বিয়ে মায়ের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি না করলেও কন্যার জীবনকে নষ্ট ক’রে দেয়। সমস্যা যোগ্য পাত্রের অভাব; ন-বছর বয়স থেকেই বাণীকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়, কিন্তু তেরো বছর বয়সেও তা সম্ভব হয় নি। পিতৃতন্ত্র নারীর বিয়ের আবশ্যিক বিধান দিয়েছে, এবং পিতৃতন্ত্রের এক বড়ো পুরোহিত হরিবল্লভ স্নেহ করা সত্ত্বেও পিতৃতন্ত্রের স্বার্থে পৌত্রীর জীবন নষ্ট ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি। পিতৃতন্ত্র হরিবল্লাভের হাতে লিখিয়ে নেয়। নারীপীড়নের একটি উইল : ‘যদি পঞ্চদশ বৎসর বয়সের মধ্যে তাহার পৌত্রী রাধারানী কোন সমশ্রেণীর সমান ঘরে কুলীন সন্তানের সহিত বিবাহিতা হয়, তবেই সে অথবা তাহার সন্তান সন্ততিগণ দেবসেবা ব্যতিরেকে আয়ের সমুদয় উপস্বত্ব পুরুষানুক্ৰমে ভোগদখল করিতে পরিবে। কিন্তু যদি তাহা না হয়–অর্থাৎ অসমান ঘরে বিবাহ হয় অথবা উক্ত সময়মধ্যে বিবাহ না হয়, তাহা হইলে রাধারানীর পঞ্চদশ বৎসব পূর্ণ হওয়ার পর দিবস প্রাতঃকালেই তাঁহার সুদূর কটুম্বপুত্ৰ মৃগাঙ্কমোহন সম্পূর্ণ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হইবেন। রামাবল্লভ যাবজীবন সহস্র মুদ্রা মাসহারা পাইবেন। মাত্র, এই পৈতৃক গৃহে সেইদিন হইতে তাহার কোনই অধিকার থাকিবে না।’ এমন একটি নিষ্ঠুর উইল করতে তার হাত কাপে নি, অথচ সে খুব ভালোবাসতো তার নাতনীকে; বাণী যদি নাতী হতো, হতো পাষণ্ড, তাহলেও সে এমন উইল করতে পারতে না। বোঝা যাচ্ছে কোনো মেয়েকে স্নেহ করা আসলে তাকে উপহাস করা। নাতনীর কোনো মূল্য নেই, স্নেহেরও মূল্য নেই; মূল্যবান হচ্ছে পিতৃতন্ত্রের বিধান। জমিদার তার প্ৰিয় নাতনীকে বনবাসে পাঠিয়ে নিদ্বিধায় সম্পত্তি উইল ক’রে গেছে এক কুটুমপুত্রের নামে, যাকে সে কখনো আদর করে নি, কাছেও পায় নি, এমনকি পছন্দও করে না। তাই দেখতে পাই পিতৃতন্ত্রের পুরোহিতদের কাছে স্নেহের পাত্রীর থেকে অনেক প্রিয় হচ্ছে পুত্র, তা তার নিজের হোক বা যারই হোক। বাণীর জীবনেকে পিতৃতন্ত্রের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সে পরলোক চ’লে যায়। অল্প বয়সে বিয়ে না হওয়ায় বাণী অবশ্য এমন কিছু সুখ ভোগ করেছে, যার সুযোগ হিন্দু মেয়েরা পায় না : ‘কুমারী জীবনের যে সুখাস্বাদে হিন্দু বালিকারা চিরবঞ্চিতা, সেই অনুপমেয় শান্তির আস্বাদ গ্ৰহণে সে নিজেকে চরিতার্থ মনে করিতেছিল।’
ধনী পরিবারে মেয়েদের স্বামীর বিকল্প হয়ে ওঠে কোনো দেবতা: রাধারণীর বিকল্প স্বামী হয় কৃষ্ণ, যার পুজোয় সে নিজেকে সমর্পণ করে। অনেক উপাখ্যানে দেখা যায় যে অবিবাহিত বালিকাবা মেতে উঠেছে পুজোয়, বিশেষ ক’রে কৃষ্ণের পুজোয়। অবিবাহিত বালিকাদের মন্দির নিয়ে মেতে ওঠাব, বিশেষ ক’রে কৃষ্ণের পুজোয় নিজেদের বিলিয়ে দেয়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গোপন তাৎপর্য: কৃষ্ণ চরিতার্থ করে তাদের কাম; কৃষ্ণপ্রেমের ভেতর দিয়ে তারা জানায় তাদের পুরুষ ও স্বামীবিদ্বেষ। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন রাধারাণী বলে, ‘আমার কৃষ্ণ ত দিনরাত্তির আমার কাছেই রয়েছেন, … তোরা তোদের স্বামীকে কি এমন করে সাজাতে পারিস? না, এমন ভালই বাসতে পারিস? তারা পান থেকে চুণ খসলে ঝগড়া করে, দাসীর মত খাটিয়ে নিয়ে দুটো ভাল কথাও সকল সময় কয়ে উঠতে ফুরসৎ পায় না … আমি তাই স্বয়ম্বর হয়েছি। যেনো সব নারীর মতোই তার জানা আছে। পুরুষের পাশবিকতা, তাই পুরুষকে প্রত্যাখ্যান ক’রে গ্রহণ করে সে কৃষ্ণকে; বলে, ‘আমি যে প্রতিজ্ঞা করেছি, এ জন্মে বিবাহ করিব না। নারীর একমাত্র একান্ত সম্পদ তার দেহ, যার প্রতি পুরুষের একমাত্র মোহ। নারীর পুরুষবিরোধিতার একটি রূপ হচ্ছে সে তার দেহটিকে রক্ষা করতে চায় পুরুষের গ্রাস থেকে; সে বোধ করে তার দেহটি যদি পুরুষের কবলে পড়ে তখন তার আর নিজের বলে কিছু থাকে না। তার দেহ নষ্ট হয়, সেও নষ্ট হয়। নারী তখন হয়ে ওঠে কামবিরূপ, কামশীতল। এটাও নারীর এক বড়ো বিদ্রোহ। রাধারাণী জানে তার দেহটি তুলে দিতে হবে পুরুষের ক্ষুধার কাছে; তার পিতামহ যে-দলিল ক’রে যায়, তা হচ্ছে পুরুষকে দেহদানের অনিবাৰ্য নির্দেশ। তার জীবনের করুণ পরিহাস। ‘তাহার দেবোদ্দেশ্যে উৎসৰ্গিত মনঃপ্রাণ কোন এক ক্ষুদ্র মানব চরণে উৎসর্গ কৰিছে; হইবে। শ্ৰীকৃষ্ণ সমৰ্পিত এ জীবন যৌবন নরভোগ্য করিয়া। তবেই এ আশৈশবের আশ্রয় ক্রয় করা।’ কিন্তু তা সে চায় না, তার সাধ হয় : ‘এই ঐশ্বৰ্য সে জীর্ণ বস্ত্রখণ্ডের মত পরিত্যাগ করিবে সেও ভাল, তবু এ দেহ কাহাকেও দান করিতে পরিবে না।… কোথাকার কে একটা মানুষ! সে তাহার মালিক মোক্তার হইয়া বসিবো?’ অনুরূপা দেহের ওপর বেশ জোর দিয়েছেন, নারীদেহকে ‘নরভোগ্য’ হ’তে দেয়ার অর্থ ওই দেহকে দূষিত করা, এমন একটি মনোভাব তিনি জ্ঞাপন করেছেন।
