‘স্বামী যদি কুষ্ঠরোগী হয় আর তাহার পুঁজ ইত্যাদি স্ত্রী নিজ জিহ্বা দ্বারা চাটিয়া পরিষ্কার করে, উহাতেও স্ত্রী স্বামীর হাক আদায় করিতে পাবিনে না।‘
হিন্দুদের কামকল্প-এ আছে [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭১)] :
‘স্বামী ছাড়া পৃথিবীতে নারীর আর কোনো দেবতা নেই।…স্বামী হ’তে পারে বিকলাঙ্গ, বৃদ্ধ, পাপিষ্ঠ, বদমেজাজি, লম্পট, অন্ধ, বধিব বা বোবা। তবু সাবাজীবন নারী তাকে মান্য ক’রে চলবে।‘
এসব বিধানে যেমন পীড়ন করা হয়েছে নারীকে, তেমনি মুছে ফেলা হয়েছে তার আত্মমর্যাদার শেষ কণাটিকেও। নারীপীড়ন, ও তার মর্যাদা অস্বীকারের উৎকট বিধান দিয়েছে আঠারোশতকের এক জাপানি দাম্পত্যবিধিপ্রণেতা; ‘স্ত্রীর প্রতি উপদেশ’-এ সে বলেছে [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৭১)] :
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্বামীর প্রতি নারীর ভক্তি।… স্ত্রী সব সময় কল্পনা করবে সে-সব, যা তার স্বামীর আনন্দ বাড়াবে, তাকে কোনো কিছু করতে দিতে অস্বীকার করবে না। যদি সে অল্পবয়স্ক বালক পছন্দ করে, তবে স্ত্রী বালকের মতো হাঁটু গেড়ে বসবে যাতে স্বামী পেছন দিক থেকে তাকে নিতে পারে। তবে স্ত্রীকে ভুললে চলবে না যে পুরুষ নারীর পায়ুর কোমল প্রকৃতি বুঝতে পারে না, সে জোর ক’রে ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারে। তাই স্ত্রীব উচিত ধীরেধীরে নিজেকে প্রস্তুত করা এবং সিজিশুমি ক্রিম ব্যবহার করা…
এসবের পরেও নারী কী ক’রে রক্ষা করে তার আত্মমর্যাদাবোধ? যে-নারী মেনে নেয় এসব, তার জন্যে সমস্যা নেই, সে চলে যায় সব সমস্যার পরপারে; কিন্তু যে-নারী হ’তে চায় স্বাধীন, জড়িত হতে চায় কোনো পেশায়, তার জন্যে এসব তৈরি করে সংকট। এমন নারী হয়ে পড়ে অসুস্থ, সে ব্যর্থ হয় কর্মে ও প্রেমে। এর পেছনে নারীর শরীরের কোনো ভূমিকা নেই, আছে সমাজসংস্কৃতির ক্রিয়া। সমাজই ব্যর্থ ও অসুস্থ ক’রে দিচ্ছে নারীকে, কিন্তু ফ্ৰয়েড তার নিন্দা করেন পুংগূঢ়ৈষাগ্ৰস্ত ব’লে। হোরনি দেখিয়েছেন, মূলসংকট হচ্ছে প্রেমের অতিমূল্যায়ন, প্রেমকেই নারীর জীবনের সব ব’লে ভাবা; যেনো পুরুষের সাথে নারীর কামসম্পৰ্কই জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিশ। যদি নারী প্রেমেই না পড়লো, প্রেমই না পেলো, স্ত্রীই না হ’তে পারলো, তাহলেই যেনো তার জীবনের সব নষ্ট হয়ে গেল; তার জীবন হয়ে উঠলো অস্বাভাবিক। যে-নারী পিতৃতন্ত্রের বিধান মানে না, সে-ই ব্যাধিগ্রস্ত ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে; মদিও তা রোগ নয়, তা পিতৃতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতামনস্ক নারীর বিদ্রোহ।
