ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানে পুরুষ সক্রিয়তা, আর নারী অক্রিয়তা। পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তা তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন এমন ব্যাপার ভিত্তি ক’রে, যার ভিত্তি খুবই দুর্বল। তিনি প্রমাণ হিশেবে নিয়েছেন তাঁর সমকালের নারীপুরুষের যৌন আচরণ, এবং শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর ক্রিয়াকলাপ। তিনি দেখেছেন পুরুষ নারীকে তাড়া ক’রে ফেরে, আর সঙ্গমে নারী থাকে মাটির মতো অক্রিয় আর পুরুষ থাকে বৃষের মতো সক্রিয়, এবং এরই মাঝে প্রমাণ পেয়েছেন নারীপুরুষের জৈবিক স্বভাবের। এটা যে জৈবিক নয়, সামাজিক তা বোঝেন নি তিনি; পিতৃতন্ত্র পুরুষকে শিখিয়েছে সক্রিয়, আর নারীকে অক্রিয় হতে; নারীপুরুষ অভিনয় ক’রে যাচ্ছে নির্দেশিত ভূমিকায়। এর কিছুই জৈবিক নয়; অনুমোদন পেলে নারীও হ’তে পারে চরম সক্রিয়। সামাজিক আচরণ পেরিয়ে ঢুকেছেন তিনি আরো ভেতরে, এবং বিশ্বাস করেছেন যে প্রবিষ্টকরণের কাজটি আর শুক্রাণুর চরিত্র সক্রিয়, আর যোনি ও ডিম্বাণুর আচরণ অক্রিয়। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৪৭) বলেন :
‘পুরুষের শুক্রাণু সক্রিয় ও চলমান; এটা খুঁজে বের ক’রে নারীর অণুকে, আর ডিম্বাণু অচল এবং অপেক্ষা ক’রে থাকে অক্রিয়ভাবে। কামের অণুজীবরাশির আচরণ সঙ্গমে নারীপুরুষের আচরণের কমবেশি আদর্শ। পুরুষ সঙ্গমের জন্যে নবীকে প্ৰবোচিত করে, আবদ্ধ করে এবং ঠেলে নারীর ভেতরে নিজের পথ ক’বে নেয়।‘
ফ্রয়েড বেশ বাড়িয়ে বলেছেন শুক্রাণুর সক্রিয়তার কথা, এবং তিনি পুরোপুরি অক্রিয় ক’রে দিয়েছেন ডিম্বাণুকে, যদিও তা ঠিক নয়। ডিম্বাণুও পালন করে বেশ সক্রিয় ভূমিকা। ডিম্বাণু ফেলোপীয় নালি দিয়ে বেরিয়ে আসে, শুক্রাণুকে আবদ্ধ করে সক্রিয়ভাবে। তবে এ-অণুজীবরাশির আচরণকে আদর্শ কাঠামো হিশেবে ধরে সমাজকাঠামো ব্যাখ্যা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক কাজ। পুরুষের তথাকথিত সক্রিয়তা আর নারীর অক্রিয়তার কোনো জৈবিক ভিত্তি নেই, রয়েছে সামাজিক ভিত্তি; পিতৃতান্ত্রিক সমাজই অনুশাসনের মাধ্যমে তাদের চরিত্রকে দিয়েছে এমন রূপ। তবে ফ্রয়েড মনে করেন সক্রিয়তা-অক্রিয়তা জৈবিক, মনে করেন সমাজও দাঁড়িয়ে আছে জৈবভিত্তির ওপর। তাঁর মতে, নারীর কাজ হচ্ছে অক্রিয় থাকা যেমন পুরুষের কাজ সক্রিয় থাকা, কেননা তাঁর প্রকৃতি তাই চেয়েছে।
ফ্রয়োড়ীয় মনোবিজ্ঞানে মানুষের প্রাণশক্তি বা কামের চালকশক্তির নাম লিবিডো। ১৯০৫-এ তিনি লিবিডোকে নির্দেশ করেছিলেন পুরুষধর্মী ব’লে, বলেছিলেন যে লিবিডো ‘নিয়মিতভাবে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পুরুষপ্রকৃতির, তা পুরুষ বা নারীর যারই হোক’ [মিলেট (১৯৬৯, ১৯২)]। পরে, ১৯২৩-এ, তিনি কিছুটা মত বদলে বলেন যে লিবিডো লিঙ্গনিরপেক্ষা; তবুও ভেতরে ভেতরে তিনি বিশ্বাস করেন যে লিবিডো আসলে পুরুষপ্রকৃতিরই। ১৯৩৩-এ লিবিডো সম্পর্কে ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৬৮-১৬৯) বলেন :
