সেই ধরনের একটি পরিবেশে বিএনআর যখন জাতীয় সংহতির নামে ইসলাম ও মুসলমানকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিতে থাকে, তা প্রগতিকামীদের ভালো লাগেনি। পুস্তিকা ও ছোট বই যেমন প্রকাশ করেছে বিএনআর, তেমনি প্রখ্যাত লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ বইও বের করেছে। উদাহরণের জন্য একটি বইয়ের নাম করতে পারি, সেটি মুহম্মদ বরকতুল্লাহ সম্পাদিত দর্শনে মুসলমান।
দর্শনে মুসলমান গ্রন্থে আটজন বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিকের জীবন ও দর্শন নিয়ে আলোচনা ছিল এবং সে আলোচনা বর্ণনামূলক নয় পাণ্ডিত্যপূর্ণ। আল-কিন্দি সম্পর্কে লিখেছিলেন সাইয়েদ আবদুল হাই, মুহম্মদ বরকতুল্লাহ লিখেছিলেন দুজন সম্পর্কে দুটি মূল্যবান প্রবন্ধ, তারা হলেন আল ফারাবি ও ইবনে সিনা, শাইখ শরফুদ্দীন লিখেছিলেন আল-গাজ্জালী সম্পর্কে, শাইখ আবদুর রহিম লিখেছিলেন আর-রাযী সম্পর্কে, অধ্যক্ষ সাইঁদুর রহমান লিখেছিলেন ইবনে খলদুনের দর্শন ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে, এ এফ এম আবদুল আযীয লিখেছেন মুজাদ্দেদ আলফেসানী সম্পর্কে এবং মুহম্মদ এছহাক আলোচনা করেন শাহ অলীউল্লাহ দেহলভীর জীবন। তখন বিএনআরের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শাখার পরিচালক ছিলেন সিএসপি অফিসার কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। মুখবন্ধে তিনি লিখেছিলেন :
‘দর্শনের ইতিহাসে মুসলিম জাতির এক গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। দর্শনের ক্ষেত্রে মুসলমান মনীষীরা রেখে গেছেন এক বিস্ময়কর অবদান, যা মৌলিকতা, সর্বজনীনতা ও স্বকীয়তার দীপ্তিতে চির ভাস্বর, চির অম্লান। তাঁদের এই অবদানে সুসমৃদ্ধ হয়েছে মানুষের জ্ঞান-ভাণ্ডার।
‘দুঃখের বিষয়, মুসলিম দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের এই অমর অবদানের কথা বিধৃত করে বাঙলা ভাষায় কোন বই নেই বললেই চলে –অথচ আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে দেশবাসীর সম্মুখে তুলে ধরে আমাদের জাতীয় ভাবধারাকে সঠিক পথে বিকাশের জন্য এই ধরনের বইয়ের একান্ত প্রয়োজন।
‘তা ছাড়া, বর্তমানে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদও আমাদের জীবনে সৃষ্টি করেছে জটিলতা, বেড়ে চলেছে আমাদের মানসিক উদ্বেগ ও অশান্তি। আমাদের জীবনে যাতে শূন্যতার সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন জাতিকে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার সম্বন্ধে অবহিত করে সচেতন করে তোলা, যেন আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন এক স্থায়ী ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই আধ্যাত্মিক বুনিয়াদ গঠনে আমরা মুসলমান দার্শনিক ও মনীষীদের ভাবধারা ও জীবন-সাধনা থেকে উৎসাহ ও উদ্দীপনা লাভ করতে পারি। এদিকে লক্ষ্য রেখেই পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা দর্শনে মুসলমান পুস্তকটি প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে।
দর্শনে মুসলমান বইটির যা বিষয়বস্তু, তাতে এটি কলকাতার কোনো হিন্দু প্রকাশক যদি ছাপতেন কারও কিছু বলার ছিল না। বিষয়টি সর্বজনীন, সাম্প্রদায়িক নয়, যেমন সাম্প্রদায়িক নয় শ্রীচৈতন্য ও বাংলার বৈষ্ণববাদ। এসব হতে পারে ধর্ম বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো লেখকের আলোচনা ও গবেষণার বিষয়। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা ভাষার মূলধারার প্রধান লেখকদের কাছে ইসলাম ও মুসলমান ছিল অবহেলার জিনিস। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ দুটি কথা বলেছেন তা বিবেচনার বিষয়, তা হলো আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই এই বই প্রকাশ। এর অর্থ অতীতের যেকোনো দেশের যেকোনো মুসলমানের যা কিছু অর্জন তার উত্তরাধিকারী পাকিস্তানিরা। আরেকটি কথা বলেছেন, জাতিকে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার সম্বন্ধে অবহিত ও সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে এই বই প্রকাশ। এই বক্তব্যে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির উত্তরাধিকারের চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে। বাঙালির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারে হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম প্রভৃতি সব ধর্মের উপাদানই রয়েছে। সেই জিনিসটিকে পাকিস্তান সরকার অবহেলা করতে চায়। সেখানেই ছিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের আপত্তি।
‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ প্রচারও ছিল বিএনআরের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ বিষয়ে সংস্থাটি সেমিনার-সিম্পোজিয়াম করেছে এবং তাতে বাঙালি লেখক বুদ্ধিজীবীরা অংশ নিয়েছেন। বিএনআর ১৯৬০-৬১ সালে ইংরেজি ভাষায় একটি ছোট বই প্রকাশ করে তার নাম পাকিস্তানি ন্যাশনালিজম। তাতে ছিল তিনটি প্রবন্ধ, লিখেছিলেন তিনজন, পশ্চিম পাকিস্তানের শরিফ-আল-মুজাহিদ এবং পূর্ব বাংলার মুনীর চৌধুরী ও হাসান জামান। সম্পাদনা করেছিলেন শরিফ-আল-মুজাহিদ। পাকিস্তানের জাতীয় ভাবধারা এবং পুস্তিকাটির লেখকদের নিজস্ব চিন্তাধারা সম্পর্কে জানার জন্য বইটি বিশেষ সহায়ক। শরিফ-আল-মুজাহিদের প্রবন্ধে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটে। তাঁর প্রথম বাক্যটি এ রকম :
Pakistan was born as a result of the Indian Muslim’s claim to a separate nationhood in their own right.
শরিফ সাহেবের জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে ধারণাটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তার ভাষায় :
Pakistani nationalism is, thus, essentially an ideological nationalism, as against the territorial, linguistic or social nationalism of the West. Its roots go deep into history, …. (পৃ.৬)।
