর্শ তা আমরা কোনো গোঁজামিল না দিয়ে বুঝে নিতে ও অন্যদের বুঝিয়ে দিতে চাই।’
[সাঈদ-উর রহমান, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পৃ. ২৯-৩০]
ওই সম্মেলনের সাহিত্য-সভার আলোচনায় যারা প্রবন্ধ পাঠ করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, কবি শাহাদাৎ হোসেন, মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সৈয়দ আলী আহসান, হাসান জামান প্রমুখ। হাসান জামানের প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘ইসলামী তমদ্দুন’। তিনি প্রবন্ধে ‘ইসলামের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সংস্কৃতি পুনর্নির্মাণের আহ্বান জানিয়ে বলতে চান ইসলামের মূল ভাব ও মূল্যবোধ মানবিক ও সর্বজনীন। তাই সমাজ জীবনে তার প্রয়োগ ‘মঙ্গলজনক। সম্মেলনে কেউ কেউ সরকারের মৃদু সমালোচনাও করেন এবং বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের জন্য তারা সরকারকে সমালোচনা করেননি, তারা সরকারকে সমালোচনা করেছিলেন ইসলামী আদর্শ যথেষ্ট পরিমাণে বাস্তবায়ন না করায়। তখন খাজা নাজিমুদ্দীন ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক দুই সরকারপ্রধানই পূর্ব বাংলার নেতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লক্ষ করা যায়, রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে তথা শাসকদের চেয়ে পূর্ব বাংলার একশ্রেণির কবি শিল্পী-সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ ছিলেন বেশি ইসলামপন্থী। তারা ভুলে গিয়েছিলেন পূর্ব বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং বাংলা সংস্কৃতি হিন্দু মুসলমানের সমন্বিত সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতিতে হিন্দু-মুসলমান-আদিবাসী সব ধর্মের উপাদানই আছে।
পূর্ব বাংলার সাহিত্যের মেজাজ ও চারিত্র পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য থেকে ভিন্ন হবে তা স্বাভাবিক– সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণে শুধু নয়, ‘৪৭-এর পর ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সত্ত্বার কারণেও। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কারণে দুই বাংলার সাহিত্যের ভিন্নতা জোর করে সৃষ্টির চেষ্টা সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। দুই বাংলার মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য বিভাজন চিরকালই ছিল, একই বাংলা ভাষায় সবাই কথা বললেও। পূর্ব বাংলার সাহিত্যকে নিষ্প্রয়োজনে ইসলামীকরণের চেষ্টা তখনকার তরুণ লেখকেরা সমর্থন করেননি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রমুখ কবি ও কথাশিল্পী মূলধারার বাংলা সাহিত্যের লেখক, তাঁরা ‘পাক-বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করেননি। অবশ্যই তাদের ভাষা ও শৈলী পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের থেকে সামান্য পরিমাণে হলেও আলাদা।
