অপেরার সবই অপরাধ: সে কিছুটা লেখাপড়া জানে, এটা তার অপরাধ: সে একটু পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকতে চায়, এও তার অপরাধ। তার স্বামী লেখাপড়া সম্পর্কে পোষে এমন শ্ৰদ্ধাবোধ : ‘মেয়ে মানুষের লেখাপড়া শেখা! দুচক্ষে যা দেখতে পারি নে, তাই জুটেছে। ঘরে ৪. জুতিয়ে আমি মুখ ছিড়ে দিতে পারি!’ সে বিশ্বাস করে, ‘যে মেয়ে মানুষ লেখাপড়া শিখেছে, তার কি ভদ্রস্থ আছে? সে ত বেশ্য!’ সে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নও থাকতে পারবে না, কেননা তাও নারীর অপরাধ। শৈলবালা প্রশ্ন করেছেন, ‘হিন্দুসমাজের কোন শাস্ত্রের কোন খানে এক জায়গায় বুঝি লেখা আছে, এমনতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ‘বাই’ যে মেয়েমানুষের থাকে, তাহারা নাকি নিতান্ত শীঘই আধঃপাতে যায়!’। তার জীবনই অপরাধ, তাই তার প্রাপ্য নিরন্তর শাস্তি; কিন্তু নিরুপায় সে! হতভাগ্য বাংলা দেশের ভদ্ৰগৃহস্থ গৃহের, হতভাগিনী বধু সে! গুরুজনের সম্মান লঙ্ঘনের অপরাধ-আশঙ্কা তাহার পায়ে পায়ে!–মিথ্যা সাক্ষ্য ও অন্যায় প্রমাণের জোরে, বিনা অপরাধে সহস্ৰ দণ্ড ভোগ করিতে হইলেও, নিজের নির্দেষিতা সম্বন্ধে কোন কৈফিয়ৎ তাহার মুখ ফুটিয়া উচ্চারণ করিবার অধিকার নাই,–তাহা হইলেই সৰ্ব্বনাশ! জাতিনাশের চেয়েও বেশী অপরাধের দায়ে তাকে পড়িতে হইবে! ইহাই আমাদের বাংলা দেশের ভদ্ৰগৃহস্থ গৃহের গাৰ্হস্থ্যবিধি! বাংলা দেশের অজ্ঞ বিজ্ঞ সকলেই একটা সুমহান মোটা নীতি শিখিয়াছে, –‘হলুদ জব্দ শিলে আর বউ জব্দ কীলে’।’
অপেরার, সমস্ত নির্যাতিত নারীর মতোই, প্রতিবাদের অধিকার নেই; এমনকি অধিকাব নেই। চোখের জলের; কেহ আসিয়া দেখিয়া ফেলে, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া ফেলিল। ছিঃ, একি চপলতা করিতেছে? স্বামীর অসদ্ব্যবহারইহাই যে তাহার প্রাক্তন! এ কৰ্ম্মভোগ নারী-জীবনের কৰ্ত্তব্য বলিয়া শান্ত সহিষ্ণু ভাবে বহন করিতে হইবে।’ নারীজীবন পেয়েছে সে জীবনের বদলে পীড়ন উপভোগের জন্যে, তাই পীড়নভোগই তার পুণ্য। অপেরা মৰ্ম্মকামী নয়, পীড়িত হয়ে সে কোনো সুখ পায় না; অন্য সমস্ত নারীর মতো পীড়ন ভোগ করাই তার প্রতিবাদ। তার ভেতরটা যখন গর্জন ক’য়ে ওঠে, তখনও তাকে থাকতে হয় নিঃশব্দ নারী; অপেরার স্তব্ধ-ব্যথাহত নারীত্ব দৃপ্ত-অভিমানে অন্তরের মধ্যে গৰ্জ্জিয়া উঠিল,-কিন্তু সেটা প্ৰকাশ করিবার অধিকাব্য তাহার নাই! তাহা হইলেই না কি-স্বামীর গুরু-সম্মানকে লঘু করিয়া দেওয়ার পাপে পড়িতে হইবে!’ পীড়ন সহ্য করতে একদিন সে কৃপান্তরিত হয়ে যায় : ‘এখন কাদিয়া হাল্কা হইতে তাহার প্রবৃত্তি হয় না, লজ্জা করে রাগও হয়!’ এটা প্রতিবাদের বিপরীত রূপ, পীড়ন ভোগ করেই সে জানায় তার প্রতিবাদ।
