তাঁর চোখে শুক্রাণু আক্রমণাত্মক, তাই পুরুষও আক্রমণাত্মক; একেই মনে করেন তিনি স্বাভাবিক। নারী তার খর্ব ভগাঙ্কুরের মতোই, তার পক্ষে আক্রমণাত্মক হওয়া অসম্ভব। বোনাপার্তের মতে, নারীর লিবিডো যেমন দুর্বল তেমনি দুর্বল তার আক্রমণাত্মকতা; তাই নারীকে থাকতে হবে পুরুষপর্যুদস্ত। তিনি প্রচার করেন যে পুরুষ যেহেতু জৈবিকভাবেই আক্রমণাত্মক, তাই তার আধিপত্য অনিবাৰ্য। এ-সবই হচ্ছে ফ্ৰয়েডীয় তত্ত্বকে ধ্রুব মনে ক’রে চরমে নিযে যাওয়া, ফ্রয়েডেব কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমৰ্পণ করা, ও নারীকে সমর্পণ করা পুরুষের কাছে। বোনোপার্ত আত্মসমর্পণ করেছিলেন সম্পূর্ণরূপে ফ্রয়েডের কাছে, তাই নারী তার কাছে চরম মর্ষকামী; তিনি মনে করেন নারী সঙ্গমে যে সুখ পায়, তা আসলে উৎপীড়িত হওয়ারই সুখ। তার মতে সঙ্গমে নারী উপভোগ করে শিশ্নের প্রহার; সে শিশ্নের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়, সে ভালোবাসে শিশ্নের সন্ত্রাস! নারী যদি পছন্দ না করে শিশ্নের সন্ত্রাস, তাহলে? তাহলে, ফ্রয়েড যেমন বলেছেন, তা নারীরই অপরাধ বা বিকার; যে-নারী এটা পছন্দ করে না সে পুংগূঢ়ৈষাগ্ৰস্ত, পুরুষালি প্রতিবাদের শিকার! ফ্রয়েড বলেছেন, স্বাভাবিক নারী সঙ্গমে সুখ বোধ করে যোনির ভেতরে, স্বাভাবিক নারীর পুলক হচ্ছে যোনীয় পুলক; শুধু বিকৃতরা পুলক বোধ করে ভগাঙ্কুরে, তারা ভগাঙ্কুরীয়। ভগাঙ্কুরীয় হওয়া বিকার ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে; তাই এমনভাবে সঙ্গম করতে হবে যাতে শিশ্ন একটুও স্পর্শ না করে ভগাঙ্কুরটিকে। বোনাপার্ত নারীকে শুধু মর্ষকামী হিশেবে বর্ণনা করেন নি, তিনি অনুশাসন দিয়েছেন যে নারীকে হতেই হবে মর্ষকামী। যে হবে না সে বিকৃত। তবে এতে কোনো বিজ্ঞান নেই, রয়েছে ভিক্টোরীয় কুসংস্কার; ফ্রয়েডের ভুল পদতলে নারীসমৰ্পণ।
ফ্রয়েডের ভ্রান্তি আর কুসংস্কারগুলোকে ধ্রুব সত্যরূপে মেনে নিয়েছিলেন আরেক নারী মনোবিজ্ঞানী। তিনি হেলেন ডয়েটশ, যার দু-খণ্ডের ‘নারীমনোবিজ্ঞানমনোবিশ্লেষণাত্মক ভাষ্য’ (১৯৪৪) এক সময় হয়ে উঠেছিলো খুবই প্রভাবশালী, এমনকি দ্য বোভোয়ারও মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন তার নানা অপব্যাখ্যা। তিনি নারীত্বকে অক্রিয়তার ও পুরুষত্বকে সক্রিয়তার সাথে অবিচ্ছেদ্য ক’রে তুলেছিলেন; শুধু কামে নয়, জীবনের সব এলাকায়। লৈঙ্গিক রাজনীতি তিনি শুরু করেছিলেন শয্যায়, এবং তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন জীবনের সবখানে। যে-নারী সক্রিয়, তার মতে সে-ই পুংগূঢ়ৈষাগ্রস্ত; ওই পুংগূঢ়ৈষ্যার মূলে রয়েছে নারীর খোজাত্ব, তার শিশ্ন আর অণ্ডকোষের অভাব। তার মতেও নারীর তিন মৌল বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রেম, ক্রিযতা, ও মর্ষকাম। তার চোখেও নারী বিকলাঙ্গ পুরুষ, যার শিশ্ন নেই, রয়েছে একটি অক্ষম