‘তাঁর সম্পূর্ণ রচনায় এটা কখনো ধরা পড়ে নি যে নারীরা পুরুষের থেকে ভিন্ন–নিকৃষ্ট বলবো না, বলবো বিপরীত৷… পুরুষের মতো নারীকেও জীবনসংগ্রামে পাঠাতে হবে, এটা সত্যিই একটা মৃতজাত ভাবনা। যদি আমি আমার মিষ্টি মেয়েকে কল্পনা করি এমন প্রতিযোগীরূপে, তাহলে তাকে আমি শুধু বলতে চাই, যেমন সতেরো মাস আগে বলেছি যে আমি তাকে ভালোবাসি এবং আমি চাই সে নিজেকে ওই সংগ্রাম থেকে গুটিয়ে নিয়ে আশ্রয় নেবে আমাব গৃহের শান্ত প্রতিযোগিতাহীন কাজে৷…প্রকৃতি নারীর নিয়তি নির্দিষ্ট ক’রে দিয়েছে রূপ, মোহনীয়তা, ও মাধুর্যের মধ্য দিয়ে। আইন ও প্রথার নারীকে তার অনেক প্রাপ্য দেয়ার আছে, তবে নারীর নিশ্চিত মৰ্যাদা হচ্ছে : যৌবনে পূজিত প্রিয়তমা আর বাৰ্ধক্যে প্ৰিয় পত্নী।
ফ্ৰয়েড ছিলেন রক্ষণশীল, আদর্শ ভিক্টোরীয়; তিনি সর্বত্ৰ কাম দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু নিজে কামপরায়ণ ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনেকটা আইবুড়ো আচারনিষ্ঠ নারীর মতো যে চারদিকে দেখতে পায় শুধু কাম। যে-মার্থকে বিয়ের আগে ন-শো চিঠি লিখেছিলেন তিনি, বিয়ের পর তাকে আর চিঠি লিখেন নি; বিয়ের পর তাকে ফ্রয়েড দায়িত্ব দেন পত্মীর, যে তার সংসার দেখে আর দেয় ছটি সন্তান। তার সংসারকে মার্থা স্বর্গে পরিণত করতে পারে নি, অবধারিতভাবে সেটি হয়ে ওঠে একটি পিতৃতান্ত্রিক ইহুদি সংসার, যেখানে স্ত্রীর কাজ স্বামীসেবা প্রসব ও লালনপালন।
ফ্রয়েডের নারীতত্ত্বে প্রতিটি নারীর জীবনী হচ্ছে শিশ্নাসূয়ার ইতিহাস। প্রতিটি নারী ধারাবাহিক শিশ্নাসূয়া [পেনিস এনভি]। লিঙ্গপুজোর ইতিহাসে ফ্রয়েড অতুলনীয়; তাঁর তত্ত্বে শিশ্ন বা (পুং)লিঙ্গই বিধাতা; লিঙ্গের এমন বৈজ্ঞানিক উত্থান কখনো ঘটে নি। লিঙ্গপুজোয় অদ্বিতীয় হিন্দুরা; ফ্রয়েড তাদেরও ওপরে। শিবলিঙ্গপুজোর একটি মন্ত্র আছে : ‘পবিত্র শিব, স্বগীয লিঙ্গধারী, স্বর্গীয় মূল, স্বর্গীয় শিশ্ন, প্ৰভু লিঙ্গ, তোমার জ্যোতির্ময় লিঙ্গ এতো বিশাল যে ব্ৰহ্মা আর বিষ্ণুও তা পরিমাপ করতে পারে না’ [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৩৬)]। প্রাচীন কালে দেবীদের উৎখাত ক’রে দেবতাদের প্রতিষ্ঠার পর (পুং)লিঙ্গের যে-উত্থান ঘটে, তা চরম পরিণতি পায় ফ্রয়েডের তত্ত্বে। ফ্রয়েডের তত্ত্বে নারীর ব্যক্তিত্বের মূলে রয়েছে তার শাশ্বত শিশ্নাসূয়া; নারীর জীবন কাটে পুরুষের লিঙ্গটিকে অবিরাম ঈর্ষা করে। নারী পুরুষের প্রচণ্ড লিঙ্গের ঈর্ষায় পোড়ায় নিজের সমগ্র অস্তিত্ব। নারী সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের পরিণত রূপ উপস্থাপিত হয়েছে ‘নারীমনস্তত্ত্ব’ বা ‘নারীত্ব’ (১৯৩৩) নামক বক্তৃতায়। ফ্রয়েড নারীকে স্বায়ত্তশাসিত মানুষ রূপে না দেখে দেখেছেন পুরুষের ঋণাত্মক প্রাণী রূপে; নারী এমন মানুষ, যে পুরুষ নয়; নারী এমন মানুষ বা পুরুষ, যার কিছু একটা হারিয়ে গেছে। নারী হারিয়ে ফেলেছে তার শিশ্ন; নারী হচ্ছে শিশ্নহীনতা। ফ্রয়েডের মতে নারী যখন আবিষ্কার করে তার লিঙ্গ, দেখতে পায় তার শিশ্ন নেই, তখন সে মুখোমুখি হয় ভয়াবহ বিপর্যয়ের, যা নিয়ন্ত্রণ করে তার ব্যক্তিত্ব ও সারা জীবনকে। ফ্রয়েডের নারীমনস্তত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে একটি বিপন্নকর অভিজ্ঞতার ওপর যে তার রয়েছে শিশ্নের বদলে একটি যোনি। নারী তার রন্ধটিকে কী চোখে দেখে? ফ্রয়েড বলেন, বালিকা নিজের যোনিটি দেখেই মনে করে বা বুঝে ফেলে যে ওখানে একটি শিশ্ন থাকার কথা ছিলো; কিন্তু সেটি কেটে ফেলা হয়েছে, তাকে খোজা ক’রে ফেলা হয়েছে। নারী হচ্ছে খোজা পুরুষ, যে নিজের খোজাত্বের যন্ত্রণায় আমরণ ঈর্ষা ক’রে চলে পুরুষের অনন্য অসাধারণ অঙ্গটিকে।
