উদ্বোধনী ভাষণে নূরুল আমিনের বক্তব্য মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁর দৈনিক আজাদ-এর প্রতিবেদনে ছিল এ রকম :
‘যদি রাষ্ট্রের জনসাধারণের মাতৃভাষার মধ্যস্থতায় রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা না হয়, তবে নাগরিকদের সহিত সে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অতি শীঘ্র বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের উপর বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষা চাপানো যুক্তিযুক্ত নহে। বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে ঘোষণা করার কোনও প্রতিবন্ধক নাই বলিয়াই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
নূরুল আমিন আরও বলেন :
‘এসলাম ধর্মের সহিত উর্দু ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলিয়া আলেমগণ যে দাবী উত্থাপন করেন তাহা যুক্তিসঙ্গত নহে। সত্য কথা বলিতে কি এসলাম ধর্মের সহিত উর্দু ভাষার অধিক সম্পর্ক নাই। এসলাম ধর্মের সহিত ভারতের অন্যান্য ভাষার যতটা সম্পর্ক উর্দুর সহিতও ঠিক ততটা সম্পর্কই আছে।’
ওই সভায় নূরুল আমিন আরও কিছু কথা বলেছিলেন বাংলা ভাষা সম্পর্কে। তিনি বলেছিলেন বাংলা ব্যাকরণ ও বানান সহজ করা প্রয়োজন। সে ব্যাপারে বাঙালি সাহিত্যিক ও পণ্ডিতদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। নূরুল আমিনের বক্তব্যে পূর্ব বাংলার অধিকাংশ লীগ নেতার মতামতের প্রতিফলন ঘটে।
ওই সভায় কবি জসীমউদ্দীন তাঁর বক্তৃতায় দৃঢ়তার সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। তাঁর দাবির পক্ষে তিনি বাঙালি কবির নোবেল পুরস্কার পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি এমনও বলেন, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হবে না– এটা কোনো বিতর্কের বিষয়ই হতে পারে না। এরপর ১৯৫০ সালেও শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সরকারি বাসভবনে কবি সাহিত্যিকদের এক বৈঠকে মন্ত্রী উর্দুর প্রতি সমর্থন দেওয়ায় সেখানে জসীমউদ্দীন রূঢ়ভাবে প্রতিবাদ করেন। এবং যারা মন্ত্রীকে মৃদু সমর্থন করে স্তাবকতা করছিলেন, তাঁদের ওপর শারীরিকভাবে চড়াও হতে উদ্যত হন। সৈয়দ আলী আহসান মন্ত্রীর পক্ষে ছিলেন।
যা হোক, বাঙালি কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও বিচার-বিবেচনা থাকলে ভাষা আন্দোলন অল্প দিনেই শেষ হতে পারত। এবং বাহান্নতে এতগুলো তরুণের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হতো না। বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি ও সুবিধাবাদিতার কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার সাহস পায়। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সংহত করার বহু উপায় ছিল। জনগণ সুসংগঠিতই ছিল। কিন্তু সবকিছু বাদ দিয়ে বাংলা ভাষা নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এবং তাদের সেই অপকর্মে তারা সহযোগী হিসেবে পায় পূর্ব বাংলার একশ্রেণির কবি সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদকে। একটি কথা শুনতে স্বাধীন বাংলাদেশের অনেকেরই ভালো লাগবে না, তা হলো উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা জিন্নাহ মাত্র দুবার –রেসকোর্সে ও কার্জন হলে উচ্চারণ করেছিলেন। তারপর তিনি এক