মনোবিশ্লেষণাত্মক কুসংস্কারের পর পশ্চিমে নারী সম্পর্কে ছড়িয়ে পড়ে সমাজতাত্ত্বিক কুসংস্কার; সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজকে স্থির ক’রে দেয়ার জন্যে তৈরি করেন এক ঝকঝকে তত্ত্ব, তার নাম দেন ফাংশনালিজম বা ভূমিকাবাদ। তাঁরা কাজ করেন সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব নিয়ে, ঢুকে পড়েন পরিবারের ভেতরে, এবং তাদের বিদ্যাকে বিজ্ঞানসম্মত করার জন্যে নানা ধারণা ধার করতে থাকেন শরীরবিজ্ঞান থেকে, বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাকে বর্ণনা করতে থাকেন সংগঠন, ভূমিকা ইত্যাদি ধারণার সাহায্যে, যেনো, যেমন ফ্রাইডান (১৯৬৩, ১১২) বলেছেন, ওই সব সংস্থার রয়েছে শক্ত অস্থি-পেশি প্রভৃতি। তাঁরা তাদের বিদ্যাকে ক’রে তোলেন ছদ্মবিজ্ঞান। তাঁরা বর্ণনার বদলে প্রচার করতে থাকেন অনুশাসন; কে কী ভূমিকা পালন করে, তার বদলে নির্দেশ দিতে থাকেন কার কর্তব্য কী ভূমিকা পালন। নারী হয়ে ওঠে ভূমিকাবাদের শিকার; নারীকে তারা বন্দী ক’রে ফেলেন নারী-ভূমিকায়। ভূমিকাবাদ বিবর্তনে বিশ্বাস করে না, মনে করে যে সব কিছু চিরস্থির হয়ে থাকবে, যে আছে যে-ভূমিকায় সে থাকবে তাতেই। লৈঙ্গিক বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে প্রথাগত লিঙ্গভেদ অস্বীকার করা, বিশেষ লিঙ্গের ব’লেই কাউকে পালন করতে হবে বিশেষ ভূমিকা বা হ’তে হবে বিশেষ মেজাজের, তা মেনে না নেয়া; আর ভূমিকাবাদের মূলকথা ওই সব মেনে নেয়া। ভূমিকাবাদীরা ফ্ৰয়েডীয় মনোবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব, গণিত প্রভৃতি মিশিয়ে তৈরি করেছিলেন এমন এক অপবিজ্ঞান, যার সারবাণী হচ্ছে গৃহই নারীর স্থান। ‘আধুনিক বিবাহ’ (১৯৪২) নামের এক বইয়ে এক সমাজবিজ্ঞানী লিখেছেন [দ্র ফ্রাইডান (১৯৬৩, ১১৪)] :
‘নারীপুরুষ পরিপূরক!…পুরুষ ও নারী মিলে গ’ড়ে তোলে এক কার্যকর একক। একলা প্রত্যেকেই অসম্পূর্ণ। তারা পরিপূরক।… পুরুষ ও নারী যখন নিয়োজিত হয় একই পেশায় বা সম্পন্ন করে একই ভূমিকা, তখন এ-পরিপূরক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।’
একথা বলার জন্যে নতুন সমাজবিজ্ঞানীর দরকার ছিলো না; টেনিসন, রাসকিন ও অনেক ভিক্টোরীয় মহাপুরুষ একথা বলে গেছেন আরো আকর্ষণীয় মৌলিক ভঙ্গিতে; কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে যে একথা আবার বলা হয়েছে বিশশতকের চল্লিশের দশকে, বলেছেন ‘বিজ্ঞানী’!