বাণী বিয়ে করতে রাজি হয় এক শর্তে; যার সঙ্গে তার বিয়ে হবে, তার সঙ্গে সে একরােতও কাটাবে না। সে দেহ দিতে পারবে না। পুরুষকে, দাসীত্ব করতে পারবে না। পুরুষের; সে বলে, ‘এই জন্যই বিবাহে বিতৃষ্ণা হয়। সাধ করে কি বলি, বিবাহের নামই দাসীত্ব।’ তবে তার জীবনের ট্র্যাজেডি হচ্ছে নিজেকে সম্পদের মধ্যে রাখার জন্যে তাকে বিয়ে করতে হয় এমন একজনকে, যাকে সে একদিন বরখাস্ত করেছে। মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব থেকে। তার নাম অম্বরনাথ। অম্বরনাথের অবশ্য নায়কোচিত সব গুণ রয়েছে, যদিও সে দরিদ্র। বাণীর সংকট দুটি, সে পুরুষবিরূপ, এবং অম্বরনাথের ওপর বিরূপ; তবু ‘তাঁহারই মন্দিরের অযোগ্য পুরোহিত বলিয়া এই সে দিন মাত্র সে তাহাকে অক্ষমতার জন্য তিরস্কার করিয়া বিদায় দিয়াছে,-সেই ব্যক্তিরই পায়ে ধরিয়া তাহার পিতা তাহাকে দান করিবেন?–আর এই দেব-চরণে উৎসৰ্গিত শরীর,–তৎকর্তৃক লাঞ্ছিত সেই ভিখারীকেই সমৰ্পণ করিতে হইবে? বাণী ভাবিল, এ কথা শুনিবার পূৰ্ব্বে সে মরিয়া গেল না কেন?’ বাণী যে কামশীতল, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই; বাণী যে পুরুষকে দেহদানের কথা বার বার ভেবেছে, ঘেন্না বোধ করেছে দেহ দিতে. এটা তার পুরুষের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ। ‘সে বড় নিশ্চিন্ত ছিল যে, মানুষকে কোনমতেই সে বিবাহ করিবে না’, এবং সারা উপন্যাসে সে পুরুষকে তার দেহ দেয় নি। এক সময় ঔপন্যাসিক হস্তক্ষেপ করেন, তিনি যে-দিকে বাণীকে নিয়ে যেতে চান সে-দিকে যাওয়াব ব্যবস্থা করেন; মানুষ তাকে যাতে রাজি করাতে পারে নি, সেখানে প্রকৃতি হস্তক্ষেপ করে : ‘মহাপ্রকৃতি রাধা স্মিতমুখে তিরস্কার করিয়া কহিলেন, ‘পাপিষ্ঠী! প্রকৃতি স্বয়ং পুরুষের দাসী, তুই এমন কি যে, ঠাকুরালী হইয়া থাকিবি,–দাসী হাইবি না?’ অতিপ্রাকৃতের সহায়তায় অনুরূপা পিতৃতন্ত্রে দীক্ষিত করতে থাকেন বাণীকে। কিন্তু বাণী তার দেহ রক্ষা করতে চায় পুরুষের কামকলুষ থেকে; তখন অশ্রুপরিপুত নেত্ৰে যুক্তপাণি বাণী দেবতার উদ্দেশ্যে কহিল, তুমি কি শুনিতেছ, আমি অন্য কাহাকেও স্বামী বলিয়া স্বীকার করিতে পারিব না? তুমি যদি আমার পণ না রাখ, আমি নিজেই রাখিব। যদি বিবাহ করিতেই হয়, করিব। কিন্তু এ দেহ প্ৰাণ যখন তোমায় দিয়াছি, তখন এ কেবল তোমারি থাকিবে।’ শরীরই তার অমূল্য সম্পদ : ‘তাহার এ শরীরটাও সে অন্যের নিকট বেচিতে পরিবে না ?’ বাণী তার দেহশুচিতা রক্ষার যে-প্ৰয়াস চালিয়েছে, তা নারীর গভীর পুরুষবিরূপতার প্রকাশ। অনুরূপার বাণী নিজের দেহটিকে দূষিত করতে চায় না, কেননা দেহই তার পবিত্রতম সম্পদ; কিন্তু পুরুষতন্ত্র নির্দেশ দিয়েছে এটিকে দূষিত করতে হবে পুরুষ দিয়ে। তাই পুরুষ হয়ে উঠেছে। ঘৃণার পাত্র, কেননা কাজ দূষণ।
