পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় প্রাচীনপন্থী ও আধুনিকতাবাদী তরুণ দুই শ্রেণির লেখকই ছিলেন। প্রাচীনপন্থী ও পাকিস্তানবাদী লেখকদের সাহিত্য সাময়িকী ছিল মাসিক মাহে নও– কেন্দ্রীয় সরকারের পত্রিকা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হলেও লেখক সংঘের পরিক্রম ছিল আধুনিকতাবাদীদের সাহিত্যপত্র। বিষয়বস্তু হিসেবে মাহে নও-এ যেমন ইসলাম ও মুসলমান প্রাধান্য পেত, পরিক্রমে প্রাধান্য পেত বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিশ্বসাহিত্য। মাহে নও এর লেখকদের মধ্যে যেমন থাকতেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ বরকতউল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আবুল ফজল, আ ন ম বজলুর রশীদ, সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমদ প্রমুখ; তেমনি পরিক্রম-এ বেশি লিখতেন শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শওকত ওসমান, খান সারওয়ার মুর্শেদ, হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ। নারী সাহিত্যিকদের মধ্যে জাহানারা আরজু, জাহানারা হাকিম, লতিফা হিলালীসহ ছিলেন কয়েকজন। সৈয়দ শামসুল হকের অচেনা নামে আস্ত একটি উপন্যাস পরিক্রম এর এক সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ষাটের দশকের শেষ দিকে। মাহে নও-এর মতো পরিক্রমও লেখকদের পারিতোষিক দিত। সেকালে পূর্ব বাংলার লেখকদের জন্য তা ছিল বড় প্রাপ্তি।
কোথায় ছিল লেখক সংঘের কার্যালয়? কোথা থেকে বের হতো পরিক্রম? বাংলা একাডেমির গেট দিয়ে ঢুকতে বাঁ দিকে ছিল একটি ছোট্ট এক কামরার ঘর। ইট-সিমেন্টের দেয়াল কিন্তু টিনের চাল। ঘরটি তৈরি করা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে বর্ধমান হাউসের নিরাপত্তা প্রহরীদের বসার জন্য। ওই ঘরটি লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখাকে দেওয়া হয়েছিল তাদের কর্মকর্তাদের কার্যালয় হিসেবে। সেখানে খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকেরা প্রতিদিন কেউ না কেউ বসতেন। তবে প্রতি মাসে একবার একটি বড় বৈঠক হতো। ছাত্রজীবনে সেসব বৈঠকের কোনো কোনোটিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। মুনীর চৌধুরী, খান সারওয়ার মুর্শিদ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন দেশি ও বিদেশি সাহিত্য সম্পর্কে। কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমি সেই ঘরটি ভেঙে সেখানে একটি দালান বানিয়েছে। স্বাধীনতার পরে ওই ঘরটিতে ছিল বাংলা একাডেমির ডাকঘর। সেই সময়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ওই ঘরটি রেখে দেওয়া উচিত ছিল। হতে পারত সেখানে একটি ছোট্ট প্রদর্শনশালা। প্রদর্শিত হতে পারত পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সাহিত্য সাধনার জিনিসপত্র।
খুবই সুন্দরভাবে মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হতো পরিক্রম। কিছুদিন নিউজপ্রিন্টে ছাপা হতো, পরে কর্ণফুলী মিলের সাদা উন্নতমানের কাগজে বের হতো। মনেটাইপে নির্ভুল ছাপা। অঙ্গসজ্জা ভালো। শুধু লেখকেরা নন, চিত্রশিল্পীরাও পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন লেখক সংঘ থেকে। পরিক্রম-এর প্রচ্ছদ কাইয়ুম চৌধুরী এবং দেবদাস চক্রবর্তীই সবচেয়ে বেশি আঁকতেন। লেখক সংঘের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত থাকলেও স্বাধীনতার পরে তারা উভয়েই আইয়ুব সরকার ও লেখক সংঘের ঘোর সমালোচকে পরিণত হন। অব্যাহত সেই সরকারের নিন্দা করতেন।
প্রকাশনাশিল্পের সেই ঘোর দুর্দিনে লেখক সংঘ এবং বাংলা একাডেমি আধুনিক প্রকাশনার সূচনা করে। ষাটের দশকে বাংলা একাডেমি বহু মূল্যবান বই প্রকাশ করেছে, শুধু গবেষণামূলক বই নয়, সৃষ্টিশীল বইও। লেখক সংঘ অত করেনি, তবে যা করেছে তার গুণগত মূল্য অসামান্য। ফররুখ আহমদের কাব্য-নাটক নৌফেল ও হাতেম সম্ভবত লেখক সংঘ প্রকাশনীর প্রথম বই। শামসুর রাহমানের দ্বিতীয় ও শ্রেষ্ঠ কবিতার বই রৌদ্র করোটিতে প্রকাশ করে লেখক সংঘ। শামসুর রাহমান তাঁর এলোমেলো স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘বই বাবদ আমার প্রাপ্য টাকাও চটজলদি পেয়ে গেলাম। সেখানে অন্য প্রকাশকেরা চটজলদি তো দূরের কথা, দেরিতেও টাকা দিতেন না। তিনি আরও লিখেছেন, ‘…রৌদ্র করোটিতের জন্য আদমজী পুরস্কার পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম।… সেবার কথাসাহিত্যে আদমজী পুরস্কার পান শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার তাঁর সারেং বৌ উপন্যাসের জন্য। পশ্চিম পাকিস্তানের আহমদ নদিম কাশমি পুরস্কৃত হন কবিতার জন্য। তিনি একজন প্রগতিশীল উর্দু কবি। এই বর্ষীয়ান কবি ছোটগল্প লিখেও প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
[কালের ধুলোয় লেখা, পৃ. ১৫৪-৫৫]
আদমজী, দাউদ প্রভৃতি পুরস্কার সরকারের তত্ত্বাবধানেই প্রবর্তিত হয়। জমকালো পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান হতো করাচিতে। শামসুর রাহমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ পিআইএ বা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের বিমানে করাচি যান। পুরস্কারটি গ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের হাত থেকে। শামসুর রাহমানের স্মৃতিচারণা :
‘শহীদুল্লাহ কায়সার এবং আমি ১৯৬৩ সালে করাচিতে যাই আদমজী পুরস্কার গ্রহণের উদ্দেশ্যে। শহীদুল্লাহ কায়সারের পরিচিতি আমার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ছিল সঙ্গত কারণেই। প্রগতিশীল রাজনীতিতে সমর্পিত ছিলেন তিনি।… পুরস্কারের অর্থমূল্য আহামরি কিছু ছিল না। [কথাটি সঠিক নয়] তবে সেকালের পক্ষে ভালোই। তবে কবিতার জন্য জীবনের প্রথম পুরস্কার লাভের একটি আলাদা শিহরণ বোধ করেছিলাম। পুরস্কারটি গ্রহণ করতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের হাত থেকে, যার বিরুদ্ধে হাতির শুঁড় কবিতাটি লিখেছিলাম। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমাদের বসতে হয়েছিল একেবারে প্রেসিডেন্টের পাশে। কথা প্রসঙ্গে আইয়ুব খান আমাকে আমার বইয়ের নাম এবং তার অর্থ অনুবাদ করতে বললেন। আমি নির্দ্বিধায় বললাম, সানরেইস অন দ্য স্কাল। সেই মুহূর্তে আমার মুখে রৌদ্র করোটিতের ইংরেজি এ রকমই এসেছিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব মৃদু হাসলেন।’ [পৃ. ১৫৫]
