ফ্রয়েডের চমৎকার উপাত্ত ও তার শোচনীয় ভাষ্য দেখে খুব দুঃখ হয়; এমন চমৎকার উপাত্তের এমন অপব্যবহার বেশি হয় নি বিজ্ঞানের ইতিহাসে। পিতৃতান্ত্রিক পুরুষাধিপত্যবাদী সমাজ নারীর সমস্ত সম্ভাবনা রোধ করে নারীকে কতোটা অসুস্থ ক’রে তুলতে পারে, তা উদঘাটন করা সম্ভব ওই উপাত্ত থেকে; কিন্তু তিনি সেদিকে না গিয়ে গেছেন ভুল পথে। তিনি নারীর অবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছেন অবধারিত জৈবিক সূত্ররূপে, যা সম্পূর্ণ ভুল। যে-অপরাধ সমাজের, তাকে তিনি কুৎসিত শিশ্নাসূয়া নামে চাপিয়ে দিয়েছেন নারীর ওপর। শিশ্নাসূয়া হচ্ছে পুরুষ-অসূয়া, যা অবধারিত বিশেষ সামাজিক পরিবেশে। পৃথিবী জুড়ে মেয়েশিশুরা ভাইয়ের শিশ্ন দেখার আগেই দেখে যে পৃথিবীটা পুরুষের। তারা দেখে সব দিকে পুরুষের আধিপত্য; পরিবার তাদের শেখায় পুরুষ প্রধান, ধর্ম শেখায় পুরুষ প্রধান, সমাজ শেখায় পুরুষ প্রধান, বিদ্যালয় আর মহাবিদ্যালয়, প্রচার মাধ্যম শেখায় পুরুষ প্রধান। সমাজরাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা পুরুষের প্রাধান্য প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের সংস্থা। ওই প্রধান্যকে একটি শিশ্নে সংহত করা মেয়েদের কাজ নয়, ফ্রয়েডের কাজ। নারীরা শিশ্নটিকে ঈর্ষা করে না, একটি শিশ্ন কী দিতে পারে তাকে ঈর্ষা করে। পুরুষকে তারা শিশ্ন বলেও ভাবে না, ভাবে পুরুষ ব’লে, যারা অধিকার করে আছে পৃথিবী। মিলেট (১৯৬৯, ১৮৭) বলেছেন, ‘ফ্রয়েড প্রধান ও নির্বোধ গোলমাল করেছেন শরীর ও সংস্কৃতি, অঙ্গসংস্থান ও মর্যাদার মধ্যে।’ ফ্ৰয়েড বিরোধী ছিলেন নারীবাদের, নারীপ্রসঙ্গে তিনি বারবার নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে কটাক্ষ করেছেন; পৃথিবীকে মুক্ত রাখতে চেয়েছেন নারীমুক্তিরোগ থেকে। সাফল্য অর্জনের জন্যে, ফ্রয়েডের বিশ্বাস, থাকতে হবে একটি ঝুলন্ত প্রত্যঙ্গ; রন্ধ থাকলে চলবে না! তাঁর বিশ্বাস মেধা আর শিশ্নের মধ্যে রয়েছে জৈবিক সম্পর্ক; পুরুষের মেধাগত শ্রেষ্ঠতার জৈবিক প্রকাশ হচ্ছে শিশ্ন। ফ্রয়েড পুরুষতন্ত্রকে দেখেছেন শিশ্নরূপে, এমনকি মস্তিষ্কের থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন ওই প্রত্যঙ্গটিকে; এবং মনোবিজ্ঞানের মুখোশে প্রকাশ করেছেন কুসংস্কার।
ফ্রয়েড নারীর দুটি একান্ত বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন : সে-দুটি হচ্ছে লজ্জা ও ঈর্ষা। তিনি দাবি করেছেন এ-দুটির মূলেও রয়েছে শিশ্নাসূয়া। নারীর লজ্জাশীলতার প্রশংসায় পিতৃতন্ত্ৰ পাগল, কিন্তু ফ্ৰয়েড জানিয়েছেন নারীদের লাজনম্রতার কারণ তাদের খোজত্বেবোধ, নিজেদের বিকলাঙ্গচেতনা। ফ্রয়েড (১৯৩৩, ১৭০) বলেন :
‘লজ্জাশীলতা, যাকে মনে করা হয় নারীর একান্ত ভূষণ, তাও আসলে, আমাদের মতে, নারী শুরু করেছিলো নিজের যৌনাঙ্গের ত্রুটি ঢাকার জন্যে।‘