এ-বিজ্ঞানীরা তরুণীদের শিখিয়েছেন যে সারা জীবনের জন্যে কোনো পেশা গ্রহণ করা ঠিক নয়। যদি কোনো পেশা নিতে হয়, তবে নিতে হ’বে কিছু কালের জন্যে; ওই সময় চেষ্টা চালাতে হবে বিয়ের জন্যে, আর বিয়ে হয়ে গেলে পেশাকে বিদায় দিয়ে ঢুকতে হবে ঘরে, জরায়ুকে চরিতার্থ ক’রে তুলতে হবে মাতৃত্বে। তাঁরা শিখিয়েছেন বিয়ে আর পেশা একসাথে চালানো খুব খারাপ, পেশার থেকে বিয়ে অনেক ভালো; তাই ছেড়ে দিতে হবে বাইরের জীবন। কারণ মেয়েরা গৃহেই সুন্দর। তাঁরা শিখিয়েছেন যদি মেয়েরা পেশাই বেছে নেয়, তবে তাদের থাকতে হতে পারে চিরঅবিবাহিত; যদি তারা মিলন ঘটাতে চায় বিয়ে ও পেশার, তবে তা ডেকে আনবে বিপর্যয়। ওই বিজ্ঞানীরা পরিসংখ্যানের পর পরিসংখ্যান ছেপে প্রমাণ ক’রে দিয়েছেন যে খুব বেশি মানুষের পক্ষে একই সাথে দুটি পেশা, সংসার ও চাকুরি, চালানো সম্ভব নয়, তা পারে শুধু অসাধারণেরা। কেননা এ-পেশা দুটির দাবি দু-রকম: সংসার চমৎকারভাবে চালানোর জন্যে দরকার নিজেকে পুরোপুরি অস্বীকার করা, দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা; আর চাকুরির জন্যে দরকার আত্মবিকাশ, প্রবল প্ৰতিযোগিতা। তারা তরুণীদের জানিয়েছেন যে আত্মবিকাশ খুব বিপজ্জনক ব্যাপার, খুবই সহজ ও মনোরম হচ্ছে আত্মঅস্বীকার। তারা শিখিয়েছেন সংসারে সুখী হওয়া যায়। তখনই যখন স্বামী-স্ত্রী হয় পরস্পরের পরিপূরক, স্ত্রী থাকে ঘরে স্বামী বাইরে। দুর্ঘটনা ঘটে যখন দুজনই করে একই কাজ। এ হচ্ছে বিজ্ঞানসম্মত ভূমিকাবাদ। ভূমিকাবাদীদের প্রধান ছিলেন ট্যালকট পারসন্স্, যিনি মার্কিনদেশে নারীপুরুষের ভূমিকা বিশ্লেষণ ক’রে দেখান যে নারীর শ্রেষ্ঠ ভূমিকা হচ্ছে গৃহিণীর ভূমিকা! তাঁর মতে [দ্র ফ্রাইডান (১৯৬৩, ১১৬)] :
‘নারীর মৌল মর্যাদা হচ্ছে স্বামীর স্ত্রী, আর সন্তানের মায়ের মর্যাদা।‘
এটা অসার মর্যাদা; নিজের নয়, অন্যের থেকে তার ওপর পতিত মৰ্যাদা; আর একথা বলার জন্যে কোনো নতুন সমাজবিজ্ঞানীর দরকার ছিলো না, পুরুষতন্ত্রের বিভিন্ন বই আর মনীষী এসব বলে আসছে কয়েক হাজার বছর ধরে। পুরুষ তো পিতা আর স্বামী হওয়ার মর্যাদায় গৌরব বোধ করে না। নারী ব্যস্ত থাকবে ঘর আর সন্তান নিয়ে? তবে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন নারীর ঘরকন্নার কাজ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে, দিনভর করার মতো কাজ আর সংসারে নেই; তিনি স্ত্রীর জৌলুশপূর্ণতার কথা বলেছেন, তবে দেখেছেন ওটা থাকে শুধু যৌবনের কালে; তারপর সব কিছু ধ’সে পড়ে। পারসন্স চান সমাজ যেভাবে চলছে চলবে সেভাবেই, নারী পালন ক’রে যাবে তার প্রথাগত দাসীর ভূমিকা। তিনি, ও তাঁর সঙ্গীরা, জানেন সমাজ চলছে, কেননা বিপুল জনগোষ্ঠি মেনে নেয় তাদের অবস্থা, তারা খাপ খাইয়ে নেয় তাদের ভূমিকার সাথে। সমাজ তাদের বিন্যস্ত করে যেখানে সেখানে থেকেই তারা পালন করে তাদের ভূমিকা; ব্ৰাহ্মণ পালন করে ব্ৰাহ্মণের শূদ্ৰ পালন করে শূদ্রের ভূমিকা; তাঁরা চান এ-ভূমিকা পালন চলবে চিরকাল। বালিকা, যেহেতু ভবিষ্যতে হবে স্ত্রী, প্রস্তুতি নেবে স্ত্রী হওয়ার; বালক নেবে স্বামী হওয়ার প্রস্তুতি। বালিকা প্ৰস্তুতি নেবে আনুগত্যের, নির্ভরতার; বালক নেবে স্বাধীনতা, আধিপত্য, আক্রমণাত্মকতা, ও প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি।