ফ্রয়েড পুরুষনারীর কামবিকাশকে ভাগ করেছেন কয়েকটি স্তরে। শিশুর প্রথম বছরটি তার মনোকামিক বিকাশের মৌখিক স্তর, এ-সময় মুখই তার কাম-এলাকা। দ্বিতীয় বছরে শিশু উত্তীর্ণ হয় পায়ুস্তর-এ, পায়ুতে বোধ করে কামসুখ। তৃতীয়-চতুর্থ বছরে শিশু পৌঁছে লিঙ্গস্তর-এ, ছেলেরা শিশ্নে আর মেয়েরা ভগাঙ্কুরে বোধ করে কামসুখ। ছ-বছরের দিকে শিশুর কামবোধ কিছুটা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন চলে তার সুপ্তিস্তর। এরপর কৈশোর আসে তার জননেন্দ্ৰিয় স্তর, যখন আবার জাগে তার কাম। এ-সময়ে সে আকর্ষণ বোধ করে অন্য লিঙ্গের প্রতি; এবং সম্পন্ন হয় তার মনোকামিক বিকাশ। তবে ফ্রয়েডে ছেলে ও মেয়ের মনোকামিক বিকাশ অভিন্ন নয়; লিঙ্গস্তরে এসে তাদের মধ্যে ঘটে ভয়ঙ্কর ভিন্নতা। এ-স্তর থেকেই ফ্রয়েড ছেলেকে পুরুষ আর মেয়েকে বিকলাঙ্গ নারী ভাবতে শুরু করেন; এ-স্তরেই ঠিক হয়ে যায় যে ছেলে হবে পুরুষ আর মেয়ে হবে শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারী। ফ্রয়েড জানিয়েছেন শিশুরা এ-স্তরেই আবিষ্কার করে তাদের লিঙ্গ, লিপ্ত হয় হস্তমৈথুনে; ছেলেরা শিশ্নের, মেয়ের ভগাঙ্কুরের সাহায্যে। ফ্রয়েড ছেলের শিশ্ন ও মেয়ের ভগাঙ্কুরের মধ্যে দেখেছেন মহত্ত্ব ও নিকৃষ্টতা; তিনি শিশ্নকে বলেছেন ‘ছেলের বহুগুণে উৎকৃষ্ট হাতিয়ার’, ভগাঙ্কুরকে বলেছেন ‘তার নিকৃষ্ট ভগাঙ্গুর’, ‘জননেন্দ্রিয়গত ত্রুটি’, ‘আদি যৌন নিকৃষ্টতা’। ফ্রয়েডের মতে লিঙ্গস্তরে প্রতিটি মেয়ের নিয়তি হচ্ছে একটি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের’ মুখোমুখি হওয়া; সে আবিষ্কার করে যে ছেলেদের রয়েছে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য বৃহৎ শিশ্ন, এবং সাথেসাথে বুঝে ফেলে যে ওটা তার নিজের তুচ্ছ ভগাঙ্কুরের থেকে কতো উৎকৃষ্ট! এ-মহৎ আবিষ্কারের পর তার আর কোনো ক্ষমা নেই; ফ্রয়েড বলেন, ‘সে-মুহূর্ত থেকেই চিরকালের জন্যে সে আক্রান্ত হয় শিশ্নাসূয়ায়’! বালিকা মনে করে তার শিশ্নটি কেটে ফেলে খোজা ক’রে ফেলা হয়েছে তাকে, সে বইছে একটি ঘা; আর ওই ঘা’টি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক। এর ফলে জন্মে তার চিরজীবী হীনমন্যতাবোধ–হীনমন্যতা গূঢ়ৈষ্যা। ফ্রয়েডের বর্ণনা ও সিদ্ধান্ত খুবই মন্ময়, যা যুক্তিতে টেকে না। ছেলেমেয়েরা শিশুকালে পরস্পরের লিঙ্গ দেখে, তবে বালিকার পক্ষে বালকের শিশ্ন দেখা কেনো হবে এতো গুরুত্বপূর্ণ? কেনো বালিকা বালকের ‘বৃহৎ’ শিশ্নটিকে মনে করবে উৎকৃষ্ট? বড়ো হ’লেই হয় উৎকৃষ্ট? তার কাছে বালকের ঝুলন্ত মাংসাটুকরে মনে হ’তে পারে হাস্যকর, নিজের প্রত্যঙ্গটিকে স্বাভাবিক। বালিকা কেনো নিজের প্রত্যঙ্গটি দেখেই মনে ক’রে ফেলবে ওটি বিকল, বালকেরটিকে মনে করবে উৎকৃষ্ট, এবং সাথেসাথে আক্রান্ত হবে চিরশিশ্নাসূয়ায়? বালিকাদের অভিজ্ঞতা জানায় যে ফ্রয়েডীয় ওই সব অনুমান সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তারা বালকদের শিশ্ন দেখে ঈৰ্ষায় কাতর হয়ে ওঠে না।