খর্ব ভগাঙ্কুর; এবং দেহসংস্থানই নারীর নিয়তি। যে-নারী আত্মপ্রেমিক, অক্রিয়া, মধকামী, সে-ই স্বাভাবিক নারী তার চোখে; আর অস্বাভাবিক তারা, যারা বর্জন করে আত্মপ্ৰেম, যারা পোষণ করে বাস্তব জীবনে সাফল্যের লক্ষ্য, যারা উপভোগ করে না মর্ষকাম। স্বাভাবিক হয়ে ওঠার জন্যে নারীকে ছেড়ে দিতে হবে সব লক্ষ্য, জীবনকে চরিতার্থ ক’রে তুলতে হবে স্বামী বা পুত্রের কাজ ও সাফল্যের মধ্যে। তার মতে যে-নারীরা অর্জন করেছে নানা সাফল্য, তারা তা অর্জন করেছে স্বাভাবিক নারীত্ব বিসর্জন দিয়ে; তাই তারা বিকৃত। স্বাভাবিক নারী, ডয়েটশের মতে, হবে কামপরায়ণ; তার জীবনের লক্ষ্যই হবে প্রেম দেয়া ও পাওয়া; এ-স্বাভাবিক নারীরা বিশিষ্ট ক’রে তুলতে চায় না নিজেদের, তারা একাত্ম বোধ করে কোনো পুরুষের সাথে, এবং এর মধ্য দিয়েই বোধ করে জীবনের চরিতার্থতা। যে-নারী সাফল্য অর্জন করতে চায় সে বিকৃত, সে পুরুষালি প্রতিবাদের শিকার, যেমন তিনি দেখিয়েছেন যে, জর্জ স্যা শিকার ওই রোগের। এ-মনোবিজ্ঞানী, যিনি নিজে নারী ও সাফল্য অর্জন করেছিলেন পুরুষের ক্ষেত্রে, আসলে বিশ্বাসী ছিলেন নারী সম্পর্কে কুসংস্কারে, এবং প্রথাগত নারী ধারণায় [দ্র গ্রিয়ার (১৯৭০, ৯৪-৯৫)] :
‘যদি তাদের থাকে প্রচুর পরিমাণে বোধি, যেটা নারীর বৈশিষ্ট্য, তারা হয় আদর্শ সহচরী, যারা নিয়ত অনুপ্রাণিত করে তাদের পুরুষদের, এবং তারা এ-ভূমিকায় পায় সবচেয়ে বেশি সুখ। তাদের সহজেই প্রভাবিত করা যায় এবং তারা তাদের সঙ্গীদের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় এবং তাদের বুঝতে পারে। তারা সুন্দরতম ও সবচেয়ে কম আক্রমণাত্মক সঙ্গিনী এবং তারা থাকতে চায় ওই ভূমিকায়ই তারা নিজেদের অধিকারের জন্যে চাপ দেয় না-বরং তার বিপবীত। শুধু প্রেম দিয়ে তাদের যে-কোনোভাবে সহজে চালানো যায়। কামে তারা সহজেই উদ্দীপিত হয় এবং খুব কম সময়ই তারা কামশীতল; তবে কামে তারা আরোপ করে মর্ষকামী শর্ত যা অবশ্যই পরমভাবে পরিতৃপ্ত করতে হবে। তারা প্রেম চায় এবং প্রত্যাখান কবে সব ধরনের সক্রিয় প্রবণতা।
যদি তাদের কোনো প্রতিভা থাকে তবে তারা ওই শক্তিকে মৌলিক ও সৃষ্টিশীলভাবে কাজে লাগায়, তবে তারা প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রামে যোগ দেয় না। তারা সব সময়ই নিজেদের অর্জন বিসর্জন দিতে প্ৰস্তুত, এতে তারা একটুও মনে করে না যে তারা কিছু বিসর্জন দিচ্ছে, এবং তারা তাদের সহকর্মীদেব সাফল্যে উল্লাস বোধ করে, যাদের তারা অনুপ্রাণিত করেছে। যখন তারা নিয়োজিত হয়। কোনো বহির্মুখি কাজে তখন তারা অত্যন্ত প্রয়োজন বোধ করে সহায়তার, তবে তারা যখন তাদের অন্তর্জীবনের কোনো অনুভূতি বা চিন্তায় জড়িত হয়, অর্থাৎ নিয়োজিত হয় অন্তর্মুখি কাজে তখন তারা চূড়ান্ত স্বাধীন। তাদের পুরুষেব সাথে একাত্মতাবোধের শক্তি কোনো আন্তর দারিদ্র্যের প্রকাশ নয়, বরং আন্তব সম্পদের প্রকাশ।‘
