ফ্রয়েডের চোখে নারীর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য : অক্রিয়তা, মর্ষকাম, ও আত্মপ্ৰেম। বর্ণনা হিশেবে এগুলো ভুল নয়, তিনি তাঁর সময়ের নারীদের এ-বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন ঠিক মতোই, কিন্তু ব্যাখ্যা করেছেন ভুল। শিতৃতন্ত্র নারীকে দেখতে চায় অক্রিয়, তাই নারী তার স্বভাবের মধ্যে মেনে নিয়েছে অনেকখানি অক্রিয়তা, কেননা সক্রিয় হ’লেই পুরুষতন্ত্র ক্ষেপে ওঠে তার ওপর। পিতৃতন্ত্র সে-নারীকেই মহীয়সী মনে করে যে সহ্য করতে পারে চরম দুঃখযন্ত্রণা, পিতৃতন্ত্র বিরামহীন পীড়ন সহ্য করারকেই মনে করে নারীত্ব। পিতৃতন্ত্র সৃষ্টি করেছে অসংখ্য সতীচরিত্র, সীতা ও রহিমা, যারা মহত্ত্ব অর্জন করেছে শুধু অপাের পীড়ন সহ্য করে। পুরুষ, শো’পনহায়ারের মতো, মনে করে যে নারী জীবনের ঋণ কাজ দিয়ে শোধ করে না, করে দুঃখ দিয়ে। তাই নারীকে বাধ্য হয়েই হয়ে উঠতে হয়েছে মর্ষকামী। পিতৃতন্ত্র নারীকে সম্ভোগসামগ্ৰী রূপে দেখে, এজন্যে নারী আত্মপ্রেম আয়ত্ত কলে অনেকখানি। অর্থাৎ পিতৃতন্ত্র নারীকে যে-ভূমিকা দিয়েছে, নারী তাতে অভিনয় করেছে নিজের অস্তিত্বের জন্যেই। তবে ফ্রয়েড নারীর অক্রিয়তা, মর্ষকাম, আত্মপ্রেমকে এ-চোখে দেখেন না; তিনি একে মনে করেন জৈবিক ও নারীত্ব। তিনি নারীর মধ্যে খোঁজেন এসবই। তিনি বিধান দেন যে নারীকে হতে হবে অক্রিয়, মর্ষকামী, আত্মপ্রেমিক, এসব যাদের আছে তারাই স্বাভাবিক নারী। নারীকে অক্রিয় হ’তে হবে; কী করতে হবে এর জন্যে? তিনি বলেন, নারীকে ভগাঙ্কুরের সুখ ছেড়ে যেতে হবে মাতৃত্বের দিকে, সুখ খুঁজতে হবে রন্ধে। তাঁর মতে অক্রিয়তা আর মর্ষকাম একান্ত নারীর বৈশিষ্ট্য, এবং জড়ানো একে অন্যের সাথে; তাই এ-দুটি নারীর জন্যে স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক পুরুষের জন্যে। মর্ষকাম নারীসুলভ, আর নারীত্ব মর্ষকামধর্ম। ফ্ৰয়েড বলেন (১৯৩৩, ১৪৮-১৪৯) :
‘তাদের আক্রমণাত্মকতা অবদমনের ফলে, যা নারীদের ওপর চাপিয়ে দেয় তাদের গঠন ও সমাজ, তাদের মধ্যে বিকশিত হয় তীব্র মর্ষকামবাদী প্রবর্তনা, যার ফলে তাদের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কামগতভাবে রুদ্ধ হয়ে হযে ওঠে অন্তর্মুখি। তাই মর্ষকাম, যেমন বলা হয়ে থাকে, সত্যিকাব্যভাবেই নারী ধর্মী। তবে যখন আমরা মাঝেমাঝেই পুরুষের মধ্যে মর্ষকাম দেখতে পাই, তখন একথা ছাড়া আর কী বলতে পারি যে ওই সব লোকের মধ্যে প্রকাশ ঘটেছে সুস্পষ্ট নারীধর্মী বৈশিষ্ট্য?’
