আমাদের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ‘চরিত্র পরিশুদ্ধ’ করার তাগিদ আসে অবাঙালি সামরিক শাসকের কাছ থেকে। দেশের বুদ্ধিজীবীগণের দায়িত্ব সম্পর্কে আইয়ুব খান। বলেন, ‘চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমান লোক হিসেবে আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলি নির্ধারণ, ও তার সঠিক সমাধানের উপায় উদ্ভাবন করে তারা খাঁটি স্বদেশপ্রেমের পরিচয় দেবেন। জাতীয় পুনর্গঠনের কাজে সাহায্য করার এই-ই তাঁদের পক্ষে উস্কৃষ্ট পন্থা।
আমাদের খ্যাতিমান লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা সেদিন বাস্তবিকই ‘খাঁটি স্বদেশপ্রেমের পরিচয়’ দিয়েছিলেন। অন্যদিকে আমাদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা খাঁটি স্বদেশপ্রেমের পরিচয় দিতে না পারায় নাজিমুদ্দীন রোডের উঁচু পাঁচিলঘেরা বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন।
জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা ও পাকিস্তান লেখক সংঘের মূল উদ্দেশ্য যা-ই হোক, এই দুই সংস্থা বেশ কিছু ইতিবাচক কাজও করেছিল, তাতে আমাদের লেখকসমাজ উপকৃত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছিলেন সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদীরা।
১৯৫৯-এর ৪-৫ জুলাই লাহোরে পাকিস্তান লেখক সংঘের কার্যনির্বাহী পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান লেখকদের অনেকেই তাতে যোগ দেন। অধিবেশনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তার মধ্যে একটি ছিল ‘সংঘের তরফ থেকে একটি প্রকাশনালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম গ্রহণ করা। এই সিদ্ধান্তে বাঙালি লেখকেরা খুবই উফুল্ল হন। তখন ঢাকায় প্রকাশনা শিল্পের শৈশব অবস্থা। সাহিত্যের বইপত্রের প্রকাশক পাওয়া ছিল খুবই কঠিন।
সংঘের দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়, ‘সংঘের সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ সুবিধাজনক জীবন-বীমা পলিসির বন্দোবস্ত করা। এ সম্পর্কে আমাদের লেখকদের মন্তব্য ছিল, ‘এসব সংবাদ নিঃসন্দেহে আনন্দদায়ক। কারণ, বাঙালি লেখকদের অনেকেরই আর্থিক অবস্থা ছিল খারাপ। অকালে মারা গেলে পরিবার-পরিজন অসহায় হয়ে পড়ত। লেখকদের সুবিধাজনক জীবন-বীমা থাকলে তাদের মৃত্যুর পর পরিবার কিছুটা উপকৃত হতে পারত।
লেখক সংঘের বই প্রকাশের সংবাদে লেখকদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। মাহে নও মন্তব্য করেছিল, দেশের সকল স্থানের সকল শ্রেণির সৃষ্টিধর্মী লেখকেরা সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের উদ্যোগে তাদের শ্রেষ্ঠ রচনাবলী প্রকাশনের যে ব্যবস্থা করছেন, তার ফলে সাহিত্যক্ষেত্রে নূতন উদ্দীপনা সৃষ্টি হতে বাধ্য।
প্রকাশনা শুরু করার জন্য লেখক সংঘকে একটি তহবিলও করে দেওয়া হয়। পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গিল্ডকে বিনা সুদে এক লক্ষ টাকা ঋণ মঞ্জুর’ করা হয়েছে। এই অর্থ দ্বারা গিল্ডের নিজস্ব প্রকাশনালয় প্রতিষ্ঠার মৌলিক পরিকল্পনা কার্যকরী করার প্রাথমিক ব্যবস্থাদি ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে বলতে ১৯৫৮-র এপ্রিলের মধ্যে।
পাকিস্তান লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার এক বছর উপলক্ষে এক নিবন্ধে মাহে নও লিখেছিল:
‘১৯৫৮ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত গোটা জাতিই এই ব্যাপক নৈরাশ্য আর হতাশার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল, জাতীয় জীবন ও চিন্তাধারার রূপকার ও শিল্পী হিসেবে লেখকগণ হয়ে পড়েছিলেন দিশেহারা।’
[মাহে নও, জানুয়ারি ১৯৬০]
এই বক্তব্যটি বস্তুত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সামরিক সরকারের। সামরিক শাসনের আগে পাকিস্তানের তথা বাংলার লেখক-শিল্পীরা ‘হতাশার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিলেন’ এবং তাঁরা হয়েছিলেন ‘দিশেহারা’, তেমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে বিভেদ, হিংসা-প্রতিহিংসা ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে রাজনীতি খুব খারাপ অবস্থায় গিয়ে পড়েছিল। তাতে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেওয়াও স্বাভাবিক।
সরকার-সমর্থক লেখক-বুদ্ধিজীবীরা বলেন, লেখক সংঘ বা রাইটার্স গিল্ডকে একটি অভিনব ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন বলেও অভিহিত করা যেতে পারে। অভিনব’ বললাম এই কারণে যে, ট্রেড ইউনিয়নকে যেমন শ্রমিকদের তরফ থেকে মালিকদের কাছে বা সরকারের কাছে দাবিদাওয়া পেশ করতে হয় এবং সে জন্য হয়তো আন্দোলন করতে হয়, রাইটার্স গিল্ডের বেলায় সে কথাটা একেবারেই খাটে না। কারণ, বর্তমান বিপ্লবী সরকারের সক্রিয় সহযোগিতার মধ্য দিয়েই এর গোড়াপত্তন হয়েছে। বস্তুত, রাইটার্স গিল্ডের প্রতিষ্ঠা বিপ্লবী সরকারের বহুমুখী প্রগতিশীল কর্মসূচির একটি গৌরবময় অধ্যায় বললেও অত্যুক্তি করা হয় না।
‘রাইটার্স গিল্ড প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাটাই মূলত একটি বিপ্লবী চিন্তাধারার পরিচায়ক। শুধু এশিয়া ও আফ্রিকাতেই নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেই এর নজির বড় একটা চোখে পড়ে না।
[মাহে নও]
লেখকদের জন্য জীবন-বীমা ব্যবস্থা করা ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। যদিও সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতায় ফলপ্রসূ হয়নি।
১৯৫৯-এর জুলাইতেই লাহোরে লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির অধিবেশনে ঘোষণা করা হয়েছিল :
‘লেখক সংঘের তরফ থেকে প্রত্যেক সদস্যের জন্য ৫০০০ টাকার একটি জীবন-বীমার পলিসির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই পলিসির জন্য লেখক-সদস্যদের মাসিক মাত্র ৫ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হবে।’ তবে সেকালে এমন লেখকই ছিলেন বেশি, যিনি ৫ টাকা প্রিমিয়াম দিলে ১০ দিন বাজার করতে পারতেন না।
১৯৬২-র ৩১ জানুয়ারি লেখক সংঘের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উৎসব হয় করাচিতে। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিদলে গিয়েছিলেন পূর্বাঞ্চল শাখার সম্পাদক মুনীর চৌধুরী, লেখক সংঘ পত্রিকার দুজন সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই। সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব উপস্থিত থাকতে পারেননি অনিবার্য কারণে।
