অর্থাৎ শিশ্নের ঈর্ষায় ও খোজা মনোভাবের জন্যে চিরকালের জন্যে বিকৃত হয়ে যায় নারী।
শিশ্নাসূয়া ও খোজাগূঢ়ৈষার কুফল ফলে আরো; জীবনের শুরুতে মেয়েশিশু মাকে নেয় নিজের প্ৰেমাস্পদরূপে, কিন্তু এ-স্তরে এসে সে ত্যাগ করে মাকে। ফ্রয়েড বলেন, সে ছেড়ে দেয় মাকে গর্ভবতী করার বাসনা! মাকে সে বর্জন করে, কেননা মা-ই ‘দায়ী তার শিশ্নহীনতার জন্যে’; মা-ই ‘তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে এমন অপ্রস্তুতভাবে’। ফ্ৰয়েড বলেন, ‘নিজের খোজাত্ব আবিষ্কার তার জীবনের এক মোড়-বিন্দু’; এ-সময় থেকে মা ও সব নারীর মূল্য কমে যায় তার চোখে, যে-শিশ্নহীনতার কারণে পুরুষের চোখেও নারীর মূল্য কম। এ-সময়ে তার লিবিডো ছোটে পিতার দিকে, কেননা তার আছে একটি শিশ্ন। পিতা হয়ে ওঠে তার প্ৰেমাস্পদ, মাকে সে দেখতে থাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে। শিশুমেয়ে, ফ্রয়েড বলেন, মনে করে যে তার পিতা খুব উদার হয়ে তাকে উপহার দেবে একটি শিশ্ন। কিন্তু হতাশ হ’তে তার দেরি হয় না; তখন সে নিজের কামনা পূরণ করতে চায় গৰ্ভে সন্তান ধারণ করে। তবে ওই সন্তান শিশ্নের বিকল্প, শিশু নয়। ওটি এক ‘শিশ্নশিশু’। ফ্রয়েড বলেন, নারীর শিশ্নকামনা কখনো কাটে না, কেননা ‘শিশ্নকামনাই হচ্ছে একান্ত নারীর কামনা’। নারী শিশু চায়, কিন্তু কেনো চায়? নারী শিশুর জন্যে শিশু চায় না; ফ্রয়েড বলেন, নারী শিশু চায়, কেননা ওই শিশু ছাড়া শিশ্নের কাছাকাছি আর কিছু পাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব! নারী শিশ্নাতুর, শিশ্ন ছাড়া আর কিছু নারী চায় না; না পেয়ে সে চায় শিশু; তাই নারীর প্ৰেমাস্পদ হয়ে ওঠে শিশু। পুরুষ ঠিকমতো বেড়ে নারীকে ভালোবাসতে শেখে, তবে নারী পুরুষকে ভালোবাসতে শেখে না; শেখে শিশুকে ভালোবাসতে, কেননা শিশুর মধ্যেই পায় সে তার হারানো শিশ্নকে। নারীর শিশ্নকামনা একদিন চরম চরিতার্থতা লাভ করে ফ্রয়েডের (১৯৩৩, ১৬৫) মতে এভাবে :
‘তার সুখ হয় সত্যিই অসামান; যেদিন চরিতাৰ্থ হয় তার শিশুলাভের বাসনা; এ-সুখ আরো বিশেষ হয়ে ওঠে যদি শিশুটি হয় ছেলে, যে তার জন্যে নিয়ে আসে বহুকামনার শিশ্নটি।‘
ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানে নারীর সন্তানকামনাও হয়ে ওঠে শিশ্নের জন্যে অনন্ত মৃগয়া। নারীর সন্তান কামনাকে ফ্রয়েড চমৎকারভাবে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন শিশ্নকামনার সাথে; এবং নারীকে উৎখাত ক’রে দিয়েছেন তার কীর্তিত আসন থেকেও। নারীর সন্তান কামনাও জৈবিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক; পিতৃতন্ত্র নারীকে দেখতে চায় জননীরূপে, তাই নারী মা হয়ে পিতৃতন্ত্রের কাছে হ’তে চায় গ্রহণযোগ্য। পুত্রের শিশ্নটির প্রতি তার নেই কোনো আকর্ষণ; তার আকর্ষণ পুত্রের প্রতি, কেননা পিতৃতন্ত্রের মধ্যে টিকে থাকার জন্যে তার দরকার এমন একজন যে হবে পিতৃতন্ত্রের সদস্য।
বালক তার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গটি নিজে নিজে ব্যবহার করে সুখ পায়, এটা ফ্ৰয়েড অনুমোদন করেন; কিন্তু বালিকা তার নিকৃষ্ট অন্ধুরটি নেড়ে সুখ আহরণ করবে, ফ্রয়েড তা অনুমোদন করেন না। কেননা তার কাছে হস্তমৈথুন একটি একান্ত পুরুষি কাজ। বালিকাকে নারী হয়ে উঠতে হবে; তাই তাকে বন্ধ করতে হবে পুরুষি কাজটি, নইলে নষ্ট হবে তার নারীত্ব। পরিপূর্ণ নারীত্ব অর্জনের জন্যে এটা দরকার। বালিকা যখন নিজের খোজাত্ব উপলব্ধি করে মর্মেমর্মে, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়? ফ্ৰয়েড বলেন [দ্র মিলেট (১৯৬৯, ১৮৬)] :
