অ্যাডলার ছিলেন ফ্রয়োডীয় বৃত্তে, কিন্তু বেরিয়ে এসেছিলেন যখন বুঝতে পারেন যে বদ্ধমূল ফ্রয়েডীয় ধারণা দিয়ে বিজ্ঞানচর্চা অসম্ভব। নারী সম্পর্কে তাঁর ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন ফ্রয়েডীয় ধারণা থেকে, এবং অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। অ্যাডলার [দ্র উইলিয়মস্ (১৯৭৭, ৮০)] বলেছেন :
‘আমাদের সমস্ত সংস্থা, আমাদের প্রথাগত প্রবণতা, আমাদের বিধান, আমাদের নৈতিকতা, আমাদেব প্রথা সাক্ষী দেয় যে পুরুষাধিপত্যের গৌরব প্রতিষ্ঠার জন্যে ওই সব প্রণয়ন ও রক্ষণ করেছে সুবিধাভোগী পুরুষেরা।‘
শিশুকাল থেকেই শিশুরা পিতৃতন্ত্রের বিধানের শিকার হয়ে ওঠে। ছেলেশিশুকে ক’রে তোলা হয় আধিপত্যবাদী, মেয়েশিশুর মধ্যে জাগিয়ে তোলা হয় অধীন ও অপদার্থের বোধ। অ্যাডলারের মতে, বালিকা চারপাশে নারীর বিরুদ্ধে কুসংস্কার দেখে দেখে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে নিজের আর নারীজাতির ওপর; এটা কোনো খোজা গূঢ়ৈষ্যাব ফল নয়, সমাজব্যবস্থাই তাকে ক’রে তোলে আত্মঅবিশ্বাসী। নারীকে বের ক’রে দেয়া হয় শক্তির এলাকা থেকে, পুরুষের সমাজব্যবস্থা তার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করে যে তার মনে দেখা দেয় সংকট। সমগ্র সভ্যতা নারীর ওপর যে-চাপ সৃষ্টি করে, তা নারীকে বাধ্য করে পুরুষেব কাছে আত্মসমর্পণ। তবে পক্ষে সুস্থ থাকা কঠিন। তিনি দেখিয়েছেন সমাজ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজকেই মনে করে পুরুষের কাজ, গুরুত্বহীন কাজকে মনে করে নারীর কাজ; পুরুষ গুরুত্বপূর্ণ শক্তিমান, সুযোগ্য; নারী বাধ্য, দাসভাবাপন্ন, অধীনস্থ। তিনি দেখিয়েছেন পুরুষ নারীর প্রতি যে-সৌজন্য দেখিয়ে থাকে, তাতে মনে হয় যে নারীদের খুব মূল্য দেয়া হচ্ছে; তবে তাও করা হয় পুরুষের সুবিধারই জন্যে। নারী ভূমিকা নিয়ে রয়েছে যে-বিশ্বজনীন অসন্তোষ, অ্যাডলারের মতে তা নিতে পারে তিন রকম রূপ। নারী হয়ে উঠতে পারে পুরুষের মতো সক্রিয়, বিদ্রোহ ক’রে সে ক্ষতিপূরণ করতে পারে নিজের অবস্থার। এ-ই হচ্ছে পুরুষালি প্রতিবাদ, যার অপব্যাখ্যা করেছেন ফ্রয়েড; তবে পুরুষালি প্রতিবাদের আশ্রয় নিতে পারে নারীপুরুষ উভয়ই, যখন তারা দেখে যে তাদের মানসম্মান বিপন্ন। তার মতে নারীর জন্যে বেঁধে দেয়া হয়েছে বিশেষ সীমা, ওই সীমা থেকে নারী একটু ক’রে গেলেই তার নিন্দা করা হয় পুরুষালি বলে। তিনি বলেন, এটা কোনো রহস্যময় ক্ষরণের ফলে ঘটে না, ঘটে বিশেষ স্থানে ও কালে, কেননা এ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। নারী আরেক ধরনের প্রতিবাদ জানায় নিজেকে সম্পূর্ণ নারী ক’রে, পুরুষের পুরোপুরি অধীন হয়ে, নিজের ব্যর্থতায় নিজেকে অসুস্থ ক’রে। আছে আরেক ধরনের নারী, যারা ভাবতে পারে যে পুরুষই সব, তারা নিজেরা কোনো কাজের নয়, সম্পূর্ণ অযোগ্য তারা; তাদের অধীনতা ন্যায়সঙ্গত। তাদের এ-মনোভাবও একধরনের প্রতিবাদ, পরোক্ষ প্রতিবাদ : পুরুষের ওপর সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে, নিজেরা সামান্যও দায়িত্বভার না নিয়ে তারা জানায় প্রতিবাদ। তাদের ভাব এমন : যেহেতু তোমরা পুরুষ, তাই তোমাদেরই সব কিছু করতে হবে, আমরা কিছু করতে পারবো না। ফ্রয়েডের পুংগূঢ়ৈষ্যা তিনি মানেন নি, মানেন নি শিশ্নাসূয়া। তিনি মনে করেন ফ্রয়েড যে-সবকে মনে করেন জৈবিক ও বিশ্বজনীন, তা আসলে সামাজিক; তাই দরকার সমাজবদল।
ফ্ৰয়েড মনোবিজ্ঞানের নামে নারী সম্পর্কে প্ৰকাশ করেছিলেন একরাশ পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার; পুরুষাধিপত্যকে তিনি ক’রে তুলেছিলেন জৈবিক, যদিও তা সাংস্কৃতিক। তাঁর প্রভাবেরও সীমা ছিলো না; তিনিই যেহেতু ছিলেন মনোবিজ্ঞানের শেষ কথা, তাই দেখা দিয়েছিলেন তাঁর অসংখ্য অনুসারী, ও জনপ্রিয় ভাষ্যকার, যারা প্রচার ক’রে চলছিলেন যে নারী বিকলাঙ্গ, আর পুরুষাধিপিত্য মেনে নেয়াই নারীজীবনের সার্থকতা। চল্লিশের দশকে দেখা দেন একদল মনোবিজ্ঞানী, যাদের বলা হয় উত্তর-ফ্রয়েডীয়, যাদের মধ্যে ছিলেন অনেক নারীও; কিন্তু তারা ফ্রয়েডের সমস্ত কুসংস্কারকে চূড়ান্ত বিজ্ঞান মনে ক’রে বিচিত্ৰভাবে প্রমাণ করেন যে নারী বিজ্ঞানসম্মতভাবেই বিকলাঙ্গ পুরুষ। ইয়ুং ফ্ৰয়েডকে বলেছিলেন, ফ্রয়েডের মৃত্যুর পরে তাঁর অনুসারীরা তাঁর ভুলগুলোকেও ‘পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন’ হিশেবে গণ্য করবে, তা প্রমাণিত হয় সত্য ব’লে। উত্তর-ফ্রয়েডীয়রা ফ্রয়েডের সমস্ত ভুলকে ধ্রুব জ্ঞান ক’রে সেগুলোকে চাপিয়ে দিতে থাকেন নারীর ওপর; জনপ্রিয় ভাষ্যকারেরা সেগুলোকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নারীদের সন্ত্রস্ত ক’রে তোলেন। ফ্রয়েডের নারীতিত্ত্বের দুজন আদি সম্প্রসারণকারী নারী : মারি বোনাপার্তা ও হেলেন ডয়েটশ; কিন্তু তারা কোনো প্রশ্ন তোলেন নি ফ্রয়েডের নারীমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে, বরং তারা ফ্রয়েডকে ছাড়িয়ে গিয়ে প্রবলভাবে প্ৰকাশ করেন নারী সম্পর্কে ছদ্মবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার। যেমন ফ্রয়েডীয় নারীর অক্রিয়তা ও মর্ষকামতত্ত্বকে বোনাপার্ত [দ্র মিলেট (১৯৬৯, ২০8)] চরমরূপ দেন এভাবে :
‘পশু বা উদ্ভিদ, প্ৰাণীজগতের সবটা জুড়েই অক্রিয়তা হচ্ছে নারীকোষেব বৈশিষ্ট্য, ডিম্বের লক্ষ্যই হচ্ছে পুরুষকোষের জন্যে অপেক্ষা করা, অপেক্ষায় থাকা যে সক্রিয় সচল শুক্রাণু আসবে ও তাকে বিদ্ধ কববে। এমন বিদ্ধকরণেব অর্থ হচ্ছে তার কোষলংঘন, তবে কোনো জীবিত প্রাণীর কোষলংঘন বোঝাতে পারে ধ্বংস : মৃত্যু অথবা জীবন। তাই নারীকোষের উর্ববতা সূচিত হয় এক ধরনের ক্ষত দিয়ে; স্বভাবে, নারীকোষ আদিরূপেই ‘মর্ষকামী’।‘