‘কামজীবনের চালিকাশক্তিকে আমরা বলেছি ‘লিবিডো’। এ-কামজীবন নিয়ন্ত্রিত হয়। পুরুষধর্মী ও নারীধর্ম দুই বৈপবীত্য দিয়ে; তাই অনেকে লিবিডোকে এ-দুই বৈপরীত্যের সাথে সম্পর্কিত করার প্ররোচনা বোধ করতে পারেন। এটা বিস্ময়কর মনে হতো না। যদি দেখা যেতো যে কামের প্রত্যেক কপোব বয়েছে নিজ ধরনেব লিবিডো, এর ফলে এক ধরনেব লিবিডো কাজ করতো পুরুষধর্ম কামজীবনের লক্ষ্য থেকে, এবং অন্যটি নারীধর্মী লক্ষ্য থেকে। তবে এমন কিছু ঘটে না। লিবিডো রয়েছে এক ধরনেরই, যা পুরুষের কামের ভূমিকা যতোটা পালন কবে ততোটাই পালন করে নারীর কামের ভূমিকা। এর আমরা কোনো লিঙ্গ নির্দেশ করতে পারি না; যদি আমরা প্রথাগত পুরুষধর্মিতা ও সক্রিয়তার সাদৃশ্য অনুসাবে একে পুরুষধর্ম বলি, তবে আমাদের ভুললে চলবে না যে এর অক্রিয় লক্ষ্যের প্রবর্তনাও রয়েছে। তবে ‘নারীধর্মী লিবিডো’ পদটি গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের ধারণা হচ্ছে যখন লিবিডোকে লাগানো হয় নারীধর্ম কাজে, তখন তার ওপর পীড়ন করা হয় বেশি; এবং পরমকারণমূলকভাবে বলতে গেলে–প্রকৃতি পুরুষেব ভূমিকার দাবির প্রতি যতোটা মনোযোগ দিয়েছে নারীর ভূমিকার দাবির প্রতি ততোটা মনোযোগ দেয় নি। এবং আবারও পরমকারণমূলকভাবে-এর কারণ সম্ভবত এই যে জৈবিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে। পুরুষের আক্রমণাত্মকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীর সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ।‘
নারীসম্পর্কে ফ্রয়েডের সবচেয়ে আপত্তিকর সিদ্ধান্তগুলোর কয়েকটি পাচ্ছি এখানে। তিনি যদিও বলেছেন লিবিডোর কোনো লিঙ্গ নেই, তবুও তিনি বিশ্বাস করেন লিবিডো আসলেই পুরুষধর্মী; তাই পুরুষেরই রয়েছে সভ্যতা সৃষ্টির শক্তি, এবং তার ওপর অর্পণ করেছে সমস্ত মানবিক দায়ভার। প্রকৃতি নারীকে দিয়েছে সামান্য লিবিডো, নারীর দাবির দিকে মনোযোগ দেয় নি, এসবই বিজ্ঞানের বেশে ভিক্টোরীয় কুসংস্কার প্রচার। তিনি বিশ্বাস করেন নারীর যেহেতু লিবিডো কম, তাই নারীর পক্ষে পুরুষের মহত্ত্ব অর্জন অসম্ভব; নারীর প্রতিভা নেই সভ্যতাকে কিছু দেয়ার। তিনি নারীকে বাইরে রেখেছেন সভ্যতার; ‘সভ্যতা ও তার অতৃপ্তি’তে (১৯৩০) দেখিয়েছেন নারী আসলে সভ্যতার শক্ৰ। ফ্ৰয়েড শুধু সভ্যতাসংস্কৃতির ভারই পুরুষের হাতে দেন নি, তিনি মানবপ্রজাতিকে রক্ষার ভারই দিযেছেন পুরুষের ওপর। নারী ধারণ করে মানব, কিন্তু ফ্ৰয়েড একে মূল্যবান মনে করেন না; নারী ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে আধারমাত্র। প্রকৃতি নারীকে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার ভার দেয় নি, দিয়েছে পুরুষকে! তিনি বলেছেন, জৈবিক লক্ষ্য অর্জনের ভার দেয়া হয়েছে পুরুষের আক্রমণাত্মকতার ওপর, যা কিছু পরিমাণে নারীর সহযোগিতা বা সম্মতি নিরপেক্ষ’; অৰ্থাৎ নারী চাক বা না চাক, প্রকৃতি যেহেতু পুরুষকে দিয়েছে মানবপ্রজাতি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব, তাই পুরুষ নারীকে ফাঁক ক’রে ঠেলে ভেতরে ঢুকে রক্ষা করবে মানবপ্রজাতি। ফ্রয়েডের মানবপ্রজাতি রক্ষার প্রকল্প তাই হয়ে দাঁড়ায় বলাৎকার, যা সহ্য করতে হবে নারীকে।
