তিনি লেখকদের উদ্দেশে পাঠিয়েছিলেন একটি বাণী। সেই বাণী পাঠ করে শোনান মুনীর চৌধুরী। লেখকদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বলেছিলেন :
‘পাকিস্তান লেখক সংঘের প্রতি অতীতে প্রেরিত আমার বিভিন্ন বাণী, আপনাদের পেশা, কার্যধারা, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে : সর্বোপরি চিন্তা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতায় আমার সক্রিয় সহযোগিতা আপনাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার গভীর উৎসাহের পরিচয়।
‘পাকিস্তানের সামনে আজ একটি বড় সমস্যা হলো পাকিস্তানের আদর্শ অনুযায়ী জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা। আমি জানি না সবাই এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কি না। এই কর্মে আপনাদের দায়িত্ব সর্বাধিক, কারণ লেখক তার পরিবেশের বাহ্যিক, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক দিগন্তের যথার্থ রূপায়ণে ও প্রতিফলনের মাধ্যমে এই ঐক্যকে যথেষ্ট প্রভাবান্বিত করতে পারেন।
‘আমাদের সামনে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে, তার মূল উচ্ছেদ কেবল আইনের সাহায্যেই করা সম্ভব নয়, সামাজিক দুর্নীতির ব্যাপক উচ্ছেদ আপনাদেরই দায়িত্ব।
‘আমাদের উত্তরসূরিরা যেন কখনো বলতে না পারেন যে আমাদের সামনে একটি স্বাধীন ও মহৎ জাতি গঠন করার যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল, তা আমরা নষ্ট করেছি। ইতিহাসের পথনির্দেশে আপনাদের লেখনী অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। আমার আবেদন, আপনাদের লেখনী সর্বপ্রথম দেশের জন্য ব্যবহার করুন, যে ব্যবহার আপনারাই আমার চেয়ে ভালো জানেন। আপনারা সর্বদা আমার পূর্ণ সহযোগিতা লাভ করবেন।’
বাঙালি লেখকদের প্রভাবশালী অংশ আইয়ুবের দেওয়া কোনো সুযোগই নষ্ট হতে দেননি। এবং লাভ করেছেন তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা ও পেয়েছেন তাঁর আনুকূল্য। ওদিকে প্রগতিশীল ও স্বায়ত্তশাসনকামী রাজনীতিকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ছিল কারাগারগুলো।
১৪. আইয়ুবীয় পৃষ্ঠপোষকতা
প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মোহাম্মদ আইয়ুব খান যে উদ্দেশ্যেই পাকিস্তান লেখক সংঘ এবং জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা বা বিএনআর প্রতিষ্ঠা করুন না কেন পূর্ব পাকিস্তানের আধুনিক কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের জন্য তা ছিল আশীর্বাদের মতো। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব বাংলার সাহিত্যে বহু আধুনিক চেতনাসম্পন্ন কবি সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু তাঁদের রচনা প্রকাশের জায়গার ছিল অভাব। পুরোনো দুটি বিখ্যাত সাময়িকী– মোহাম্মদী ও সওগাত নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছিল। মাহে নও ছিল সরকারি সাময়িকী। সিকান্দার আবু জাফর প্রকাশ করেন সমকাল– আধুনিকতাবাদীদের মুখপত্র। সেটা বছরে বের হতো তিন-চার সংখ্যা। সব কবি সাহিত্যিককে ধারণ করার ক্ষমতা সমকাল-এর ছিল না। আরও দু-একটি সাহিত্যপত্র বের হচ্ছিল অতি অনিয়মিত। মানসম্মত সাহিত্যের প্রসার ঘটাতে মানসম্মত ও রুচিসম্মত সাহিত্য সাময়িকীর প্রয়োজন। সেই রকম নিয়মিত সাহিত্যপত্র পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় ছিল না।
সেই অভাব পূরণে পাকিস্তান লেখক সংঘের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থানুকূল্যে লেখক সংঘ সাহিত্য সাময়িকী ও বই প্রকাশ শুরু করে। লেখক সংঘ পত্রিকা নামে কবি গোলাম মোস্তফার সম্পাদনায় সংগঠনের সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়। তা সম্ভবত একটি সংখ্যাই বেরিয়েছিল। তারপর লেখক সংঘ পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পরিক্রম–পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখার মাসিক সাহিত্য ও সংস্কৃতিপত্র। প্রথমে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও রফিকুল ইসলামের সম্পাদনায় এবং পরে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় পুরো ষাটের দশক পরিক্রম নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। পরিক্রমের একটি সম্পাদনা পরিষদ ছিল। তাতে ছিলেন সৈয়দ মুর্তজা আলী, আহমদ শরীফ, আবদুর রশীদ খান, আবদুল গনি হাজারী ও জাহানারা আরজু। তবে তাঁরা ছিলেন নামেমাত্র। সম্পাদনার দায়িত্ব পুরোটাই পালন করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম ও হাসান হাফিজুর রহমান। এবং শেষের দিকে কখনো তাদের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন নজরুলবিষয়ক লেখক শাহাবুদ্দিন আহমদ ও রশীদ হায়দার। প্রকাশক হিসেবে নাম থাকত নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখের।
পরিক্রম নামটির মধ্যেই আধুনিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। পঞ্চাশের দশক থেকে ঢাকার মার্কিন তথ্যকেন্দ্র, যার অফিস ছিল প্রেসক্লাবের উল্টো দিকে, মার্কিন পরিক্রমা নামে একটি ম্যাগাজিন বের করত। লেখক সংঘের কর্মকর্তারা ওই নামটি থেকে প্রভাবিত হয়ে পরিক্রমা নামে সাময়িকী প্রকাশের উদ্যোগ নেন। উদ্যোক্তাদের কাছে শুনেছি, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পরামর্শ দেন পরিক্রমা নয়, পরিক্রম নামকরণই হবে যথার্থ। তিনি বলেন, ‘পরিক্রমার ম-এর আকার ফেলে দাও।’ মুনীর চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম বা হাসান হাফিজুর রহমান কেউই পাকিস্তানবিরোধী ছিলেন না, তবে একই সঙ্গে বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। অর্থাৎ তাঁরা বাঙালি জাতীয়তাবাদীও ছিলেন।
লেখক সংঘের পশ্চিমাঞ্চলের কার্যালয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী লাহোরে। তাতে যুক্ত ছিলেন উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি প্রভৃতি ভাষার খ্যাতিমান লেখকেরা। সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রাধান্য ছিল উর্দু লেখকদের। দুই অঞ্চলের লেখকদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে পাকিস্তান লেখক সংঘ।
