হোরনি ছেড়ে দিয়েছিলেন ফ্রয়েডের লিবিডোতত্ত্ব; মানুষকে আদিম প্রবৃত্তির সংঘাতে জর্জরিত জীবরূপে দেখার বদলে তিনি দেখেছিলেন অশেষ সম্ভাবনাময়রপে। অ্যাডলার বেরিয়ে এসেছিলেন ফ্রয়োডীয় বৃত্ত থেকে; দাবি করেছিলেন যে মানুষ জৈবিক প্রবৃত্তির ক্রীড়নক নয়; কাম প্রধান নিয়ন্ত্রক নয় মানুষের। মানুষ খেলার পুতুল নয় অবচেতন শক্তিরাশির। অবচেতনার থেকে চেতনার মূল্য ছিলো তার কাছে বেশি; কিন্তু বিশশতকের মানুষ বিজ্ঞানের বিস্ময়ের মধ্যে বাস করেও নিজেদের দেখতে পছন্দ করেছে আদিম প্রবৃত্তি ও কামের ক্রীড়নকারূপে। ফ্ৰয়েডের লিবিডো, অবচেতনা, প্রবৃত্তি সবই খুব সন্দেহজনক ব্যাপার। ফ্রয়েড আধুনিক কালে জন্ম দিয়েছিলেন পালেপালে আদিম মানুষ। ফ্রয়েড বিশ্বাসী ছিলেন অতীতে, অ্যাডলার ভবিষ্যতে; ফ্রয়েড মনে করতেন মানুষের প্রত্যাশা করার কিছু নেই, অ্যাডলার বিশ্বাস করতেন প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাই মানুষ। ফ্রয়েড যে-অন্ধকারকে মানুষ নামে উপস্থিত করেছিলেন, তার হাতছানি ছিলো তীব্র; তাতে বিজ্ঞান, আদিমতা, কবিতা, কল্পনা, পুরাণ, কুসংস্কার ছিলো প্রচুর, তাই তাতে সাড়া দিয়েছে মানুষ। ফ্রয়েড বিশশতকের এক বড়ো স্থপতি, এবং পিতৃতন্ত্র, কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতারও এক বড়ো মহাপুরুষ।
ফ্রয়েডের কুসংস্কার ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মর্মস্পশী রূপ ধরা পড়ে তাঁর নারীধারণায় ও নারীবিশ্লেষণে; তাই নারীবাদীরাই প্রথম প্রবলভাবে আক্রমণ করেন তাকে। নারীবাদীদের বহুমুখি তীব্র যৌক্তিক আক্রমণে তার জ্যোতিশ্চিক্রটি এখন ম্লান। দ্য বোভোয়ার (১৯৪৯, ৬৯-৮৩) ফ্রয়েডকে অনেকটা মেনে নিয়ে অনেকখানি প্রতিবাদ করেছিলেন চার দশক আগে, তাঁর অনেক কিছু বাতিল ক’রে দিয়েছিলেন বিনয়ের সাথে; তবে নবনারীবাদীরা তার মতো বিনয়ী নন : ফ্রাইডান (১৯৬৩, ৯১-১১১) ফ্রয়েডের প্রতিক্রিয়াশীল কুসংস্কারের রূপটি তুলে ধ’রে দেখান তাঁর ভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা; আর মিলেট (১৯৬৯, ১৭৬-২২০) প্রচণ্ড আক্রমণ চালান ফ্রয়েড ও উত্তর-ফ্রয়েডীয়দের বিরুদ্ধে। তিনি কোনো কিছুই বিনাপ্রশ্নে মেনে নিতে রাজি নন; এবং বিজ্ঞানের নামে প্রচলিত সমস্ত কুসংস্কারকে ছিন্নভিন্ন করতে দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ। প্রধানত মিলেটের মূর্তিভাঙা আক্রমণের ফলেই ফ্রয়েড নারীবাদীদের, এবং অন্যদের কাছেও, হয়ে ওঠেন এক প্রতিক্রিয়াশীল অবৈজ্ঞানিক নাম। মিলেটের আক্রমণ তুলনাহীন ভাষায় ও যুক্তিতে। পরে নারীবাদীদেরই কেউকেউ, যেমন মিশেল (১৯৭৪), কিছুটা ভুল ধরার চেষ্টা করেন মিলেটের; অভিযোগ করেন যে মিলেট কোনো