ষাটের দশকে আইয়ুব খানের পাশে বসার সৌভাগ্য ছিল বিধাতার সান্নিধ্য লাভের মতো।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণের সেই স্মৃতি আরও বিস্তারিত আমাদের শুনিয়েছেন অনেকবার। প্রেসিডেন্টের এক পাশে শামসুর রাহমান, অন্য পাশে শহীদুল্লাহ কায়সার। মঞ্চে পশ্চিম পাকিস্তানের পুরস্কারপ্রাপ্ত অন্যান্য লেখক। শামসুর রাহমান তার স্মৃতিকথায় বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন, লেখক সংঘ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য নেই, যদিও লেখক সংঘের পরিক্রম-এর তিনি ছিলেন নিয়মিত লেখক এবং সেখান থেকে লেখার জন্য সম্মানী পেতেন। লেখক সংঘের বর্ধমান হাউসের ছোট্ট ঘরের আড্ডায়ও তিনি যোগ দিতেন।
লেখক সংঘ প্রকাশনীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে ছিল আনিসুজ্জামানের মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য। বিষয়বস্তুর কারণেই হোক বা পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণার জন্যই হোক, এই বইটিও তাকে এনে দেয় প্রচুর খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা। মুসলমান লেখকদের নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা করায় ১৯৬৫ সালে আনিসুজ্জামান পান। দাউদ পুরস্কার। মুনীর চৌধুরীও একই সঙ্গে পুরস্কৃত হন তাঁর মীর মানস-এর জন্য, যা প্রকাশ করেছিল বাংলা একাডেমি। এ সম্পর্কে আনিসুজ্জামান স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এ লেখেন :
‘দাউদ-পুরস্কার গ্রহণ করা আমাদের উচিত হয়েছিল কিনা, এ সম্পর্কে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে মতভেদ ঘটেছিল; কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি তর্কের ঝড় উঠেছিল পাক-ভারত সংঘর্ষের সময়ে মুনীর চৌধুরী ও আমাদের অপর দুই সহকর্মীর বেতার অনুষ্ঠান নিয়ে।’
[আনিসুজ্জামান, মুনীর চৌধুরী, ১৯৭৫, পৃ. ২৯]
লেখক সংঘ প্রকাশ করেছিল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্য সমালোচনামূলক গ্রন্থ অন্বেষণ, হামেদ আহমেদের উপন্যাস প্রবাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস ক্ষুধা ও আশা, হাসান আজিজুল হকের গল্পগ্রন্থ সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য, ইব্রাহীম খাঁর অনুবাদ ইতিকাহিনী, হাসান হাফিজুর রহমানের আরো দুটি মৃত্যু গল্পের বই প্রভৃতি। মুনীর চৌধুরীর শেকসপিয়ারের অনুবাদ মুখরা রমণী বশীকরণ, নজরুলের ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে বিদ্রোহী রণক্লান্ত– রবীন্দ্রনাথ থেকে সাম্প্রতিককালের ৪৬ কবির নজরুলের ওপর লেখা ৪৬টি কবিতার সংকলন। এটি সম্পাদনা করেন কবি আবদুল কাদির।
লেখক সংঘ দুটি চমৎকার কবিতার সংকলন প্রকাশ করে। আফ্রিকা ও এশিয়ার কবিদের কবিতার অনুবাদ আফ্রো-এশীয় কবিতাগুচ্ছ এবং সমাজতান্ত্রিক চীনের একটি নাটকের অনুবাদ শ্বেতকুন্তলা। পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের তিনটি সংগ্রহ প্রকাশের প্রকল্পও নেয়। পূর্ব বাংলার প্রবন্ধ সম্পাদনার দায়িত্ব নেন আহমদ শরীফ, পূর্ব বাংলার গল্পের দায়িত্ব পালন করেন মুনীর চৌধুরী এবং পূর্ব বাংলার কবিতার সম্পাদক শামসুর রাহমান। লেখক সংঘে জড়িত থাকার কথা শামসুর রাহমানের কোনো স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায় না।
লেখক সংঘে যারা কাজ করেছেন তারা আমাদের সাহিত্যের উপকার করেছেন। বাংলাদেশ ও বাঙালির তাতে কোনো ক্ষতি হয়নি। আইয়ুব সরকারের প্রশংসা করে প্রচারণাও সেখান থেকে হয়নি। কিন্তু লেখক সংঘের সঙ্গে জড়িত থাকাকে স্বাধীনতার পরে কেন তাঁরা অমর্যাদাকর মনে করেছেন তা বোধগম্য নয়।
১৫. বিএনআর প্রকাশনা
আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর পরই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কয়েকটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, সেগুলোর অন্যান্য কাজের মধ্যে প্রধান ছিল প্রকাশনা। ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব থেকে পাকিস্তানে আইয়ুব সরকার প্রকাশনার ওপর জোর দিয়ে থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রন্থ প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে, তার মধ্যে পাকিস্তান লেখক সংঘ, জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমির অন্যতম প্রধান কাজই ছিল বই প্রকাশ। আইয়ুব সরকার প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক একাডেমিকেও (স্বাধীনতার পরে যার নাম হয় বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ইসলাম ও মুসলমান-সংক্রান্ত বই প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র– ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তান– সাময়িকী শুধু নয়, বই প্রকাশের প্রকল্প নিয়েছিল। এসবের বাইরে পাকিস্তান পাবলিকেশনস নামে ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরাট প্রকাশনা সংস্থা। এই সব সরকারি প্রকাশনা সংস্থা থেকে ষাটের দশকে বহু মূল্যবান বই প্রকাশিত হয়েছে। সেসব বইয়ের লেখকেরা ছিলেন অনেকেই খ্যাতিমান ও বিশেষজ্ঞ।
জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা, ইংরেজিতে ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন সংক্ষেপে বিএনআর পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ধর্মীয় চেতনার দ্বারা জনগণের বন্ধন সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেয়। সে উদ্যোগ নির্দোষ ছিল না, তাতে সাম্প্রদায়িকতা ছিল।
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভেতর দিয়ে পাকিস্তানের জন্ম, কিন্তু পাকিস্তান। প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলায় অসাম্প্রদায়িকীকরণ শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। সমগ্র সমাজ নয়, তরুণদের একটি অংশ উপলব্ধি করে সাম্প্রদায়িকতা সমাজ বিকাশের জন্য এবং প্রগতির পথে বড় বাধা। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ভাষা আন্দোলন এবং তার পরে ছাত্র-যুব আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন প্রভৃতি সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী চেতনা বিকাশে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। তার ফলে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাংলার মানুষ প্রত্যাখ্যান করে, অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি মূলধারায় পরিণত হয়।
