[ঙ] স্বামীর সহিত সদ্ভাব না থাকিলে, স্বামী অত্যাচার-পরায়ণ নিষ্ঠুর নির্দয় হইলে, স্ত্রী পৃথক হইবে? ওমা, একি অসম্ভব কথা … যে দেশে নারীর স্থান বুট, সোবতোলা, পাম্পসু, প্রভৃতি দামী জুতার নীচে নয,–একেবারে সব চেয়ে অধম চটিজুতাব নীচে বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, যে সমাজে নারীর জন্মগ্রহণ মহা অপরাধ–বাঁচিযা থাকার ত কথাই নাই; সে দেশের সে সমাজের কোনও নারী যদি অত্যাচারী স্বামীব উৎপীড়নের হাত এড়াইয়া স্বচ্ছন্দ শান্তিতে সৎভাবে জীবনটা কাটাইবার জন্য, সাহস করিয়া পৃথক হইয়া যায়, তবে সে দুঃসাহসের দণ্ডের পরিমাণ কতখানি?
আক্রমণ, শ্লেষ, বিদ্রুপ, বৰ্ণনার মধ্য দিয়ে পুরুষের পাশবিকতা ও নারীর শোচনীয় শৈলবালা তুলে ধরেছেন সমগ্ৰ পীড়িত নারীর যন্ত্রণার রূপ। পুরুষ তাঁর চোখে নৃশংস দানবী। লৈঙ্গিক রাজনীতির চরম রূপটি চিত্রিত করেছেন শৈলবালা; দেখিয়েছেন। পুরুষের স্বৈরাচারের ফলে নারীর অবস্থা শোচনীয় হ’তে পারে কতোখানি। তিনি দেখিয়েছেন নারী-পুরুষ, স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে রয়েছে এক অনাদি বিরোধ, যার শিকার নারী। নারী এ-বিরোধ সৃষ্টি করে নি, পুরুষই নিজের স্বেচ্ছাচারিতায় নারীকে শত্ৰু ক’রে তুলেছে; পুরুষপ্ৰজাতির সাথে নারীর জীবনযাপন এক অসম্ভব পীড়াদায়ক ব্যাপার। স্বামী কি নারীর সুখ? শৈলবালা লিখেছেন, ‘স্বামীর দিকে চাহিয়া হঠাৎ অপেরার মনে হইল, ইনিই যত অনিষ্টের মূল।’ এক অপেরার অনুভবের মধ্য দিয়ে তিনি নির্দেশ করেছেন সমস্ত নারীর জীবনের অনিষ্টের মূলটি। অপেরা পীড়নের প্রতিবাদও করতে পারে না, পীড়নে পীড়নে সে শিশুর মতো অসহায় হয়ে ওঠে : ‘অভিমানী শিশু যেমন তুচ্ছ ছুতা অবলম্বন করিয়া সৰ্ব্বদাই কান্দিবার জন্য ব্যাকুল হয়-অপেরার বুকের ভিতর তেমনই একটা অর্থহীন ব্যাকুলতার আবেগ ঠেলিয়া উঠিল। পিতৃতন্ত্র নারীকে শিশুই মনে করে, যে-নারী শিশু হ’তে চায় না। তাকে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পরিণত করে অবোধ অসহায় শিশুতে।
শৈলবালা শুধু অপেরার স্বামীকে নয়, প্রায় সব পুরুষই দেখেছেন অমানুষরূপে; এক চিকিৎসকের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : ‘তাহার উপর তিনি নিষ্ঠাবান জ্ঞানাভিমানী পুরুষ, পৃথিবীতে মেয়েমানুষদের বাঁচিয়া থাকাটা অত্যন্ত ঘৃণা ও লজ্জার বিষয় বলিয়া তাহার জ্ঞানচক্ষুতে প্রতিভাত হইত। পুরুষ এতো অমানুষ যে স্ত্রীকে খুন করার পর তার স্বামী বক্তৃতা দেয় : ‘ আজ কলকার মেয়েরা যে ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম ভুলিয়া, হিন্দু স্ত্রীর কৰ্ত্তবা ভুলিয়া, ঘোরতর অহিন্দু আচার অবলম্বন করিয়া, অসদুপায়ে বিষ খাইয়া, গলায় দড়ি দিয়া, জলে ডুবিয়া ও কেরোসিন তৈলে পুড়িয়া মরিতেছে, তৎসম্বন্ধে উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষায় বিস্তর নিন্দাবাদ করিতেছেন!’ নারী কী কী উপায়ে পুরুষের হাত থেকে নিজেকে উদ্ধার করছে, তার তালিকাটি তিনি উপস্থিত করেছেন। এখানে। পুরুষের কবল থেকে নারীর নিজেকে উদ্ধাবের উপায় আত্মহত্যা; অপেরা জানে, ‘এই চির পরাধীন জীবনের অবস্থা!— এদের স্বচ্ছন্দভাবে নিঃশ্বাস ফেলবার অধিকার পর্য্যন্ত নেই. এরা জন্মেছে শুধু সংসারের সকলের অসন্তোষ বিরক্তির জুলায় উৎপীড়িত হয়ে,–আত্মাগ্লানির ধিক্কারে আত্মহত্যা করতো!’ অপেরা বলেছে, ‘আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে আমায় যথার্থ ভালবাসে, সে যেন আমার মৃত্যুর প্রার্থনাই করে! জন্ম-অপরাধী অপেরার। এ-প্রার্থনা যে পূর্ণ হবে, তাতে সন্দেহের কারণ নেই; উপন্যাসের শেষে সে ঢ’লে পড়ে অপমৃত্যুর কোলে। মৃত্যুই তার মুক্তি, মৃত্যুই তার চরম বিদ্রোহ : ‘অপেরা নিরুত্তর!:–আজি সে তাহার (স্বামীর) শাসন বাধ্যতার আইনের কবল চিরদিনের মত এড়াইয়া নিৰ্ভয়ে অবাধ্য হইয়া দাড়াইযাছে! আজি সে আর উত্তর দিবে না!’ জীবন অপেরাকে যে-অধিকার দেয় নি, মৃত্যু দিয়েছে তাকে সে-অধিকার : পুরুষের অবাধ্য হওয়ার স্বাধীনতা। শৈলবালা এঁকেছেন পুরুষের নারীপীড়নের রূপটি, অপেরাকে ক’রে তুলেছেন সমস্ত নিপীড়িত বাঙালি নারীর আদিরূপ। নারী কোনো অপরাধ না ক’রেও যে পুরুষতন্ত্রের কাছে অপরাধী, জন্মদণ্ডিত, এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের আয়োজন না করেও শুধু একটি নারীর শোচনীয় জীবন চিত্ৰিত ক’রে শৈলবালা জানিয়েছেন প্রবল প্রতিবাদ; এবং রচিত হয়েছে একটি অসাধারণ নারীবাদী উপন্যাস।
অনুরূপা দেবী হিন্দু বিধানে দীক্ষিত প্রথাগত ঔপন্যাসিক; মন্ত্রশক্তি (১৯১৫) লিখেছেন তিনি বেদমন্ত্রের মহাশক্তি প্রমাণের জন্যে; কিন্তু তার উপন্যাসেও নারীপুরুষের বিরোধ স্পষ্ট। তিনি তাঁর নায়িকা বাণীকে শেষে পুরুষের পায়েই সঁপে দিয়েছেন, তবে ঐকেছেন নারীপুরুষের দীর্ঘ লৈঙ্গিক রাজনীতি বা বিরোধের চিত্র। তাঁর মন্ত্রশক্তিও নারীকেন্দ্ৰিক: তার নায়িকা রাধারাণী বা বাণীর বিয়ে ও স্বামীর সাথে অপসম্পর্ক এর বিষয়। রাজনগরের জমিদার হরিবল্লাভের বংশে এক বড়ো সমস্যা দেখা দেয় পুত্ৰ রমাবল্লাভের ঘরে কোনো সন্তান জন্ম না নেয়ায়। তবে হরিবল্লভ বাবু সুদীর্ঘ জীবনের মধ্যে পৌত্ৰমুখ সন্দর্শনের আশায় হতাশপ্ৰায় হইয়া তাহার বিপুল ধনৈশ্বৰ্য্য পরমার্থে উৎসর্গের কল্পনা করিয়া এই মন্দির নিৰ্ম্মাণে মনোযোগী হইয়াছেন, এমন সময় পুত্রবধু কৃষ্ণপ্ৰিয়া একটি পুষ্পকোরকতুল্য সন্তান প্রসব করিলেন। শিশুটি পুত্ৰ সন্তান নহে, কন্যা সন্তান। তথাপি এই ‘হাপুত্রে’র ঘরে তাহার আদরের সীমা রহিল না।’ একটি পুত্র জন্ম নিলে যা হতো স্বর্গীয় আনন্দ, কন্যার জন্মের ফলে তা হয়ে ওঠে। মহাসংকট। অনুরূপা জানিয়েছেন, এবং বিবরণও দিয়েছেন যে মেয়েটিকে হরিবল্লভ থেকে রমাবল্লভ অসীম আদর করে, কিন্তু মেয়েটির জীবনে ওই আদর নিরর্থক! হরিবল্লভ আদর করেও বাণীর জীবনকে ধ্বংস ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি। রমাবল্লভ সন্তানের-পুত্রের-আশায় আরেকটি, বা অনেক বিয়ে করতে পারতো, তবে ‘পিতার বিরাগভাজন হইয়াও কেবল এই হতভাগিনীর মুখ চাহিয়াই গৃহে পুনৰ্ব্বার সৌভাগ্যবতী নববধূ আনয়ন করেন নাই।’ এই শুধু কারণ নয়; অনুরূপা আরেকটি নবী বধু আনতে দেন নি, কেননা তিনি এ-হতভাগিনী’র থেকে অনেক বেশি হতভাগিনী’ আরেকজনের কাহিনী বলতে চেয়েছেন। অনুরূপা প্রথাগত বিধানের প্রতিপক্ষ নন; তিনি জানেন পতিব্ৰতা হিন্দুরমণী নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে বড় করিয়া দেখিতে জানেন না।’ রামাবল্লাভের স্ত্রী অনেক অনুনয় অনুরোপেও স্বামীকে পুনৰ্ব্বিবাহে সম্মত করাইতে পারেন নাই।’ পুরুষকে একটু দেবতা করেই এগিয়েছেন অনুরূপা।
