[‘দূরদর্শী রচিত হরফ সমস্যা পুস্তিকা’]
সমাজে যখন ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে, তখন কেউ তাঁর মর্জিমতো কোনো ‘স্কিম’ দিতেই পারেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টাও চালাতে পারেন। আরবি কেন, কেউ যদি বলেন এশিয়ার মানুষ হিসেবে বাংলা ভাষা চীনা হরফে লিখলেই জাতির উপকার হবে, তাতে বিরাট দেশ চীনের সঙ্গে বাঙালিদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে, তাতেই-বা বিচলিত হওয়ার কী আছে? কিন্তু সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষা সংস্কার কমিটির সদস্য করা কোনো দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় নয়। তা হলে বুঝতে হবে সরকারেরও কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে। মুসলিম লীগ সরকারের সেই দুরভিসন্ধি ছিল না –এমন কথা বলা যায় না। উর্দু বা পাঞ্জাবি ভাষা সংস্কারের চেয়ে উন্নত বাংলা ভাষা সংস্কারের জন্য পাকিস্তানি সরকারের মাথাব্যথা ছিল বেশি।
কেন বাংলা ভাষা নিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকশ্রেণির এত মাথাব্যথা। জনবহুল পূর্ব বাংলার বহু সমস্যা ছিল। সেগুলো সমাধানের ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ না নিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা না করে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে বিকলাঙ্গ করার অপচেষ্টার মধ্যে সুদূর দুরভিসন্ধি ছিল।
১৩. আইয়ুবশাহীর অভ্যুদয় ও লেখক সংঘ
বন্দুকের নলের মুখে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র বাতিল করে সেকালে যেসব দেশে সামরিক শাসন জারি করা হতো, সেই শাসকেরা ওই রকম ক্ষমতা দখলকে ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করতেন। শুধু তাঁরা যে করতেন তা নয়, তাঁদের তাঁবেদার ও সমর্থকেরাও তাকে বিপ্লবই বলতে চাইতেন। আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলকেও আখ্যায়িত করা হলো ‘বিপ্লব’ বলে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মুহাম্মদ আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের হর্তা-কর্তা বিধাতা নিযুক্ত করেছিলেন যাকে, তার নাম মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওমরাও খান। তাকে চোখে দেখা তো দূরের কথা, বাংলার মানুষ তাঁর নামটিও কখনো শোনেনি। তিনিই হলেন আমাদের শাসক। আইন পরিষদ নেই, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেই, তিনি একাই সব। তেমন ধরনের সরকার বাংলার মানুষ বখতিয়ার খিলজির পর থেকে হাজার বছরে কখনো দেখেনি। সিরাজদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজ রবার্ট ক্লাইভ এ দেশের শাসনভার গ্রহণ করলেও মীর জাফর আলী খান ওরফে মীরজাফর নামেমাত্র হলেও বাংলার নবাব ছিলেন কিছুকাল। ৫৮-র সামরিক শাসনের পর এ দেশে বেসামরিক নাগরিকের তিলমাত্র ক্ষমতা থাকল না।
তবে এটাও ঠিক, আইয়ুব ক্ষমতা দখল করে অনেকগুলো ভালো সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেন। তার প্রথমটি যদিও কবি-সাহিত্যিকদের জন্য। সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ প্রভৃতি সব পেশার মানুষের জন্যও সংস্কারের কাজ শুরু করেন। যেমন শিল্পসচিব আবুল কাসেম খানের সভাপতিত্বে গঠিত হয় ১২ সদস্যবিশিষ্ট বিজ্ঞান কমিশন ১৯৫৯-এর শুরুতেই। ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন বা জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থার পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এফ আর খান। গঠিত হয় কুদরতুল্লাহ শাহাবের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড বা পাকিস্তান লেখক সংঘ। জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা নামটি চমৎকার, কিন্তু কী উদ্দেশ্যে সেটি গঠিত তা প্রথমে বোঝা যায়নি।
৩১ জানুয়ারি ‘৫৯, পাকিস্তানের দুই অংশের খ্যাতিমান লেখকদের এক সম্মেলনে আইয়ুব বলেন :
‘পাকিস্তানের লেখকগণের মধ্যে সংগ্রাম করার শক্তি এবং সৃজন করার যথেষ্ট প্রতিভা রয়েছে। তারা পাকিস্তানের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন এবং পাকিস্তানের সংহতির জন্য অভাবনীয় ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম।’
তিনি বলেন, পাকিস্তানের জাতীয় সাহিত্যে থাকবে পাকিস্তানের আদর্শের রূপায়ণ। কিন্তু সেই আদর্শ কী? সে প্রশ্নের জবাবও তিনিই দেন :
‘পাকিস্তানের জনসাধারণের জন্য অধিকতর সুখী, আরামদায়ক, উন্নত, আনন্দময় ও সৃষ্টিশীল জীবনব্যবস্থার বাস্তব রূপায়ণই পাকিস্তানের আদর্শ। এই আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত করার ব্যাপারে লেখকগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন।’
শুধু এটুকু নয়, তিনি আরেকটু খোলাসা করে বলেন:
‘আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ইসলামের নীতিগুলোকে আধুনিক মানের উপযোগী ভাষায় প্রকাশ করা, কারণ আধুনিক ভাষাই হচ্ছে যথার্থ শক্তির ভাষা। এ ভাষা। অবশ্যই বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও চলতি ঘটনাবলি প্রকাশের ভাষা হওয়া উচিত; কারণ দুনিয়া ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে, আর এখানে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের যথোপযুক্ত ভূমিকা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’
আইয়ুব খান জাতীয় সংহতি, জাতীয় পুনর্গঠন ও পাকিস্তানি জাতীয় চরিত্র গঠনের ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং সে কাজে তিনি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতা চান এবং তা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পানও। ক্ষমতা দখলের ছয় মাসের মধ্যে জেনারেল আইয়ুব গঠন করেন ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন বা জাতীয় পুনর্গঠন সংস্থা। ২৩ মার্চ ১৯৫৯, প্রেসিডেন্ট এক বেতার ভাষণে বলেন :
‘আমাদের সম্মুখে জাতীয় পুনর্গঠন ও ব্যক্তিগত চরিত্র পরিশুদ্ধ করার দায়িত্ব রয়েছে এবং কেবল স্ব-স্ব কর্তব্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করেই আমরা তা পালন করতে পারি।’
