এটা নারীর বৈজ্ঞানিক বর্ণনা নয়, এটা অনুশাসন; তিনি চান এমন আদর্শ নারী, যা শুধু দুষ্প্রাপ্যই নয়, অসম্ভব। তাঁর নারী বর্জন করবে নিজের সত্তা। এমন নারী কোনো মানুষ নয়, সে নিজের জন্যে বাঁচে না; তবে নারী নিজের জন্যেও বেঁচে থাকে। এমন নারী জীবিত থাকে যখন তার পাশে থাকে কোনো পুরুষ, যার ওপর সে শুধু নির্ভরই করে না, যে তার প্রাণধারণের নিশ্বাস। ডয়েট্শ নারীকে পরামর্শ দিয়েছেন নিজেকে প্রত্যাখ্যান করার, পুরুষের সহচরী হয়ে ওঠার, পুরুষের সাথে খাপ খাওয়ানোর ও একাত্মাতাবোধের; এর বদলে নারী পাবে সব কিছু। সে পাবে পুরুষের আদর, কাম, প্রেম, গৃহ; পুরুষ তাকে প্রভাবিত করবে, যেমন ইচ্ছে চালাবে, চাষ করবে, যেখানে ইচ্ছে রাখবে। এমন নারী আকর্ষণীয় মনে হ’তে পারে অনেকের কাছে, কিন্তু আসলে এমন ডয়েটুশীয় নারী আপাদমস্তক ক্লান্তিকর। সে আত্মবিসর্জনের মর্মস্পৰ্শী উদাহরণ। একে মনোবিশ্লেষণ হিশেবে চালিয়েছেন ডয়েট্শ, তবে এ হচ্ছে নারী সম্পর্কে প্রথাগত কুসংস্কার। তাঁর বইয়ের দু-খণ্ডকে এক সময় মনে করা হতো নারী সম্পর্কে শেষকথা, কিন্তু তিনি নিজে নারী হয়েও প্রচার করেছিলেন পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার; বোনাপার্ত ও ডয়েট্শ্ পুরুষতন্ত্রে দীক্ষার মর্মস্পশী উদাহরণ।
চল্লিশের দশকে শুরু হয় ফ্রয়েডীয় নারীতত্ত্বের জনপ্রিয়করণ, বিচিত্র ধরনের রচনা ও বইয়ে চারপাশ ছেয়ে যায়, প্রতিক্রিয়াশীলতা উপচে পড়তে থাকে ঝকঝকে ছাপা পৃষ্ঠার ভেতর থেকে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মনোবিশ্লেষক ফার্ডিনান্ড লুন্ডবার্গ ও সমাজতাত্ত্বিক মারিনিয়া ফার্নহ্যামের আধুনিক নারী, বিলুপ্ত লিঙ্গ (১৯৪৭) নামের একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল বই। বইটি সাধারণ পাঠকদের ও পাঠ্যপুস্তক হিশেবে তরুণতরুণীদের অত্যন্ত প্রভাবিত করে। বইটি মধ্যযুগের একটি প্রচারপুস্তক; এটিতে আধুনিক সমস্ত কিছুকে নিন্দা করা হয়, মধ্যযুগকে চিত্রিত করা হয় স্বর্ণযুগ রূপে, আর সমস্ত আধুনিক প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে প্রচার করা হয় ঘৃণা। তাদের বিশেষ আক্রমণের লক্ষ্য নারীমুক্তি আন্দোলন। লেখকদের মতে, যাদের একজন নারী, বর্তমান কালের অনেক নিষ্টের মূলেই রয়েছে নারীবাদ, এবং এরই জন্যে নারী পরিণত হয়েছে ‘বিলুপ্ত লিঙ্গ’-এ। তাদের মতে নারীবাদের মূলকথা বিদ্বেষ, নারীবাদ একধরনের নাৎসিবাদ। এ-প্রতিক্রিয়াশীল লেখকদের মতে মার্ক্স আর মিল বিকৃত পুরুষ, আর বিশেষভাবে বিকৃত হচ্ছেন মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্। ওই নারীই শুরু করেছিলেন নারীবিপ্লব নামক উন্মত্ততা! তাঁদের মতে নারীবাদ শুধু অশুভই নয়, একটি রোগ, মনোবিকার, গৃহের শত্রু; নারীবাদ আবেগগত রুগ্নতার প্রকাশ। তাদের মতে নারীপুরুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, সাম্য প্রতিষ্ঠার কোনো লক্ষ্য থাকলে তারা শারীরিকভাবে একই হতো। তারা ঘোষণা করেন যে নারীবাদীরা পুরুষ হ’তে চায়, তারা ভোগে চরম শিশ্নাসূয়ায়। তাদের মতে, ‘নারীবাদ হচ্ছে নারীর আত্মহত্যা, পুরুষের মতো বাঁচার প্রয়াস’ [দ্র মিলেট (১৯৬৯, ২০০৮)]। তাঁদের মতে মা হওয়া ছাড়া নারীর অন্য কোনো ইচ্ছে পোষণ করাই অসম্ভব অভিলাষ, পুরুষ হওয়ার অভিলাষ; এবং তারা ওই অভিলাষকে তিরষ্কার করেন প্ৰাণ ভরে। তাঁরা চান নারী থাকবে নারী হয়ে; তারা মা হবে, পুরুষের অধীনে থাকবে, পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। নারী সৃষ্টি হয়েছে শুধু এ-জন্যেই। তাদের মতে নারীবাদী আন্দোলন কমিয়ে দিয়েছে বিবাহ ও সংসারের মহিমা; আর নারীবাদীরা যে পুরুষের জন্যে এক নৈতিকতা আর নারীর জন্যে আরেক নৈতিকতার বিরুদ্ধে প্ৰতিবাদ জানায়, তার কারণ তাদের ভেতরে রয়েছে। অবৈধ কামের গভীর বাসনা। তাঁরা বিবাহপূর্ব কৌমাৰ্য চান, তবে তা শুধু নারীর জন্যে; আর মনে করেন যে নারীপুরুষের ভিন্ন নৈতিকতা শুধু অনিবাৰ্যই নয়, বিশেষভাবেই কাম্য। তারা জয়গান করেন নারীত্বের, পরিবারের, নারী-অধীনতার, মাতৃত্বের। তাদের মতে পুরুষ থাকবে পুরুষের এলাকায়, নারী নারীর এলাকায়। যে-নারী খাপ খাওয়াতে পারে না পুরুষতন্ত্রের সাথে, তারা বিকৃত, ব্যাধিগ্রস্ত। এ-দুই লেখক মনোবিজ্ঞানের নামে প্রচার করেছেন প্রতিক্রিয়াশীলতা; তাদের বইয়ের ভেতর কোনো মনোবিজ্ঞান নেই, আছে অপবিজ্ঞান।
এক মনোবিশ্লেষক, এরিক এরিকসন, নারীকে ঘরে আটকে রাখার জন্যে বের করেন ইনার স্পেস বা অন্তর বা আভ্যন্তর জগততত্ত্ব। তিনি গবেষণা করেন কিশোরকিশোরীদের নিয়ে, তাদের হাতে দেন নানা মালমশলা এবং তৈরি করতে বলেন মনের মতো কাঠামো। তিনি দেখতে পান মেয়েরা বানাতে পছন্দ করে কোনো গৃহের অভ্যন্তর, যেখানে আছে সুখশান্তি; তারা তৈরি করে স্থির নানা অবস্থা, যেমন কেউ পিয়ানো বাজাচ্ছে। অন্যদিকে ছেলেরা তৈরি করে উঁচু অট্টালিকা, অট্টালিকার ভেঙে পড়া, এবং সড়ক, যেখান দিয়ে ছুটে চলছে যানবাহন। এ দেখেই এরিকসন ঠিক ক’রে ফেলেন যে এর সাথে সম্পর্ক আছে নারীপুরুষের লিঙ্গসংস্থানের; পুরুষ চায় উচ্চতা, সক্রিয়তা; নারী চায় অবরোধ, নিরাপত্তা। তিনি তত্ত্ব তৈরি করে ফেলেন যে নারীর শরীরসংগঠনই, তার জরায়ু ও যোনির আভ্যন্তর জগতই স্থির করে দেয় নারীর সত্তা, যা ভিন্ন পুরুষের থেকে। যেনো নারীর দেহসংগঠন পরিকল্পনার মধ্যেই রয়েছে শিশুপালনের শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক, নৈতিক অঙ্গীকার! ফ্রয়েড বলেছিলেন যে নারী বোধ করে তার শিশ্ন নেই, আর এরিকসন আবিষ্কার করেন যে নারী বোধ করে যে তার অভ্যন্তরে একটি জগত রয়েছে, যেটির নাম জরায়ু। এরিকসন যে-উপাত্ত থেকে এতো বড়ো সিদ্ধান্তে পৌঁচেছেন, তা একটু ভালোভাবে দেখলেই তার ইনার স্পেস ও আউটার স্পেসতত্ত্ব ভেঙে পড়ে। মধ্যবিত্ত কিশোরকিশোরীরা বড়ো হয় যে-আবহাওয়ার মধ্যে, তাই তাদের শিখিয়ে দেয় যে মেয়েরা ভালোবাসবে ঘর, আর ছেলেরা বাইর, তাই তারা মেয়েলি ব্যাপারগুলোই বেছে নেয়, ছেলেরা বেছে নেয় পুরুষের ব্যাপারগুলো। এরিকসনের ইনার স্পেস, আউটার স্পেসতত্ত্ব আমেরিকার মহাকাশ বিজয়ের সময়ের এক মার্কিন মনোবিশ্লেষকের অপবৈজ্ঞানিক পাগলামো! অন্যরা অন্তত পুরুষের জন্যে বাইর রেখে নারীর জন্যে রেখেছিলেন ঘর; মার্কিন মহাজগতমত্ততার কালে এ-বিজ্ঞানী পুরুষের জন্যে রাখেন মহাজগত, আর নারীর জন্য রাখেন জরায়ু।
