মুনীর চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি ছিল তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথমটির শিরোনাম ‘অন রিলিজিয়ন’ (ধর্ম সম্বন্ধে), তারপর ‘অন ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ভাষা সম্বন্ধে) এবং ‘অন লাইফ’ (জীবন সম্বন্ধে)। প্রবন্ধটি সুলিখিত, কিন্তু তাঁর রচনাবলি বা আনিসুজ্জামানের মুনীর চৌধুরী জীবনীগ্রন্থে তার উল্লেখ নেই। অধ্যাপক চৌধুরী বলতে চেয়েছেন, পাকিস্তানিদের জাতীয় চেতনায় প্রাধান্য পাবে ইসলাম, কারণ পাকিস্তান মুসলমানদের বাসভূমি। মুনীর চৌধুরীর ভাষায় :
We are Pakistanis. We are, in Pakistan, overwhelmingly Muslims. The ideals of Islam formed a fundamental basis of our inspiration to build this separate homeland for the Muslims of Indo-Pakistan. It is only natural that the elements of our faith in Islam should now constitute the very backbone of our national consciousness. (9.36)
‘পাকিস্তানি ভাষা’ প্রসঙ্গে মুনীর চৌধুরীর যে পর্যবেক্ষণ, তা বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন পায়নি। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, একদিন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানে দুটি নতুন ধরনের উর্দু ও বাংলা ভাষা জন্ম নেবে। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ভাষায় ‘সিন্ধি, পাঞ্জাবি, পশতু প্রভৃতি ভাষার শব্দ ঢুকে যাবে এবং অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাও আর আগের মতো থাকবে না, সেখানে আরবি, ফারসি, উর্দু প্রভৃতি ভাষার শব্দ যোগ হয়ে এক নতুন ‘পাকিস্তানি বাংলা ভাষার জন্ম হবে। তাঁর ভাষায় :
… It is hoped that if the previously mentioned process of mutual give and take strikes deep roots into the speech habits of all Pakistanis then in no time a single new national language will automatically emerge out of it. It will be neither Urdu nor Bengali, but a very acceptable amalgam of all the languages of Pakistan, East or West, (পৃ. ২১)
সাংঘাতিক বক্তব্য। হাজার মাইল দূরে দুটি দেশে (হোক এক রাষ্ট্র) একটি অভিন্ন জাতীয় ভাষা সৃষ্টি করা সম্ভব ছিল না ১০০ বছরেও। যেখানে দুটি দেশেই রয়েছে কয়েকটি সমৃদ্ধ ভাষা। এসব ছিল কেন্দ্রীয় শাসকশ্রেণির প্রণোদনায় একেবারেই অবাস্তব ও ভুল চিন্তা। বাঙালি মুসলমানের বিভ্রান্তি। কী করে পাকিস্তানের দুই অংশে একটি অভিন্ন ভাষার সৃষ্টি হতে পারে? পৃথিবীর সেই নতুন ভাষাটির নাম কী। হতে পারত?
হাসান জাহানের প্রবন্ধটি আরও প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িকতার দোষে কলুষিত। তবে এ ধরনের বিভ্রান্ত চিন্তাই ছিল তখনকার বাঙালি লেখক, বুদ্ধিজীবীদের মাথায়। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় না ঘটলে এ-জাতীয় বিভ্রান্তির ঘূর্ণিপাকে পড়ে যেত বাঙালি জাতি। চরম ক্ষতি হতো বাঙালি সংস্কৃতির।
পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ, মৌলিক গণতন্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে লেখা খ্যাতিমান লেখকদের প্রপাগান্ডামূলক পুস্তক-পুস্তিকা বিএনআর প্রকাশ করলেও, এই সংস্থা বহু গুরুত্বপূর্ণ বইও বের করেছে। যদিও অনেক বইয়ের বিষয়বস্তু ইসলাম ও মুসলমান, তবু সেগুলো সুলিখিত এবং প্রয়োজনীয় প্রকাশনা। কাজী মোতাহার হোসেনের কয়েকটি জীবন বইটি প্রকাশ করে বিএনআর। তাতে নবাব স্যার সলিমুল্লাহসহ কয়েকজন মুসলমান মনীষীর জীবনকথা আলোচিত হয়।
বিএনআর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করে। তার নাম সুফীবাদ ও আমাদের সমাজ। মনোটাইপে ছাপা ২২০ পৃষ্ঠার বইটিতে ছিল চারটি প্রবন্ধ। কাজী দীন মুহম্মদের প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সুফীবাদের ভূমিকা’, আবদুল করিমের প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের সুফী-সম্প্রদায়’, মনির-উদ্-দীন ইউসুফের প্রবন্ধ ‘বাংলা সাহিত্যে সুফী প্রভাব’ এবং অধ্যক্ষ শইখ শরফউদ্দীনের প্রবন্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সুফী প্রভাব। গ্রন্থে ভূখণ্ডকে ‘বাংলাদেশ’ বলাও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই যে, খ্যাতিমান লেখকদের যেসব বই বিএনআর থেকে বেরিয়েছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাঁরা তাঁদের প্রকাশিত বইয়ের তালিকা থেকে ওই বইগুলোর নাম বাদ দেন। রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও মানসিক দীনতাবশত আমাদের শ্রদ্ধেয় লেখকেরা স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হন যে তাঁরা বিএনআরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং যেখান থেকে রয়্যালটির টাকা পুরোটাই পেয়েছেন। যদিও সে টাকা বাংলাদেশের মানুষেরই টাকা, আইয়ুব বা মোনায়েম খানের ব্যক্তিগত টাকা নয়। তারা ভেবেছেন ওই সব বইয়ের মালিকানা স্বীকার করলে প্রমাণিত হবে তারা পাকিস্তানপন্থী। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী পরিচয় খুবই বিপজ্জনক ছিল। তবে কেউ স্বীকার করতে না চাইলেও বাস্তবতা হলো ২৫ মার্চ ‘৭১-এর আগে বাংলাদেশের বাঙালি-অবাঙালি সব নাগরিকই ছিল পাকিস্তানি।
১৬. জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা
জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা বা বিএনআরের প্রথম পরিচালক ছিলেন জনৈক পশ্চিম পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার এফ আর খান। খুব বেশি দিন তিনি ছিলেন না। কোনো একটা অভিযোগে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এক যুগ সময়কালে বিএনআরের পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন কবীর চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ও হাসান জামান। ওবায়দুল্লাহ কবি ও সিএসপি অফিসার। কবীর চৌধুরী ও হাসান জামান শিক্ষাবিদ ও লেখক। তখন কবীর চৌধুরী ছিলেন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে গভর্নর মোনায়েম খান তাঁকে তাঁর নিজ জেলা ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে অধ্যক্ষ করে নিয়ে আসেন। মৌলিক লেখার চেয়ে অনুবাদেই তার আগ্রহ ছিল বেশি। ১৯৬৯-এর মার্চ থেকে ‘৭২-এর জুন পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন (তখনো মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হয়নি)।
