নারী যদি একটি শিশ্ন পেতো, তাহলে নিজের রূপে অন্ধ হতো না; শিশ্নের অভাব নারী মিটিয়ে নেয আত্মপ্রেমে! নারীর আত্মপ্রেমের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফ্রয়েড; তার মতো চমৎকার পর্যবেক্ষক ও শোচনীয় অপব্যাখ্যাকার বেশি মেলে না। সমাজ নারীকে যে-রোগে রুগ্ন দেখতে পছন্দ করে, তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয় যে-রোগের বীজ, ফ্রয়েড তাকে ক’রে তুলেছেন জৈবিক। নারী নিজের রূপসচেতন, রূপের জন্যে অশেষ তার আকুলতা, নিজের রূপে সে বিভোরও হয়, এমনকি পুরুষের চোখেও সে দেখে নিজের মাংসের বিন্যাস; তার কারণ সে জানে সে কামসামগ্ৰী, তার মূল্য তার সম্ভোগযোগ্যতায়। নিজেকে নিজে সম্ভোগের জন্যে নারী আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ নয়; পুরুষতন্ত্রের বিধান অনুসারে পুরুষের সম্ভোভযোগ্য হয়ে ওঠার জন্যেই নারী রূপসচেতন। সে জানে তার দেহ খাদ্য হবে পুরুষের, তাই নারী নিজেকে ক’রে তুলতে চায় সুস্বাদু খাদ্য। মেরি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট্ (১৭৯২) বলেছেন, ‘শিশুবেলা থেকেই শেখানো হয় যে রূপই নারীর রাজদণ্ড, তার মন বেঁকে যায় তার দেহের আদলে, এবং এর কারুখচিত খাঁচার চারদিকে ঘুরেঘুরে সাজাতে শেখে শুধু কারাগারটিকে’ [দ্র। গ্রিয়ার (১৯৭১, ৫৫)]। ফ্রয়েড এসব মনে করেছেন জৈবিক; নারী জৈবিকভাবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আর আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ। ফ্রয়েড তাঁর সময়ের নারীস্বভাব বর্ণনা করেছিলেন নির্ভুলভাবে, তবে প্রতিক্রিয়াশীলতাবশত তা ব্যাখ্যা করেছেন ভুলভাবে; আর বিধান দিয়েছেন সম্পূর্ণ নারীবিরোধী। যদি দেখি একদল মানুষকে ক’রে ফেলা হযেছে অক্রিয়, দুঃখযন্ত্রণাকে ক’রে তোলা হয়েছে তাদের জীবন, তাদের বাধ্য করা হয়েছে প্ৰভুদের মনোরঞ্জন ক’রে তুচ্ছ গর্বে মেতে উঠতে, তখন কি বলবো যে এসবই অবধারিত, এ-ই। তাদের জৈবস্বভাব? নিশ্চয়ই বলবো না, কিন্তু বলেন মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড। বিশশতকে ফ্রয়োউীয়বাদ দেখা দিয়েছিলো নারীবাদের প্রধান প্রতিপক্ষীরূপে।
ডান পেজ ১৬৫
কারেন হোরনি, ক্লারা টম্পসন, আলফ্রেড অ্যাডলার বেশ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ফ্রয়েডীয় প্রতিক্রিয়াশীল নারীমনোবিজ্ঞান, কেননা ওই মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য নারীর পুরুষাধীনতাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা। ধর্মের বিরুদ্ধে আজ কথা বলা যায়, প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে যে-কোনো নির্বোধ; কিন্তু বিশশতকে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলা অসম্ভব। বিজ্ঞানের মুখোমুখি সবাই অসহায়, তার সূত্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার শক্তি নেই সাধারণের। তাই ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞান নারীর বিরুদ্ধে কাজ করেছে প্রথাগত পুস্তকগুলোর থেকে অনেক বেশি প্রচণ্ডভাবে। মনোবিজ্ঞানীরাই প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন ফ্রয়েডীয় নারীমনোবিজ্ঞানের, যদিও তা বিশশতকের শ্রুতিতে প্রবেশ করে নি। কারেন হোরনি মনোবিশ্লেষকদের মধ্যে দেখেছিলেন পুরুষবাদী ঝোঁক; তারা মানুষ বলতে বুঝেছেন পুরুষ, এবং নারীকে দেখেছেন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি শিশ্নাসূয়া, পুংগূঢ়ৈষ্যা, নারীদের হীনমন্যতাবোধ প্রভৃতি ধারণা ব্যাখ্যা করে দেখান যে এগুলো জৈবিক নয়, সাংস্কৃতিক। মর্ষকামের কথা ধরা যাক। হোরনি দেখেছেন কোনোকোনো মনোব্যাধিগ্রস্ত নারী মর্ষকামী, কিন্তু তিনি একে জৈবিক ব’লে মনে করেন নি। তিনি এর দিয়েছেন ফ্রয়েডের থেকে অনেক অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাখ্যা। তিনি বলেছেন, ‘কোনো জীবন্ত প্ৰাণী যখন পড়ে বিপর্যয়কর অবস্থার মধ্যে, তখন সে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে’ [দ্র উইলিয়মস (১৯৭৭, ৬৮)]। নারী পড়েছে প্ৰাণীজগতের সবচেয়ে বিপর্যয়কর অবস্থায়, তাই নারী খাপ খাইয়ে নিয়েছে বিপর্যয়ের সাথে। নারীর অবস্থা ও মন ব্যাখ্যার জন্যে বিবেচনা করতে হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো; তার শরীরের বাঁকে, রন্ধে, অন্ধুরে খোঁজাখুঁজি ক’রে ওগুলোর সূত্র মিলবে না। তিনি মর্ষকামের একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। জারের শাসনকালে রাশিয়ার চাষীনারীরা চাইতো যে তাদের স্বামীরা তাদের প্রহার করুক, ওই প্ৰহার ছিলো প্রেমের প্রমাণ। এতে যদি মনে করা হয় যে নারীরা বা রুশ নারীরা মর্ষকামী, তবে বড়ো ভুল করা হবে। ওই সমাজব্যবস্থায় প্রহারকেই মনে করা হতো প্রেমের প্রকাশ; কিন্তু আজকের রাশিয়ার নারীরা প্রেমের প্রমাণরূপে প্ৰহারের কথা ভাবতেই পারে না। ওই সমাজের বদল ঘটেছে, তাই বদল ঘটেছে নারীর বাহ্যিক আচরণেরও, তবে নারীর প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটে নি। প্রতিটি জাতির ধর্মে, সাহিত্যে, কিংবদন্তিতে নারীকে দেখানো হয়েছে মর্ষকামীরূপে, গাওয়া হয়েছে নারীর মর্ষকামের গাঁথা। আদর্শ সতী মর্ষকামী, আদর্শ মা মর্ষকামী, আদর্শ প্রেমিকা মর্ষকামী, আদর্শ কন্যা মর্ষকামী; নারী পিতৃতন্ত্রের ধর্ষকামের ধারাবাহিক ভোগ্যসামগ্ৰী।
হোরনি বলেছেন, নারীপ্রকৃতি সম্পর্কে যে-ভাবাদর্শ গড়ে তোলা হয়েছে, তা হচ্ছে নারী দুর্বল, আবেগপরায়ণ, অক্রিয়, পরনির্ভর : এ-ভাবাদর্শের জন্যেই নারীকে মনে হয় ওই সব অপবৈশিষ্ট্যের সমষ্টি। পুরুষ নারীকে এমনই দেখতে চায়। এসবের জন্যেই নারী ভূমিকা পালন করে অক্রিয়তার, হয় মর্ষকামী বা আত্মপ্ৰেমমুগ্ধ; কিন্তু একে জৈবিক মনে করার কারণ নেই। ‘প্রেমের অতিমূল্যায়ন’ (১৯৩৪) নামের একটি লেখায় তিনি দেখান যে সামাজিক অবস্থা নারীকে শেখায় যে তাকে হ’তে হবে পিতৃতন্ত্রের আদর্শ নারী; তার জীবনের লক্ষ্য হবে বিশেষ কোনো পুরুষকে ভালোবাসা ও তার ভালোবাসা পাওয়া, তার সেবা করা। তার জীবন হবে বিশেষ পুরুষকেন্দ্রিক, সে ঘুরবে পুরুষসূর্যকে কেন্দ্ৰ ক’রে। এমন অবস্থা পুরুষের মনে বাড়িয়ে দেয় আত্মমর্যাদাবোধ, আর কমিয়ে দেয় নারীর আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাস। প্রতিটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থে বারবার পাওয়া যায় এমন সব নির্দেশ, যা পুরুষকে দেবতা আর নারীকে ক’রে তোলে আত্মমর্যাদাহীন জন্তু। ইহুদিধর্মের বিধান হচ্ছে স্ত্রী স্বামীকে সম্বোধন করবে বাআল [প্ৰভু] বা আদোন [বিধাতা] বলে; সম্পূর্ণ আত্মসমৰ্পণ করবে তার কাছে। একটি হাদিসে আছে [দ্র ফজলুর রহমান (১৯৭৭, ৩৩৫)] :