ক্লারা টম্পসন আরো প্রবলভাবে প্ৰত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রয়েডকে। তিনি দেখান যে নারীমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ফ্রয়েডের সিদ্ধান্তগুলো জন্মেছে নারীর নিকৃষ্টতা সম্পর্কে ফ্রয়েডের বদ্ধমূল ধারণা থেকে; তাই ফ্রয়েড শিশ্নাসূয়া, ঈৰ্ষা, মর্ষকাম, হীনমন্যতাবোধ প্রভৃতিকে মনে করেছেন জৈবিকা; তবে এসবের উৎপত্তি ঘটেছে সাংস্কৃতিক কারণে। মানুষ যে-অবস্থায় পড়ে সাধারণত তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, নারীও নিয়েছে। শিশ্ন পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সুবিধা আর আধিপত্যের প্রতী, নারী ঈর্ষা করে পুরুষের ওই সুবিধা আর আধিপত্যকে। নারী শিশ্নকে ঈর্ষা করে না, আর ঈর্ষাও সর্বজনীন নয়। ঈর্ষাবিদ্বেষ প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতির চরিত্র; নারীকে বাদ দেয়া হয় ওই প্রতিযোগিতা থেকে, তাকে দেয়া হয় না বিকশিত হতে। তাই তার মনে ঈর্ষা জন্মানো স্বাভাবিক, তবে এর পেছনে কোনো জৈব কারণ নেই। বর্তমান ব্যবস্থায় একটি নিৰ্বোধি পুরুষ যে-সাফল্য লাভ করতে পারে, একটি বুদ্ধিমান নারী তা পারে না; তাই সে হতে পারে ঈর্ষাকাতর। সমাজই ঈর্ষার জনক। নারীর হীনমন্যতাবোধও সমাজে তার প্রকৃত অবস্থারই প্রতিফলন; তা শিশ্নাহীনতার ফল নয়, মনোব্যাধিও নয়। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থা দেখে দেখে নারী ভোগে হীনমন্যতায়, এর পেছনে তার শরীর নেই; আছে সমাজ। নারীর পরাসত্তা দুর্বল, এটা নারীর জৈবিক স্বভাব নয়; এটা সমস্ত অধীন জাতিরই কৃত্রিম স্বভাব। তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে চায় শক্তিমানদের স্বীকৃতি। ভিক্টোরীয় তরুণী বা আজকের মধ্যপ্রাচ্যের বা বাঙলাদেশের তরুণী নির্ভরশীল তার পিতার ওপর, তার কোনো সুযোগ নেই স্বাধীন মন বিকাশের। যদি সে স্বাধীন হ’তে চায়, তবে তা হবে বিপজ্জনক। দুর্বলকে সব সময়ই আত্মরক্ষার জন্যে শক্তিমানের ভাবাদর্শ মেনে নিতে হয়। নারীও তা মেনে নিয়েছে, তাই মনে হয় নারীর পরাসত্তা দুর্বল; তবে এটা প্রাকৃতিক বা জৈবিক কারণে ঘটে নি, ঘটেছে সামাজিক কারণে।
ফ্রয়েডের মতে নারীদের আবেগমননগত বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায় পুরুষের অনেক আগে। তিনি (১৯৩৩, ১৭৩) বলেন, ‘তিরিশের কাছাকাছি কোনো পুরুষকে মনে হয় প্রাণবন্ত, এক অর্থে অপূর্ণ বিকশিত ব্যক্তি, যার কাছে প্রত্যাশা করি যে সে তার বিকাশের সব সম্ভাবনা পূরণ করবে… তবে ওই বয়সের নারীরা মাঝেমাঝেই তাদের মনস্তাত্ত্বিক অনমনীয়তা ও অপরিবর্তনীয়তা দিয়ে আমাদের বিচলিত করে।’ এ দেখেই তিনি ধ্রুব সূত্রে পৌঁছে গেছেন যে তিরিশ বছরের পর নারীদের আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না! তিরিশ বছরেই নারী সমাপ্ত; এবং এর মূলে আছে তার শরীর। সম্পূর্ণ ভুল তার সূত্র, যদিও পর্যবেক্ষণ নির্ভুল। ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণের আভ্যন্তর ব্যাখ্যা দিয়েছেন টম্পসন; তিনি দেখিয়েছেন ওই কালে এ-ই ছিলো স্বাভাবিক। তখনো পৃথিবীর অধিকাংশ জুড়ে এটাই স্বাভাবিক যে নারী সমাপ্ত তিরিশে। এক সময় বাঙলায় জনপ্রিয় ছিলো একটি শ্লোক যে বাঙালির মেয়ে কুড়িতেই বুড়ী, অৰ্থাৎ তার জীবন নিঃশেষিত বিশ বছরেই। টম্পসন বলেছেন, নারীর জীবনের সাফল্য যতোদিন নির্ভর করবে বিয়ে ও মাতৃত্বের ওপর, ততোদিন তিরিশেই তার জীবনের সাফল্য বা ব্যর্থতা অর্জিত হয়ে যাবে। যদি তার বিয়ে হয় ষোলো বা আঠারোতে, তাহলে তিরিশ বছরের মধ্যে উজাড় হয়ে যায় তার জরায়ু ও সৌন্দৰ্য, যা ছিলো তার জীবনের সম্ভাবনার ভিত্তি। যদি তার বিয়ে না হয়, তাহলে তার জীবন ব্যৰ্থ, বিয়ে হ’লেও ব্যর্থ কেননা বিয়ে ও সন্তান কোনো সাফল্যই নয়। এখনো পৃথিবী জুড়ে তিরিশ বছর বয়স্ক অধিকাংশ নারীর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। টম্পসন ফ্রয়েডের পর্যবেক্ষণ মেনে নিয়ে দেখিয়েছেন তাঁর ব্যাখ্যার ত্রুটি; দেখিয়েছেন ফ্রয়েড নারীকে দেখেছেন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে, ফ্রয়েডের নারী হচ্ছে পুরুষের না-সূচক রূপ। ফ্রয়েড দেখেছেন তাঁর নিজের সংস্কৃতির নারীদের, আর ওই নারীদের স্বভাবকে মনে করেছেন বিশ্বজনীন ও শাশ্বত। ফ্রয়েড স্বাভাবিক নারীদের ব্যাখ্যা করেন নি, করেছেন পিতৃতন্ত্রের পর্যুদস্ত নারীদের। তিনি ফ্রয়েডের পুংগূঢ়ৈষ্যারও দিয়েছেন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা; তিনি দেখিয়েছেন সংস্কৃতিই নারীকে ডাকে ওই দিকে। নারী যখন প্রথাগত আশ্রিত ভূমিকা ছেড়ে স্বাধীন জীবনের খোজে বেবিয়ে পড়ে, তখন সে সাফল্যের জন্যে অনুসরণ করে সফলদেরই : নারী দেখে সফল হচ্ছে পুরুষ, তাই নারী অনুকরণ করে পুরুষের আচরণ। পুরুষের জগতে পুরুষের অনুকরণ করে সাফল্য অর্জন করে নারী, যা তার পুরুষাধীন অবস্থায় অসম্ভব। তাই পুংগূঢ়ৈষ্যা কোনো রোগ নয়। ফ্রয়েভ নারীর যে-সব বৈশিষ্ট্যকে মনে করেছেন একান্তভাবে নারীসুলভ ও জৈবিক, সেগুলোকে টম্পসন দেখিয়েছেন সামাজিক অবস্থার ফল ব’লে। তা শাশ্বত নয়, তার সাথে দেহের সম্পর্ক নেই, তা নারীর মৌল স্বভাব নয়। নারীর মৌল স্বভাব কী? টম্পসন বলেছেন, নারীর মৌল স্বভাব আজো অজানা’ [দ্র উইলিয়মস (১৯৭৭, ৭৬)।