ফ্ৰয়েড মনে করেন নারী জৈবিকভাবেই তৈরি হয়েছে পীড়ন ভোগ করার জন্যে; পীড়ন নারীর জন্যে একধরনের সুখ। তাই পুরুষ যখন পীড়ন করে নারীকে, তখন পুরুষ কোনো অপরাধ করে না, বরং তাকে দেয় সুখ। ফ্রয়েডীয় মর্ষকামবাদকে তার যৌক্তিক পরিণতিতে নিলে দাঁড়ায় যে পীড়নধর্ষণ নারীর জন্যে শুধু ভালোই নয়, বরং নারী ব্যাকুল হয়ে থাকে এরই জন্যে। নারীকে ছিঁড়েফেড়ে ফেললেও, ফ্রয়েডের তত্ত্বানুসারে, পুরুষের কোনো অপরাধ হওয়ার কথা নয়, কেননা তা পরিতৃপ্ত করে নারীর সহজাত মর্ষকামকে! নারী পীড়িত হয়ে সুখ পায়, এমন একটি বাজে কথা চালু রয়েছে কয়েক হাজার বছর ধরে; পুরুষতন্ত্রের মহাপুরুষেরা এ-ধারণাকে জনপ্রিয় করেছেন নানাভাবে, আর ফ্রয়েড দিয়েছেন তাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। ফ্রয়েডীয় মর্ষকামতত্ত্ব নারীপীড়নের বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব, এবং অপবিজ্ঞান।
ফ্রয়েডের নির্দেশিত নারীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য আত্মপ্রেম বা নার্সিসিজম। নার্সিসিজম শব্দটি যদিও জন্মেছে আত্মপ্ৰেমমত্ত এক পৌরাণিক পুরুষের নাম থেকে, তবু পুরুষতন্ত্র পৃথিবী জুড়েই আত্মপ্রেমকে মনে করে একান্ত নারীর রোগ; ফ্রয়েডও তাই মনে করেন। নারীর আত্মপ্রেম, নারীর অক্রিয়তা বা মর্ষকামের মতোই, ফ্রয়েডের মৌলিক আবিষ্কার নয়; তাঁর আগে, কয়েক হাজার বছর ধ’রে, নারীর আত্মপ্রেমের বহু উপকথা লিখেছে পুরুষ, ফ্রয়েড দিয়েছেন তার অপবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। তাঁর মতে নারীর আত্মপ্রেম বিকার, তবে খুবই স্বাভাবিক নারীর জন্যে। পুরুষও হতে পারে আত্মপ্রেমিক, স্বীকার করেন ফ্ৰয়েড; তবে পুরুষের আত্মপ্রেম বিকার নয়, তা উন্নত প্রকৃতির; পুরুষের রয়েছে আত্মপ্রেমের উৎকর্ষীয়ণের প্রতিভা। পুরুষ, ফ্রয়েড বলেন, নিজের প্রেমে পড়ে অন্যের বা নারীর প্রেমে পড়ার মতো করে, তাই তা সুস্থ; কিন্তু স্বভাববিকৃত বিকলাঙ্গ ক্ষীণলিবিডো শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারী তা পারে না; তার আত্মপ্রেম নিজের দেহকেন্দ্ৰিক। নারী নিজের প্রেমে পড়ে যেমন পুরুষ পড়ে নারীর প্রেমে, অর্থাৎ নারী নিজে পুরুষ হয়ে পড়ে নিজের শরীরের প্রেমে। এটা বিকার। নারী পারে না আত্মপ্রেমের উৎকর্ষ সাধন করতে, পুরুষ পারে। আত্মপ্রেম, ফ্রয়েডের মতে, একান্তভাবেই নারীধর্মী, এবং এর মূলে রয়েছে নারীর শাশ্বত শিশ্নাসূয়া। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৭০) বলেন :
‘আমরা লক্ষ্য করি যে নারীর মধ্যে রয়েছে বিপুল পরিমাণ আত্মপ্রেম, তাই তারা অন্যের প্রেমে পড়ার আবেগের থেকে অনেক বেশি বোধ করে অন্যেরা তাদের প্রেমে পড়বে, সে-আবেগ; রূপের জন্যে গর্ববোধও আংশিকভাবে তাদের শিশ্নাসূয়ারই ফল, তারা তাদের মৌলিক কামানিকৃষ্টতার বিলম্বিত ক্ষতিপূরণ হিশেবেই নিজেদের শারীরিক সৌন্দর্যকে অতি বেশি মূল্য দিয়ে থাকে।‘