‘সে মেনে নেয় তার খোজাত্ত্বের সত্য, এবং এর পরিণতিরূপে পুরুষের শ্ৰেষ্ঠত্ব ও নিজের নিকৃষ্টতা, তবে সে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এ-অপ্ৰিয সত্যের বিরুদ্ধে।‘
তখন নারীর শরীরের ভেতর শুরু হয়ে যায় গৃহযুদ্ধ; এ-যুদ্ধে স্বাভাবিক নারীরা জীবনের পূর্ণতা লাভ করে মাতৃত্ত্বে, কেননা জৈবিকভাবে এরই জন্যে তৈরি করা হয়েছে তাদের। বিকৃত নারীরা যায় ভুল পথে, তারা যায় সে-দিকে জৈবিকভাবে তারা যার অনপুযুক্ত। তারা বিকৃতির শিকার। ফ্রয়েড এর নাম দিয়েছেন পুংগূঢ়ৈষা। যে-নারীরা মাতৃত্ব ছাড়া অন্য কোনো কাজে সাফল্য পেতে চায়, ফ্রয়েডের চোখে তারা ব্যাধিগ্রস্ত; তারা আক্রান্ত পুংগূঢ়ৈষ্যায়। তারা সন্তানের মধ্য দিয়ে পেতে চায় না কাম্য শিশ্নটিকে, শিশ্ন পেতে চায় তারা অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, রাজনীতিক হয়ে বিভিন্ন পদের মধ্য দিয়ে। তারা ব্যাধিগ্রস্ত, তাই তাদের চিকিৎসা দরকার মনোবিকলনগ্রস্ত’ রূপে! ফ্রয়েডের মতে এরা অবিকশিত, ‘নাবালেগ’ নারী। নারী যদি তার ভাগ্যকে, নিকৃষ্টতাকে, মেনে নেয়, তাহলে সে একধরনের তৃপ্তি পেতে পারে মাতৃত্বে; কিন্তু উদ্ধত অবাধ্য নারীরা নিজেদের ব্যাধির জন্যেই ঢুকতে চায় পুরুষোল এলাকায়। এমন নারী দেখলেই বুঝতে হবে সে পুংগূঢ়ৈষ্যাগ্ৰস্ত বা পুরুষালি প্রতিবাদের শিকার। ফ্ৰয়েড ও ফ্রয়েডীয়দের মতে এদের চিকিৎসা দরকার। ফ্রয়েড বিজ্ঞানের নামে যা চালিয়েছেন, তার সবটাই কুসংস্কার : তিনি প্রথাকে ভেবেছেন সহজাত, পুরুষাধিপত্যকে মনে করেছেন প্রাকৃতিক। শিশ্নাসূয়াকে তিনি মনে করেছেন জৈবিক, যদিও তা আসলে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া। ভিক্টোরীয় সমাজব্যবস্থায় পুরুষ ছিলো দেবতার মতো, তাই নারীর পক্ষে পুরুষকে ঈর্ষা করা ছিলো স্বাভাবিক। ওই নারীরা শিশ্নকে ঈর্ষা করতো না, বা এখনো করে না, কিন্তু তারা দেখে একটি শিশ্ন কতো সুযোগ এনে দিতে পারে। তাই তারা ঈর্ষা করে, তবে শিশ্নকে নয়, করে শিশ্নধারীদের। ফ্রয়েড নারীকে পুরুষের সাথে জড়িত দেখেছেন শুধু কামসম্পর্কে, মুছে ফেলেছেন আর সব সম্পর্ক। তাঁর সময় সমাজ নারীকে কোনো সুযোগাই দিতো না, এখনো সমাজ নারীকে দেয় না। তার প্রাপ্য সুযোগ; সমাজ রোধ করে তার সমস্ত সম্ভাবনা। তাই নারীর পক্ষে পুরুষকে ঈর্ষা করা খুবই স্বাভাবিক, এটা কোনো ব্যাধি নয়, বরং সুস্থতা; কিন্তু ফ্ৰয়েড নারীর এ-সুস্থ মানবিক ব্যাপারটিকেই নির্দেশ করেছেন রোগ হিশেবে। ফ্রয়েড তার নারী রোগীদের সমস্যাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, কিন্তু সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন শিশ্নাসূয়া নামে। তিনি দেখেছেন নারী অর্জন করতে চায় পুরুষের সাফল্য, বা মানবিক সাফল্য; একে যখন তিনি বাতিল ক’রে দিয়েছেন শিশ্নাসূয়া নামে, তখন তিনি বিজ্ঞানচর্চা করেন নি, প্রকাশ করেছেন নিজের কুসংস্কার। তাঁর কুসংস্কারটি হচ্ছে যে নারী কখনো পুরুষের সমান হবে না, যেমন নারী পাবে না একটি মহামানা শিশ্ন। ফ্রয়েড সমাজপরিবর্তনে উৎসাহী ছিলেন না, তিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজসংস্কৃতির চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছেন : নারীপুরুষকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি ওই পীড়াদায়ক সমাজের সাথে। ফ্রয়েড মানুষের মনোলোকের বৈজ্ঞানিক সূত্র লেখেন নি, তিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বাহ্যিক সূত্ৰগলোকে মনোবিজ্ঞানের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন মানুষের মনের সাথে।
