.. ৬ সার্কাস রো-তে আমি এবং কবি হাবীবুর রহমান একটি ঘর ভাড়া নিয়ে কিছুদিন ছিলাম। পরে হাবীবুর রহমান অন্যত্র গিয়েছিলেন। সেইখানে আটচল্লিশের কোনো এক সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রা দর্শন কি হওয়া উচিত, এই আলোচনায় আমাদের বক্তব্য দাঁড়াল সংক্ষেপে সমাজতন্ত্র, তাঁর বক্তব্য দাঁড়াল “তবলীগ”। এই শব্দটিও তিনি ব্যবহার করেছিলেন। অবশ্য নিছক ধর্মপ্রচারের অর্থে তিনি বলেননি : অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ প্রচারের অর্থে বলেছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে পাকিস্তানের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করলে সে রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রই হবে, অধিকন্তু কমিউনিজমের জড়বাদ থেকে মুক্ত হওয়ায় পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উন্নততর রাষ্ট্র হবে –এই ছিল ফররুখ আহমদের দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি ছিলেন জড়বাদের ঘোর বিরোধী। তাঁর কবিতায় নিন্দার্থে জড়বাদ শব্দটি প্রচুর ব্যবহৃত হয়েছে। এই জড়বাদ শুধু পশ্চিমী সভ্যতার নয়, কমিউনিস্ট মতবাদের জড়বাদও। প্রথম জীবনে তিনি অর্থনৈতিক আদর্শের আকর্ষণে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি স্বল্পকালের জন্য আকৃষ্ট হয়েছিলেন।… প্রধানত ঐ জড়বাদের জন্যই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ও মতবাদ থেকে বিকর্ষিত হয়েছিলেন। ইসলামী আদর্শের রূপায়ণ এবং প্রচার পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতির অঙ্গ হওয়া উচিত, এই ছিল ফররুখ আহমদের দৃঢ় অভিমত। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সমগ্র পৃথিবীতে কমিউনিজম প্রচারের নীতি গ্রহণ করতে পারে, তা হলে পাকিস্তান সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামী আদর্শ প্রচারের নীতি গ্রহণ করবে না কেন, এই ছিল তার যুক্তি।’
তার এই বিশ্বাসকে তাঁর সৎ আকাক্ষা বা শুভ ইচ্ছা বলা যেতে পারে কিন্তু যুক্তি নয়। কী প্রক্রিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ফররুখের অজানা ছিল না। পাকিস্তান কোনো বিপ্লবের ফসল ছিল না। গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিষ্ঠিত, তবে রক্ষণশীল, অনেকখানি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক নেতৃত্বে যে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে তার পক্ষে রাষ্ট্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়। এই বিষয়টি আবেগপ্রবণ ফররুখ ভেবে দেখেননি।
সম্ভব নয় বলেই পাকিস্তানে যেমন ইসলামি সমাজবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সামরিক একনায়কত্ব, তেমনি অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে ‘সীমাহীন রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও এবং তার অন্যতম মূলনীতি সমাজতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যা হোক, পাকিস্তানি শাসকেরা শুরুতেই স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দেন। তার প্রথম প্রকাশ ঘটে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ফররুখ ছিলেন পাকিস্তানি শাসকদের একেবারেই বিপরীত অবস্থানে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। এ সম্পর্কে আবদুল হকের বক্তব্য:
‘মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ঘোষণার পরেই উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, আমরা উভয়ে তার বিরোধিতা করার সংকল্প নিয়েছিলাম। সাতচল্লিশের জুন মাসেই আমরা যুক্তভাবে বাংলার সপক্ষে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু প্রচারকার্য চালিয়েছিলাম, এবং উভয়েই বাংলার সপক্ষে পত্রপত্রিকায় লিখেছিলাম।’
তবে সাহস কম থাকায় আবদুল হক লিখেছিলেন ছদ্মনামে এবং সাহসী ফররুখ লিখেছিলেন স্বনামে। যে মাসে পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে, সেই ‘৪৭-এর আগস্টেই সওগাত-এ ফররুখ এক নিবন্ধে লেখেন :
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে।
‘তাই যদি হয়, তাহলে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’
(ফররুখ আহমদ, ‘পাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য’, সওগাত, আশ্বিন ১৩৫৪]
নতুন রাষ্ট্র থেকে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রায় সবাই সরকারি নীতির অন্ধ সমর্থক ও ক্ষমতাসীনদের নির্লজ্জ স্তাবকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁরা সেদিন প্রায় প্রত্যেকেই ইসলামের নিশানবর্দার হয়ে যান। ইসলামী ঐতিহ্য রক্ষায় তারা মাতৃভাষার মর্যাদাকে বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত ছিলেন না। ফররুখ আহমদ, যিনি ছিলেন ইসলামি মূল্যবোধের অবিচল সমর্থক, তাঁদের ধিক্কার জানিয়ে সেদিন লিখেছিলেন :
‘পাকিস্তানের, অন্তত পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে, এ কথা সর্ববাদীসম্মত হলেও আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানেরই কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীন মত প্রকাশ করেছেন, যা নিতান্তই লজ্জাজনক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপায়িত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাঁদের অভিমত।
‘কী কুৎসিত পরাজয়ী মনোবৃত্তি এর পিছনে কাজ করছে এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি। যে মনোবৃত্তির ফলে প্রায় দু’শ বছর বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ ছিল, সেই অন্ধ মনোবৃত্তি নিয়েই আবার আমরা ইসলামকে গলাটিপে মারার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছি।