কোনো স্থলে বিশ্বস্তভাবে ফ্রয়েডকে উপস্থাপিত করেন নি। এসব সত্ত্বেও মিলেটের আক্রমণ যথাৰ্থ: ফ্রয়েড যেখানে উদঘাটন করেছেন মানুষ ও নারীর জৈবিক-মানসিক সূত্র, মিলেট সেখানে উদঘাটন করেছেন ফ্রয়েডের সীমাবদ্ধতার সামাজিক-সাংস্কৃতিক সূত্র; এবং দেখিয়েছেন পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব ও ভিক্টোরীয় রক্ষশীলতাই ফ্ৰয়েডকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে নারীত্ব সম্পর্কে ফ্ৰয়েডীয় সূত্ররাশি। ১৯৩০-১৯৬০ সময়টিতে পশ্চিমে ঘটেছিলো রক্ষণশীলতার প্ৰত্যাবর্তন; নানা ধরনের রক্ষণশীলতার মধ্যে একটি ছিলো নারীকে আবার নারী ক’রে তোলা, নারীকে আবার চিরন্তনী ক’রে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া। এ-সময় পিতৃতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বন্যা ধর্ম থেকে আসে নি, এসেছিলো পশ্চিমের ঝকঝকে শাস্ত্রগুলো থেকে : সাহিত্য থেকে, এবং বিজ্ঞান থেকে, বিশেষ ক’রে মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব থেকে। বিজ্ঞানের মলাটের ভেতরে এ-সময়ের মহাপুরুষেরা পরিবেশন করেন পুরোনো পৃথক এলাকা ও ভূমিকাতত্ত্ব। মিলেটের (১৯৬৯, ১৭৮) মতে এঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিগমুন্ড ফ্রয়েড, যিনি ছিলেন ওই সময়ের ‘লৈঙ্গিক রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিমান একক প্রতিবিপ্লবী শক্তি’। নারীসম্পর্কে যতো কুসংস্কার তৈরি করা হয়েছিলো গত কয়েক সহস্ৰকে, নারীবাদীদের প্রতিবাদে যা হ’টে গিয়েছিলো অনেকখানি, তার সবই এ-সময়ে ফিরে এসেছিলো ফ্রয়েডীয় ছদ্মবেশে। ফ্রয়েডের জনপ্রিয় বাজারি ভাষ্যকারেরা তা ছড়িয়ে দিয়েছিলো দিকে দিকে। এতোদিন যে-নারী ছিলো ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে বিকলাঙ্গ আর অধম, ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানে সে হয়ে ওঠে বৈজ্ঞানিকভাবে বিকলাঙ্গ ও বিকৃত; ফ্ৰয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের কুসংস্কার নারীকে যতোটা শোচনীয় জীবে পরিণত করে, তা করে নি কোনো ধর্মগ্রন্থও। ফ্রয়েড যদিও মেরি বোনাপার্তের কাছে স্বীকার করেছিলেন [দ্র ফ্রাইডান (১৯৬৩, ১০১), মিলেট (১৯৬৯, ১৭৮)] : ‘যে-বিশাল প্রশ্নটির উত্তর কখনো দেয়া হয় নি এবং তিরিশ বছর ধরে নারী-আত্মা সম্পর্কে গবেষণা ক’রে যার উত্তর আমিও দিতে পারি নি, তা হচ্ছে নারী কী চায়?”, তবু নারীমনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তৈরি করেছিলেন তিনি এক ‘বৈজ্ঞানিক’ তত্ত্ব, যার ভিত্তি তাঁর এক ধ্রুববিশ্বাস যে ‘দেহই নিয়তি : অ্যানাটমি ইজ ডেসটিনি’। ফ্রয়েডের নারী নিজের বিকলাঙ্গ শরীরের শিকার।
ফ্ৰয়েড ছিলেন নিপুণ পর্যবেক্ষক; তবে রোগিনীদের সমস্যা বর্ণনা ও ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন ইহুদি পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির বন্দী। তিনি জন্মেছিলেন মধ্য ইউরোপের প্রবল পিতৃতান্ত্রিক ইহুদি পরিবারে; বেড়েছিলেন ওই সমাজে যেখানে নারীপুরুষের এলাকা ও ভূমিকা ছিলো সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন। সেখানে পুরুষেরা প্রতিদিন প্রার্থনায় বিধাতাকে ধন্যবাদ জানাতো : ‘তোমাকে ধন্যবাদ, প্ৰভু, তুমি আমাকে নারী করে সৃষ্টি করো নি ব’লে’; আর নারীরা বিধাতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলতো : ‘তোমাকে ধন্যবাদ, প্ৰভু, আমাকে তুমি তোমার অভিলাষ অনুসারে সুষ্টি করেছে বলে।’ তাদের পরিবারে বাবা ছিলো জিহোভার সমান প্রতাপশালী, মা পতঙ্গের মতো অসহায়। পুরুষাধিপত্য ও নারী-অধীনতা ছিলো ওই পরিবারে ও সমাজে প্রকৃতির শাশ্বত বিধান। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন পুরুষাধিপত্যবাদীরূপে, নারীমুক্তি ছিলো তার কাছে উদ্ভট ব্যাপার। মিলের নারী-অধীনতা (১৮৬৯) পড়ে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তিনি; নারী পুরুষের মতো বাইরে বেরিয়ে জীবিকা অর্জন করবে। এটা ভাবতে গিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছেন তিনি, এবং উদ্বিগ্ন বোধ করেছেন যে এতে নষ্ট হয়ে যাবে নারীর নারীত্ব ও রমণীয়তা। তিনি নিজের পরিবারে ছেলেবেলা থেকে পুরুষকে দেখেছেন প্রবল, নারীকে অসহায়, পর্যুদস্ত, দুর্বল; এবং এটা তার কাছে মনে হয়েছে স্বাভাবিক। নারীর যে-স্বভাব ও অবস্থা তিনি দেখেছেন, তা যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপের ফল হতে পারে, এমন বোধ তাঁর মনে জাগে নি কখনো; বরং একে তিনি ভেবেছেন প্রাকৃতিক ও জৈবিক। বিয়ের আগে ফ্রয়েড তাঁর ভাবী স্ত্রী মাৰ্থ বারনেইসকে লিখেছিলেন ন-শোর মতো চিঠি : ওই চিঠিগুলোতে পাওয়া যায় এক পিতৃতান্ত্রিক, পুরুষাধিপত্যবাদী ফ্ৰয়েডকে, যিনি ভাবী স্ত্রীকে করেন ‘আমার মিষ্টি মেয়ে’, ‘প্ৰিয় ছোট্ট নারী’, ‘রাজকন্যা, আমার ছোট্ট রাজকন্যা’র মতো সম্বোধন। ওই তরুণীকে তিনি মনে করেছেন বালিকা; বিয়ের পর তাকে মনে করেছেন বালিকাবধু, যার কোনো বিকাশ ঘটা অসম্ভব। একটি চিঠিতে লিখেছেন [দ্র ফ্রাইডান (১৯৬৩, ৯৭-৯৮)] : ‘আমি জানি তুমি কতো মিষ্টি, কীভাবে তুমি গৃহকে পরিণত করতে পারো স্বর্গে…যতোটা চাও আমি তোমাকে শাসন করতে দেবো আমাদের গৃহ, আর তুমি আমাকে পুরস্কৃত করবে তোমার মধুর প্রেমে’; আরেক চিঠিতে (৫ ১১ ১৮৮৩) স্টুয়ার্ট মিলের নারীমুক্তির প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি লেখেন :
