শৈলবালা আক্রমণ করেছেন সমগ্ৰ পিতৃতন্ত্রকে, পিতৃতন্ত্রের শাস্ত্ৰকে, যা নারীকে শুধু পীড়নের বিধান দিয়েই পরিতৃপ্ত নয়, পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেও নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। বিধানে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অপেরার মনে জাগে প্রতিবাদ। তখন নিৰ্দয় শক্তিতে বজনিষ্পেষণে অপেরার হাত টিপিয়া ধরিয়া কঠোর ভূভঙ্গী করিয়া রূঢ় স্বরে তিনি (স্বামী) বলিলেন, ‘দেখ, মেয়েমানুষের অতটা তেজ ভাল নয়।’ তখন :
‘অপেরার গ্রহদেবতা বিরূপ–কোথা হইতে দুষ্ট সব স্বতী আসিয়া তাহার স্কন্ধে চাপিযা বসিলেন,–অপেরা ধৈৰ্য হারাইল –চির-অনাদৃতা চিব-অবজ্ঞাতা স্ত্রীলোকোব কতটা তেজ যে ভাল, অপেরা সে হিসাবে অঙ্কটা জানিয়া বুঝিযা, বিজ্ঞতা প্রকাশের অবসব লইল না,–এইবার অকুষ্ঠিত দৃষ্টি তুলিয়া বুলিল–‘তেজ! একেও তোমাবা তেজ বলবে? বেশ, তোমাদের বিচাবেই ভাল! কিন্তু রক্তে মাংসে গড়া মানুষ আমি, আমার মন পাথর দিয়ে গডা নয় সেটা মনে বেখো—’
অপেরা মুক্ত নারীর জীবন চায় নি, সে প্রথা মেনেই যাপন করতে চেয়েছে তার দণ্ডিত জীবন। সে বলেছে, ‘স্বামী তুমি তোমার স্থান আমার মাথার উপর, সে একবার নয় একশো বার আমি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করছি।’ তবে তারও যে সামান্য অধিকার আছে, তা সে জানাতে চেয়েছে; বলেছে স্ত্রী বলে আমারও কি-, কিন্তু বাক্য সে শেষ করতে পারে নি, জানাতে পারে নি তার কী আছে? এক সময় পীড়ন তার সহ্য হয়ে যায, আর অসহ্য হয়ে ওঠে। কৃত্রিম আদর : ‘লাথির উপর লাথি, জুতোর উপর জুতো, বঁটার উপর ঝাটা, যার জন্যে প্রেসূকৃপসন্য ঠিক হয়ে আছে, তাকে শান্ত সহিষ্ণুভাবে তার ন্যায্য প্রাপ্যটা গ্রহণ করিতে দাও–মাঝে মাঝে খেয়াল মত এমন যথেচ্ছ অনুগ্রহ দেখিয়ে কেন তার মাথা খারাপ করে স্পৰ্দ্ধা বাড়াও?’-এতে তোমার কোন গ্রানি বোধ না হতে পারে, কিন্তু দোহাই ধৰ্ম্ম সত্যি বলছি, ঝাটা লাথি সহ্য করবার জন্যে যার মন কঠিন ভাবে প্রস্তুত হয়েছে, এ আব্দর অনুগ্রহ তাঁর অসহ্য।’ নারী যেমন পীড়নের শিকার হয়। পুরুষের তেমনি হয় পুরুষের সোহাগেরও শিকার; প্ৰেমহীন সোহাগ তার জন্যে শোচনীয়তম অপমান। পুরুষ সোহাগ করে নিজেকেই পরিতৃপ্ত করার জন্যে, নিজেরই প্ৰভূত্বকে ভিন্নভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্যে: তাতে নারীর কোনো সুখ নেই। নারী কি কোনো তেজ দেখাতে পারে, তার কি সে-অধিকার আছে? নেই। বুকে যখন একটু প্ৰতিবাদের অগ্নিকণা জন্ম নেয়, তখন ‘অপেরার মনে হইল, সত্যই ত, মেয়েমানুষের এত তেজ, এ যে বাস্তবিকই একটা বিষম স্পৰ্দ্ধা!’ মেয়েমানুষ কী করবে? তার জন্যে রয়েছে আত্মদমন : ‘নিজের এই অস্বাভাবিক দুঃসাহসিকতার জন্য অপেরা মনে মনে ত্ৰাহি মধুসূদন জপিতে জপিতে আড়ষ্ট হইয়া পড়িয়া রহিল,… তাহার মন উষ্ণ উত্তেজনায় বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে,–সামান্য সংঘর্ষে এখনই হয়ত সে বজ্রপাত ঘটাইয়া বসিবে। প্ৰাণপণে আত্মদমন করিবার জন্য অপেরা আড়ষ্ট নিজীবের মত পড়িয়া রহিল।’ ক্রীতদাসী ক্ষুব্ধ হ’তে পারে, তবে ক্ষোভ বিপন্ন করে তার জীবন, তাই নিজের ক্ষোভকে দমন করাই তাঁর বেঁচে থাকার পদ্ধতি।
মেয়েমানুষের অবস্থান কোথায় শৈলবালা তা বারবার নির্দেশ করেছেন :
‘[ক] গোটা দুই ধমক ও একটা পদাঘাতে যাহাকে কাবু কবিয়া ফেলিতে পাবা যায়, সে কি আবার মানুষ। বিশেষতঃ মেয়ে মানুষ ত জন্তু জানোয়াবের সামিল নগণ্য জীব –তবে সভ্য জগতে ওঃ, সে আলাদা কথা –আর আমাদেব ঘরে এই সব ‘মাগী ছাগী’— উৎ ‘দের জীবন মূল্যহীন। উহাদেব ধমনীতে যে তরল পদার্থটা প্রবাহিত হয়, সে ত রক্ত নয়,–অসাব পদার্থ, লাল জল মাত্র।
[খ] স্ত্রীলোকের ভাগ্য নিশ্চল জড় পদাৰ্থ!.. পুরুষ মানুষেব চবিত্ৰ সহস্ৰ অসৎ কাযে, সহস্ৰ হীনতা, নীচতায়,–কখনও অপবিত্ৰ হইবার নয়, সোণ বা মাকড়ী বুঝি বাঁকা হইলে ক্ষতি আছে? কি স্পৰ্দ্ধা ধোঁ। আর স্ত্রী চৰিত্ৰঃ-শত্যযুগ হইতে প্রমাণ চলিয়া আসিতেছে,–দ্বিতীয় বাক্য নিম্প্রয়োজন! পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পৰ্যন্ত চবিত্রহীনতাব জন্য যত লক্ষ কোটি অপরাধ ঘটিয়াছে, সে শুধু স্ত্রীজাতির একান্ত নিজস্ব কলঙ্ক! সে কলঙ্কের সহিত পুরুষ জাতির কোন পুৰুষেও তিলাৰ্দ্ধ সংস্রব নাই। বেশী কথা কি, ঐ কঠোব অপরাধী জাতিটার চবিত্র এমনই অবিশ্বাস্য ও মান এতই দুবভিসন্ধিপূর্ণ যে, মৃত্যুব পরও উহাদের বিশ্বাস করা নিষেধ। দেহটা চিতার আগুনে ভস্মসাৎ হইয়া বাতাসে যখন ছাই উড়িয়া যাইবে, তখন নিৰ্ভয়!
[গ] যেহেতু বসুন্ধরাব সৰ্ব্বোত্তম জীব পুরুষ-মানুষবা স্বতঃসিদ্ধ অথবা সোজা ভাষায় যাহাকে স্বেচ্ছাচারী বলা যায়, তাহাই। সুতরাং ত্যাহারা ত কাহারও সুবিধা বা মঙ্গলের মুখ চাহিযা নিজেদের উদ্ধৃঙ্খল প্রকৃতি ও মন্দ অভ্যাস সংশোধন করিতে বাধ্য নন,–তা, তাহাতে সৃষ্টি রসাতলেই যাক, আর সৃষ্টিকৰ্ত্ত কাবাগারে, দ্বীপান্তরে যেখানে খুশী শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া থাকুন, কোন ক্ষতি নাই – কিন্তু বসুন্ধরাব অধমাধ্যম জীব মেয়ে-জাতটার প্রত্যেক জনকে যে এক একটি স্বেচ্ছাচারীর ছন্দ মাত্রা প্রকরণ অনুসারে, ঠিক মাপা মিলাইয়া নির্দিষ্ট ছাচে স্বতন্ত্র ভাবে গড়িয়া উঠিতে হইবে, সে বিধান অবশ্য প্রতিপাল্য, বেচারা অপেরা চুপ কবিয়া যতই সহিতে লাগিল, তাহার অন্তঃকরণ ততই বিদ্ৰোহী হইয়া উঠিতে লাগিল।
[ঘ] পুরুষ মানুষের চটি জুতাব স্থানটা যেখানে, বিবাহিতা স্ত্রীর স্থান যে তাহার ঢ়েব নীচে.