নারী লজ্জায় ম’রে যায় একথা ভেবে যে তার রয়েছে রন্ধ, তার শিশ্ন নেই। ফ্রয়েড মনে করেন জৈবিক কারণেই নারী কোনো কিছু দান করতে পারে নি। সভ্যতায়, তার সে-শক্তি নেই; তবে নারীকে তিনি সভ্যতার দুটি আবিষ্কারের গৌরব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীরাই আবিষ্কার করেছিলো কাপড় বোনা আর বেণীপাকানো। কেনো? তার ক্ষতের লজ্জা ঢাকতে! তাঁর মতে, নারী যৌনদেশ দিয়ে রন্ধ্রটিকে ঢাকতে গিয়েই আবিষ্কার করেছিলো বেণীপাকানো। নারী তার রূপের গর্বেও বিভোর থাকে; এর মূলেও আছে, ফ্রয়েডের মতে, তার যৌনাঙ্গের নিকৃষ্টতা; এ দিয়ে নারী পূরণ করে তার শিশ্ন না থাকার ঘাটতি! নারীর ঈর্ষা পুরুষতন্ত্রের প্রসিদ্ধতম কিংবদন্তি আর দূৰ্মবতম কুসংস্কারগুলোর একটি। তাঁর মতে এর জন্ম শিশ্নাসূয়া থেকে। নারীর সহজাত নিকৃষ্টতা থেকে জন্ম নেয়া শিশ্নাসূয়ার ফলে, ফ্রয়েড বলেন, নারীর পরাসত্তা–সুপার ইগো–পুরুষের মতো সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না, তাই নারীর বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শবোধ, সমাজচেতনা খুবই কম। ফ্রয়েড বলেন : ‘নারীর ন্যায়-অন্যায় বোধ খুবই কম; নিঃসন্দেহে এর সম্পর্ক রয়েছে নারীর মানসিক জীবনে ঈর্ষার প্রাধান্যের সাথে।’ এ-কারণেই নারীর নেই সমাজচেতনা, এবং তাদের প্রবৃত্তি লাভ করে না উৎকর্ষ। ফ্রয়েডের এসব হচ্ছে বিজ্ঞানের নামে পুরুষের প্রাধান্য স্থায়ী করার সচেতন ও অবচেতন চক্রান্ত। নারীকে ঈর্ষাকাতর বলার অর্থ হচ্ছে শোষিতরা সবাই ঈর্ষাকাতর; ধনীদের সুখ দেখে গরিবদের চোখ জ্বলে ব’লেই তো গরিবেরা ঈর্ষাকাতর, এবং তাদের নেই বিবেক, ন্যায়-অন্যায় ও আদর্শবোধ আর সমাজের প্রতি দায়িত্ব! ফ্রয়েড বিজ্ঞানের নামে শুধু পুরুষতন্ত্রকেই রক্ষা করতে চেষ্টা করেন নি, টিকিয়ে রাখতে চেয়েছেন সব ধরনের শোষণতন্ত্রকেই।
ফ্রয়েডের ধ্রুববিশ্বাস নারীচরিত্রের, শিশ্নাসূয়া ও অন্যান্য রোগের, শেকড়ে রয়েছে তার বিকলাঙ্গ দেহ। তিনি ভুল বুঝেছিলেন প্রায় সবটাই। নারীমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ফ্রয়েডের ভ্ৰান্তির বড়ো কারণ হচ্ছে তিনি বোঝেন নি বা বুঝতে চান নি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপারের ভিন্নতা : তিনি বোঝেন নি যে নারীর শরীর আর অবস্থার মধ্যে কোনো জৈবিক সম্পর্ক নেই। তিনি, অনেকের মতোই, মনে করেছেন যে নারীর সামাজিক অবস্থা নারীর শরীরের মতো প্রকৃতিরই সৃষ্টি; নারী রয়েছে যে-অবস্থায়, তা-ই নারীর অবধারিত নিয়তি। নারীর অবস্থা যে সামাজের তৈরি, নারী যে শিকার সমাজের, তা তিনি বোঝে নি, কেননা সে-মানসিকতা তার ছিলো না; তিনি বিশ্বাস করেছেন। পুরুষ নারীকে যা করেছে, প্রকৃতি নারীকে করতে চেযেছে তাই! পুরুষ কাজ করেছে শাশ্বত প্রকৃতির বিশ্বস্ত প্ৰতিনিধিরূপে।