শৈলবালা পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র অমানবিক জন্তুরূপে, যাদের কাজ নারীপীড়ন :
‘সংসাবের শক্তিমান, স্বাৰ্থপর, নিষ্ঠুর, দাম্ভিক, সুখ-সম্ভোগ-বিলাসী, মহার্যক্ত পুরুষগুলিব ফরমাস অনুসারে সৃষ্টিকে নিখুঁত সুন্দর রূপে গড়িয তোলা বিধাতার শক্তিতে কুলাইয়া উঠে নাই। কাযেই সে-হেন বিশিষ্টগুণ সম্পন্ন প্রবল শক্তিমান পুরুষেরা যখন তাঁহাদের ইচ্ছা অভিরুচির ক্রীতদাসী দুৰ্ব্বল প্রাণীগুলিকে, তাহাদের মত যথেচ্ছাচার সহিবার পক্ষে একান্ত অযোগ্য-অলস, নিজীব, অথবা বিদ্রোহীভাবাপন্ন হইতে দেখেন, তখন তাহারা বিধাতার মুণ্ড ভোজনে উদ্যত হন! স্বেচ্ছাচারী পুরুষ তাহারা–তাহারা কি বিধাতাবে স্বাধীনতা সহ্য করিতে পারেন? তাই তাহারা বিধির বিধান উল্টাইয়া দিবার জন্য অপরূপ বিধানের সৃষ্টি করেন! আঁহাদের ফরমাসী মাপের অযোগ্য যে জন একান্ত নিরুপায় ভাবে তাঁহাদের করায়ত্ত হইয়া পড়ে—সেটাকে চাবকাইয়া দুরন্ত করিবার জন্য তাহাবা অমানুষিক শক্তিতে বন-মানুষী প্রতিভা দেখাইবার জন্য কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন।‘
পুরুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এখানে শৈলবালা প্রকাশ করেছেন তীব্রতম। ঘৃণা; পুরুষ স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, যে-বিধাতার বিধানকেও বদলে দেয় নারীপীড়নের জন্যে। নারী কী ক’রে এর প্রতিবাদ করবে, যেখানে সব কিছুই নারীর বিপক্ষে? শৈলবালা এটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :
‘বাঙ্গালাব পল্লীগৃহে অকাটমুৰ্থ ভদ্রনামের ইতর শ্রেণীর স্বামীস্ত্রীর বিবাদে মারধোর গালমন্দের পর এমনই ভাবে বাড়ী হইতে খেদাইয়া দিবার প্রথা প্রচলিত আছে বটে, তবে সেটা–সে শ্রেণীর মূৰ্থি-ইতর স্বামীদেব পক্ষেও শোভনীয়-স্ত্রীদের পক্ষেও সহনীয়! স্বামীদের এই অত্যাচার সমর্থনাৰ্থে, কোন শাস্ত্ৰ হইতে নাকি সার-সঙ্কলন করিয়া, মূর্থে নয়, অনেক বিদ্বানেও নাকি প্রবল বিজ্ঞতা সহ যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন যে, স্বামী সহস্ৰ অন্যায় করুন। কিন্তু স্ত্রী যদি তাহার বিকরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ কবে, তবে পবিজন্মে তাহাকে কুকুরীব গর্ভে জন্মগ্রহণ কবিতে হইবে। ইহার পব মুর্থ অধম, শাস্ত্ৰজ্ঞানহীন, তৃণাদপি তুচ্ছ নারী জাতি কোন সাহসে কথা কহিবে? পৃথিবীতে জন্মগ্রহণই যাহাদেব একটা মহৎ অপবাধ বলিয়া গণ্য-সূতিকাগাব হইতে মৃত্যুকামনাই যাহাদের আত্মীয স্বজনের কৰ্ত্তব্য, সে-হেন ‘মেযেগুলা’ যে দুনিয়ার বাজাবে কোন স্পৰ্দ্ধায় বাঁচিয়া থাকে, ইহাই ত একটা ভয়ানক আশ্চর্য ব্যাপার!’