বছর জীবিত ছিলেন, আর কখনো রাষ্ট্রভাষা নিয়ে কোনো কথা বলেননি; তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করেছেন বাংলার উর্দুভাষী রাজনীতিবিদ– খাজা নাজিমুদ্দীন। রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে স্বাধীনতা অর্জনের সময় থেকেই নানা রকম উন্মত্ততা দেখা দেয় একশ্রেণির শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে। কেউ তোলেন আরবিকে রাষ্ট্রভাষার দাবি, কেউ প্রস্তাব করেন আরবি হরফে বাংলা লেখার। আরবি অক্ষরে বাংলা লেখার প্রস্তাব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক আগেই একবার করা হয়েছিল। মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত আল-এসলাম-এর এক নিবন্ধে ১৯১৬ সালে বলা হয়েছিল :
‘উর্দুর ন্যায় আমাদের ভাষা আরবী অক্ষরে কায়দা মতে লেখা হইলে আরব ও পারস্যের লোক অতি সহজে আমাদের ভাষা পড়িতে ও লিখিতে পারিবে এবং আমরাও তাহাদের ভাষা পড়িতে ও লিখিতে পারি। আমাদের মাতৃভাষা আরবী অক্ষরে লিখিতে হইলে নিশ্চয়ই তাহার প্রতি সাধারণের ভক্তি অতি বেশি হইবে… মুসলমানদের উচিত এই বিষয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করা। কারণ এই বর্ণ-পরিচয় দ্বারা তাহারা তাহাদের সমস্ত দেশের ভাষা সকল পড়িতে পারিবেন এবং এশিয়াবাসীগণের মধ্যে প্রণয় ও ঘনিষ্ঠতা বাড়িবে।’
[‘বাঙালীর মাতৃভাষা’, আল-এসলাম, ১ম বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ, ১৩২২]
কী সাংঘাতিক প্রস্তাব ও যুক্তি! ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, সেই ধরনের মানুষ ছাড়া এমন প্রস্তাব কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। যা হোক, ও কথায় কেউ কান দেয়নি। কিন্তু বিষয়টি শেষ হয়েও যায়নি। আরবি হরফে বাংলা লেখার স্কিম আবার সামনে আসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। ১৯৪৯ সালে পূর্ব বাংলা সরকার গঠন করে ভাষা কমিটি। সেই কমিটিতে ভাষাবিজ্ঞানী ও বড় সাহিত্যিকদের চেয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী মোল্লা-মৌলভির প্রাধান্য ছিল। তখন প্রকাশিত একটি পুস্তিকায় বলা হয়েছিল :
‘…. ভুলিলে চলিবে না যে বাংলা ভাষায় আরবী হরফ এস্তেমালের ধারণাটি কোন বিদেশীর চিন্তাপ্রসূত নয়….বা পার্টিশান [১৯৪৭] পরবর্তীকালের কোন ভূঁইফোড় প্ল্যান নয়। বহু বৎসর পূর্বেও এ খেয়ালটি দানা বাঁধিয়াছিল পূর্ব বাংলারই একজন মহৎ এবং মোত্তাকী সন্তানের মনে। চাটগাঁয়ের মওলানা জুলফিকার আলী সাহেবই ইহার অগ্রদূত। তিনি একজন খোদাভক্ত ও বিজ্ঞ লোক এবং সায়েমুদ্দাহার (নিষিদ্ধ দিনগুলি ছাড়া তিনি সারা বৎসর রোজা রাখেন)। দারিদ্র সত্ত্বেও তিনি প্রায় বিশ বৎসর যাবত আরবী হরফে একখানা বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাইয়া আসিতেছেন। এই রূপ দৃঢ় অধ্যবসায় ও উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করা কেবল ইসলামের প্রাথমিক যুগের কথা মনে করাইয়া দেয় এবং আজকাল আমাদের মধ্যে অতি অল্পই দেখা যায়। অতঃপর তাঁর এই স্কিমের প্রতি মাশ্ৰেকী পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান] ওলামায়ে ইসলামের নজর পড়ে। তাঁরা সৰ্বান্তঃকরণে ইহার সমর্থন এবং সার পারাস্তি [পৃষ্ঠপোষকতা] করিয়াছেন। কাজে কাজেই স্কিমটি খাঁটি দেশী, বিদেশীয় কল্পনাপ্রসূত নহে।’
