ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনেকখানি দাঁড়িয়ে আছে বালিকার ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ আবিষ্কারের ওপর যে তার শিশ্ন নেই। ফ্রয়েড একে উপস্থাপিত করেছেন ভয়াবহভাবে, তার বর্ণনা শিউরে দিতে পারে যে-কাউকে; মিলেট একে বলেছেন বাইবেলি স্বৰ্গচ্যুতির পুনরাভিনয়। তবে পৌরাণিক বিধাতা স্বৰ্গচ্যুত কবেছিলেন দুজনকেই; কিন্তু বিশশতকের মনোবিজ্ঞানের বিধাতা স্বৰ্গচ্যুতি ঘটান শুধু ইভের। ফ্রয়েড বিশ্বাস করেন, এবং আমাদের বিশ্বাস করতে বলেন যে বালিকা তার ভগাঙ্কুরকে মনে করে শিশ্ন। কেনো বালিকা তার ওই শিউলিবোটাটিকে শিশ্ন মনে করে? ফ্রয়েড বলেন, বালিকা হস্তমৈথুন করে ওটি দিয়ে, তাই ওটিকে সে মনে করে শিশ্ন। যেনো ওই কাজটির জন্যে রয়েছে এক আদর্শ হাতিয়ার, যার নাম শিশ্ন; তাই যা দিয়েই করা হবে ওই কাজটি, তাকেই মনে করতে হবে শিশ্ন, বা নকল শিশ্ন, যা প্লাতোর দর্শন অনুসারে বাস্তবতা থেকে দ্বিগুণ দূরবর্তী, এবং ফ্রয়েডীয় বিজ্ঞানে নিকৃষ্ট! তিনি আরো বলেন, বালিকা ওটি দিয়ে হস্তমৈথুন করতে গিয়েই বুঝে ফেলে যে এ-কাজের জন্যে শ্রেষ্ঠ সামগ্ৰী হচ্ছে শিশ্ন। ফ্রয়েডের বালিকা তার মতোই জ্ঞানী, সে নিজের ভগাঙ্কর ছুঁয়েই সব বুঝে ফেলে; তুলনা ক’রে ফেলে শিশ্ন ও ভগাঙ্কুরের মধ্যে, এবং পৌঁছে যায় নিজের নিয়তিতে। এসব কি বালিকার ভাবনা, বালিকার বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত? পুরুষতান্ত্রিক ফ্রয়েডই বালিকা হয়ে মনে করছেন এসব, নিজের ভাবনাকে তিনি চাপিয়ে দিয়েছেন বালিকার ওপর। মেয়েশিশু যখন প্রথম দেখে কোনো ছেলেশিশুর শিশ্ন, তখনই সে কীভাবে বোঝে যে ওই সম্রান্ত প্রত্যঙ্গটি দিয়ে হস্তমৈথুন করে ছেলেশিশুটি? ধরা যাক কোনো মেয়েশিশু জীবনে প্রথম শিশ্ন দেখে এমন এক ফ্রয়েডীয় বালকের, যখন সে লিপ্ত ছিলো হস্তমৈথুনে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সে কী ক’রে বোঝে যে, ওইটিই সর্বোত্তম এ-ক্রিয়ার জন্যে? ফ্রয়েড নিজের সিদ্ধান্ত বালিকার ওপর চাপিয়ে দিয়ে তৈরি করেছেন এমন কিংবদন্তি, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হস্তমৈথুনের উৎকৰ্ষই যদি মানদণ্ড হয় শ্রেষ্ঠত্বের, তবে স্বীকার করতেই হবে যে শিশ্নের থেকে ভগান্ধুর অনেক উৎকৃষ্ট! এর স্পর্শকাতরতা, বৈদ্যুতিক পুলকের প্রতিভা নেই পুরুষের কোনো প্রত্যঙ্গের। ফ্রয়েডের বিশ্বাসে পুরুষ শ্রেষ্ঠ, নারী নিকৃষ্ট; এবং পুরুষকে, শুধু পুরুষকে নয় পুরুষের সভ্যতাকে, তিনি সংহত করেছিলেন একটি প্রতীকে: প্রতীকটি হচ্ছে শিশ্ন। ফ্রয়েডীয় বিশ্বে শিশ্নই বিধাতা; তাই তার চোখে শিশ্নের পাশে ভগাঙ্কুর শোচনীয়ভাবে নিকৃষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারী জৈবিকভাবেই নিকৃষ্ট পুরুষের থেকে। ক্লারা টম্পসন বলেছেন, ফ্রয়েড নারী সম্পর্কে ভিক্টোরীয় মানসিকতা থেকে কখনোই মুক্তি পান নি। তাঁর সমগ্ৰ চিন্তার দুটি মূল ভাবনা, খোজা গৃঢ়ৈষা ও শিশ্নসূয়া, প্রস্তাব করা হয়েছে এ-ধারণা থেকে যে নারী জৈবিকভাবে পুরুষের থেকে নিকৃষ্ট’ [দ্র ফ্ৰাইডান (১৯৬৩, ১০২)]। নারী কি সত্যিই ঈৰ্ষা করে পুরুষের প্রত্যঙ্গটিকে, নাকি কি ঈর্ষা করে ওই প্রত্যঙ্গধারীদের শিশ্নাসূয়ার পেছনে যে কোনো জৈবিক কারণ নেই, রয়েছে সামাজিক কারণ, এটা ফ্রয়েড উপেক্ষা করেছেন পুরোপুরি। তাঁর পরিভাষাটি খুবই আপত্তিকর; এটি নারীকে চিহ্নিত করে পুরুষের একটি নির্বোধ প্রত্যঙ্গের অসূয়ায় জর্জরিত জীব ব’লে, গোপন ক’রে যায় নারীর দ্ৰোহকে।
