সেদিন ফররুখ সুস্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবীকে চেপে রাখা কারুর সাধ্যেই কুলাবে না। ঐ ন্যায়সঙ্গত দাবীর বলেই পাকিস্তানের জনগণ শুধু আহার্যের নয় –সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকার কেড়ে নেবে।’
বাঙালি তার ভাষার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। নতুন নতুন ভাষাসৈনিকের দাবিদার আজ অসংখ্য মানুষ। বহু সুবিধাবাদী ও বিভ্রান্ত মানুষ সেদিন এদিকেও ছিলেন ওদিকেও ছিলেন। ফররুখ আহমদের বহু নীতিই অভ্রান্ত ছিল না, কিন্তু বাংলা ভাষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি ইসলামিক আদর্শের কথা বলেছেন, কিন্তু ঘৃণা করেছেন পশ্চিম পাকিস্তানি মোনাফেক শাসক শোষকদের। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ফররুখকে যারা অবহেলা করেছেন, তাঁরা কেউ পাকিস্তানি আমলে তাঁর চেয়ে বেশি সততার পরিচয় দিয়েছেন, তেমন প্রমাণ নেই। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেননি বলে তার সমর্থনে তিনি একটি বাক্যও লেখেননি, বিরোধিতা করেও রেডিও-টেলিভিশনেও বক্তব্য দেননি। কিন্তু রেডিও টেলিভিশনে কথিকা প্রচার করেছেন দেশ স্বাভাবিক আছে, কোনো গোলাগুলি নেই– এইসব বলে, স্বাধীনতার পরে তারা অবলীলায় সরকারে ভিড়ে গেছেন। ফররুখ মারা গেছেন অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা থেকে।
১২. রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে
১৯৪৭-৪৮ সালের পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে নানা রকম বিভ্রান্তি ছিল। তখন পূর্ব বাংলায় শিক্ষিত সমাজের পরিধি ছিল খুবই ছোট। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নয়, কলেজ পর্যায়ে পড়ালেখা করেছেন এমন মানুষের সংখ্যা ছিল অল্প। গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা খুবই কম। সারা প্রদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র একটি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ : আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং সরকারি ও বেসরকারি কলেজ মাত্র কয়েকটি। প্রাতিষ্ঠানিক বুদ্ধিচর্চার পরিধি ছিল খুবই সংকীর্ণ। যারা চিন্তাশীল মানুষ, তাঁরা ছিলেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একেবারেই সংঘবদ্ধ নন, বিভিন্ন মতাদর্শে বিভক্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। অনেকে কলকাতায় কোনো রকমে বেঁচেবর্তে ছিলেন, ঢাকায় এসে বেকায়দায় পড়েন। সরকারের শুভদৃষ্টিতে থাকায় কারও কারও কপাল খুলে যায়। তারা এমন কোনো বিতর্কিত বিষয়ে জড়িয়ে পড়া পছন্দ করতেন না, যার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার নাখোশ হবে এবং তাদের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটাবে।
ওই সময়ের পত্রপত্রিকা ঘেঁটে দেখা যায়, অনেকেই পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা কী হবে তা-ই নিয়েই ভাবিত ছিলেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা ছিল না। এবং তারা চাইতেন পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা বাংলাই হোক। মুসলিম লীগের প্রায় সব নেতাই এই শ্রেণিতে পড়েন। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যারা আর কিছু অগ্রসর তারা চাইতেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা ও উর্দু। শুধু বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ মানবে না এবং সে দাবিও অন্যায্য; অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা একমাত্র উর্দুকে মানতেই পারে না। অতি ক্ষুদ্র একটি গোত্র ছিল, বাঙালিদের মধ্যেও যারা চাইত পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ, সেই দেশের রাষ্ট্রভাষা যদি শুধু উর্দু হয় তো হোক। নিতান্ত নির্বোধ কেউ কেউ ছিলেন, যারা মনে করতেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আরবি হলেই-বা ক্ষতি কী? একটি জাতির মধ্যে সংহতি না থাকায় এমনটি হতে পারে। আরেকটি কারণ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে যুক্তিশীলতা ও বিচার-বিবেচনার অভাব। এবং বেশি অভাব আত্মপরিচয় ও স্বাজাত্যবোধের।
মুসলিম লীগের বাঙালি নেতারাও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ছিলেন না, যদিও তাঁদের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ চেয়েছিলেন একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তাঁরা প্রকাশ্যে নেতার বিরোধিতা করেননি, যদিও তাঁদেরও দাবি ছিল বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা। কারণ, তাঁদের প্রায় কেউই উর্দু লিখতে বা পড়তে পারতেন না– দু-চারটে কথা বলতে পারতেন সেকালের অনেকেই।
জিন্নাহও তাঁর ভাষণে প্রথম বাক্যের পরে দ্বিতীয় বাক্যে বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা কী হবে, তা প্রদেশবাসীই ঠিক করবেন– তবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং উর্দু অন্য কোনো ভাষা নয়। কি কলকাতা, কি দিল্লি, কি করাচি, কি ঢাকা সব জায়গায়ই বাঙালি নেতারা জিন্নাহর সঙ্গে কথা বলেছেন উর্দুতে –বাংলায় তো নয়ই, ইংরেজিতেও নয়।
১৯৪৭ সালের ১২ নভেম্বর, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তিন মাসের কম সময়ের মধ্যে, মুসলিম জাতীয়তাবাদী সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র-যুবকদের এক সভা
অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক, বুলবুল সম্পাদক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, মুহাম্মদ এনামুল হক, যৌনবিজ্ঞান বইয়ের লেখক আবুল হাসনাৎ, প্রাদেশিক কৃষিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজাল। সভার উদ্বোধন করেন প্রাদেশিক বেসামরিক সরবরাহমন্ত্রী নূরুল আমিন, পরে যার মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত প্রমুখ শহীদ হন। ওই সভায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, লীলা রায়সহ বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের বহু অধ্যাপক ও কবি-লেখক উপস্থিত ছিলেন।