শিশ্নাসূয়ার সাথে শিশুনারীকে, ফ্রয়েডের মতে, ধরে আরেকটি রোগে; তার নাম খোজাগূঢ়ৈষ্যা। ছেলেকেও ধরে এ-ব্যাধিতে; ফ্রয়েড বলেন, সে যখন দেখতে পায় মেয়েদের নেই তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গ, তখন তাকে পায় খোজা হয়ে যাওয়ার ভয়ে। সে মনে করে কোনো কুকর্মের শাস্তি হিশেবে কেটে নেয়া হয়েছে মেয়েদের শিশ্ন; এবং তখন সে ভয় পেতে থাকে যে তার শিশ্নটিকেও কেটে ফেলে হয়তো খোজা ক’রে দেয়া হবে তাকে। তার ভয়ের কারণ সে বাবাকে হটিয়ে, ইডিপাসের মতো, কামনা করছে মাকে। সে কিছুকাল থাকে উদ্বেগ আর ভয়ের মধ্যে; কিন্তু একদিন সে অর্জন করে পৌরুষ, নিজেকে অভিন্ন মনে করে পিতার সাথে; কেটে যায় তার রোগ। মেয়ের বেলা তা ঘটে না, তা হয়ে থাকে দুরারোগ্য জন্মব্যাধি। মেয়ে যখন দেখে তার নেই শিশ্ন, সে বুঝে ফেলে তাকে খোজা ক’রে দেয়া হয়েছে; সে ভুগতে থাকে ঈর্ষায় ও হীনমন্যতায়। যখন সে দেখে তার মতো অন্য মেয়েদের, তার মায়েরও, নেই শিশ্ন, সে তখন ঘেন্না করতে শুরু করে নারীজাতিকেই। ফ্ৰয়েড (১৯৩৩, ১৬০-১৬১) বলেছেন :
‘দু-লিঙ্গের শারীরিক পার্থক্য ছাপ ফেলে মানসিক জীবনের ওপর। বিশ্লেষণ থেকে এটা আবিষ্কার করা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিলো যে মেয়ে নিজের শিশ্নের অভাবের জন্যে দায়ী কবে তার মাকে; আর এ-অভাবের জন্যে তাকে কোনোদিন ক্ষমা করে না …মেয়েদের বেলাও খোজা গূঢ়ৈষা দেখা দেয় অন্য লিঙ্গের জননেন্দ্ৰিয় দেখার পর। সে তৎক্ষণাৎ পার্থক্যটা লক্ষ্য করে, এবং বুঝতে পারে, স্বীকার করতেই হবে, এর তাৎপৰ্য সে বোধ কবে মারাত্মক অসুবিধা, এবং মাঝেমাঝেই ঘোষণা করে সেও ‘চায় ওরকম একটা কিছু’; এবং হয়ে পড়ে শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত, যা তার বিকাশ ও চরিত্রগঠনের ওপব অমোচনীয় ছাপ ফেলে যায়, যা অশেষ মানসিক শক্তি ছাড়া জয় করা যায় না। বালিকা বুঝতে পারে তার শিশ্ন নেই, এর অর্থ এ নয় যে এর অভাবকে সে মেনে নেয় হাল্কাভাবে। ঘটে এর বিপরীত, সে দীর্ঘকাল ধ’রে থাকে আমন একটা কিছু পাওয়ার বাসনায়; এবং এর সম্ভবপরতায় বিশ্বাস কবে বহু বছর; এমনকি যখন তার বাস্তবতাবোধ তাকে বাধ্য করে ওই বাসনা ত্যাগ করতে, কেননা তা চরিতাৰ্থ কিবা অসম্ভব, বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে তখনো তা বিরাজ করে তার অবচেতনায়, এবং ধারণ করে বেশপরিমাণ শক্তি। শিশ্ন লাভের যে-বাসনা এতো বেশি সে পোষণ কবে, তাই হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মনোবিশ্লেষণে আসার পেছনে থাকে; এবং মনোবিশ্লেষণ থেকে তারা যুক্তিসঙ্গতভাবেই যা প্রত্যাশা কবে, যেমন কোনো মননশীল কর্মজীবন চালানো, তাকেও অনেক সময মনে করা যায় এ-অবদমিত বাসনার উৎকর্ষিত রূপ ব’লে।‘
