শৈলবালা ঘোষজায়ার জন্ম-অপরাধী নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এক অসামান্য, সম্ভবত বাঙলা ভাষায় অনন্য, উপন্যাস। নামকরণ থেকে শেষ পংক্তি পর্যন্ত এতে লিপিবদ্ধ হয়েছে পিতৃতন্ত্রের হাতে নারীর নিপীড়িত হওয়ার শোচনীয় উপাখ্যান। শৈলবালার আর কোনো বই আমি পড়ি নি, তিনি প্রথাগত না প্ৰথাবিরোধী ছিলেন তাও জানি না, জানি না। নারীমক্তির বাণীতে তিনি দীক্ষিত ছিলেন। কিনা, কিন্তু জন্ম-অপরাধীতে নারীজীবনের যে-মৰ্মস্পর্শ রূপ তিনি এঁকেছেন, তা এটিকে হয়তো বাঙলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ নারীবাদী উপন্যাসে পরিণত করেছে। তিনি বিদ্ৰোহ বা প্রতিবাদের রূপ আঁকেন নি, নারীমুক্তির কৃত্রিম কৌশল উদ্ভাবন করেন নি, যেমন করেছেন বেগম রোকেয়া ও শান্তা দেবী; তিনি লিখেছেন নারীর অবিরাম পীড়িত দণ্ডিত জীবনী। এ-পীড়িত রূপ কাজ করে কল্পিত বিদ্রোহী রূপের থেকে অনেক তীব্ৰ মৰ্মস্পশীভাবে। জন্ম-অপরাধী নামটিই প্রগাঢ় তাৎপর্যপূর্ণ, তা নির্মমভাবে তুলে ধরে পিতৃতন্ত্রে নারীর অস্তিত্ত্বের বিভীষিকা। শৈলবালা উপস্থাপিত করেছেন পীড়ন আর পীড়নের রূপ, যেনো পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর যতো পীড়ন করেছে তা একযোগে ভোগ করেছে তার নায়িকা অপেরা। অপেরাকে তিনি ক’রে তুলেছেন পীড়িত নির্যাতিত সমগ্র বঙ্গনারীর আদিরূপ। তিনি ছক ভাঙেন নি, ছকের মধ্যে রেখেই পীড়নের মধ্য দিয়ে ভেঙে দিয়েছেন নারী-ছকটি। শৈলবালা ঘোষজায়ার নায়িকা অপেরার জন্ম-অপরাধ দুটি : প্ৰথম অপরাধ সে নারী, দ্বিতীয় অপরাধ সে দরিদ্র ঘরের অনাথ মেয়ে। তার বিয়ে হয়েছিলো প্রকৌশলী বিনোদলালের সাথে, তবে তার স্বামী এক হিংস্ৰ পাষণ্ড। অপেরা বিদ্রোহী নয়, সে পুরুষতন্ত্রের ছক মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে চেয়েছে; কিন্তু তাকে বাচতে দেয়া হয় নি। তাই সে মনে দাগ কাটে প্রতিবাদীর থেকে অনেক বেশি, তার শোচনীয় জীবনই হয়ে ওঠে এক নিরন্তর নিঃশব্দ বিদ্রোহ { ‘সম্পূর্ণ নির্দোষ হইয়া সহস্র অপমান তিরস্কার সহিয়াও সে উদ্ধতভাবে কখনও প্রতিবাদ করিত না; সে চেয়েছে শুধু একটু বেঁচে থাকতে। তার পিতামাতা নেই, তবে বোন ও ভগ্নিপতি তাকে স্নেহেই পালন করে, এবং প্রথাগতভাবে সৎপাত্রে দানও করে। কিন্তু বিয়ের পরই তার জীবন হয়ে ওঠে নরক। সে জীবন যাপন করেছে শুধু বাল্যকালে : ‘এক বছর বয়সে মা ও চার বছর বয়সে তাহার বাবা মারা গিয়াছেন।…একটুখানি জ্ঞান হইতেই বই শ্লেট বণীলে করিয়া গাড়ী চড়িয়া স্কুলে যাতায়াত-বছর বছর ফাষ্ট হইয়া ক্লাশে ওঠার তীব্র আনন্দ উত্তেজনা! এমন করিয়া কোন দিক দিয়া কয় বছর কাটিয়া যাহঁক?:র পর যখন থার্ড ক্লাশের সীমা ডিঙ্গাইয়া সেকেণ্ড ক্লাশে উঠিল, তখন হঠাৎ তাহার স্কুল যাওয়া বন্ধ হইল. সূৰ্য্য-চন্দ্ৰ-যম-বরুণ-বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী যুবকের পকীত্ব পদে সমাক্কািঢ় হইয়া রাচিতে চলিয়া আসিল।’ সে বইশ্রেট হাতে ইস্কুলে যেতো, বছর বছর শ্রেণীতে প্রথম হতো, পুরুষ হ’লে তার জীবন হতো সাফল্যে পরিপূর্ণ, কিন্তু তার অপরাধ সে নারী। তাই তার জীবন সম্পূর্ণ ব্যৰ্থ। শৈলবালা পাতায় পাতায় শ্লেষ করেছেন পুরুষ, ঈশ্বর, ধর্মকে–সমগ্র পুরুষতন্ত্রকে; কথায় কথায় ব্যবহার করেছেন পরিহাস সূচক বিস্ময়চিহ্ন, যেমন এখানে অপেরার বরটিকে পরিহাস করেছেন ‘সূৰ্য্য-চন্দ্ৰ-যম-বরুণ-স্বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী’ যুবক বলে। বিয়ের পর সম্ভাবনাময় কিশোরীটির জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় তার জীবনই। তার জীবনের নাম পীড়ন।
পিতৃতন্ত্রে নারীর কোনো সম্মান নেই, অপেরারও কোনো সম্মান নেই শ্বশুরবাড়িতে : ‘অপেরা খুব ভাল করিয়াই জানে, এ বাড়ীতে তাহার সম্মানের মূল্য কতটুকু!— অতএব নিম্বফল মনস্তাপ বিসজ্জন দিয়া সমস্ত অন্যায় অপমান নিঃশব্দে মাথায় তুলিয়া লইয়া, শ্ৰান্ত ক্লান্ত কুটুম্ব-সন্তানকে সাদর শিষ্টাচার জানাইয়া–শ্বশুরবাড়ীর সম্মান বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য একটা বিপদের দায় ঘাড়ে তুলিয়া লইতে হইবে।’ শ্বশুরবাড়িতে তার সম্মান নেই, কিন্তু তার দায়িত্ব শ্বশুরবাড়ির সম্মান রাখা। অপেরার স্বামী শিক্ষিত পাষণ্ড, ধর্ষকামী; তার কাজ অপেরারকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা; যেমন, ‘দূর হয়ে যাও–স্বেচ্ছাচারিণী স্ত্রীলোক!’–বলিয়া বিনোদ সক্রোধে অপেরার বা পাজরে সজোরে কনুইয়ের গুতা মারিলেন। অপেরা ছিটকাইয়া গিয়া মেঝের উপর পড়িল।’ অপেরা এ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কী করতে পারে? সে প্রতিবাদ করবে? সে যে-প্ৰতিবাদ জানায়, তা পিতৃতন্ত্রের জন্মকাল থেকে জানিয়ে এসেছে নারী : মুহূৰ্ত্তে তাহার শান্ত নম্র মুখমণ্ডলে দৃপ্ত-বিদ্রোহের বিদ্যুদগ্নি ঝলসিয়া উঠিল,–কিন্তু সে কেবল মুহূৰ্ত্তের জন্যই! পরীক্ষণেই সংযত হইয়া নিঃশব্দে বাহিরে চলিয়া আসিল।’ শৈলবালা নারীর অব্যক্ত বিদ্রোহের আবেগ সকাতর ভাষায় প্ৰকাশ করেছেন : ‘হায় গো বিধাতা, তোমার সুপবিত্র বিধানের নিকট সশ্রদ্ধ সম্মানে মাথা নোয়াইয়া হাসিমুখে যেখানে আত্মোৎসর্গ করিয়া চলাই নারীহািদয়ের স্বভাব-ধৰ্ম্ম-সেখানে কেনই যে এমন অস্বাভাবিক অধৰ্ম্মের উত্তেজনায় বৰ্ব্বর নৃশংসতা জাগিয়া ওঠে, সে প্রশ্নের উত্তর তুমিই জান নারায়ণ!’ বিনোদলাল আনন্দ পায় স্ত্রীনির্যাতনে; যেমন, ‘আমনি তিনি হঠাৎ বিছানা ছাড়িয়া লাফাইয়া পড়িয়া, চক্ষের নিমেষে মেঝে হইতে একপাটি পম্পী-সুতুলিয়া লইয়া, বিনা বাক্যে অপেরার কর্ণমূলে সশব্দে ফটাস করিয়া বসাইয়া দিলেন।’ বিনোদলাল পাষণ্ড, কিন্তু সে পুরুষ ও সম্মানিত: তাই লেখক তার পাশবিকতা বর্ণনার সময়ও ব্যবহার করেছেন সম্মানসূচক ক্রিয়ারূপ দিলেন; অপেরার কোনো সম্মান নেই, তাই নির্যাতিত হয়ে সে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার জন্যে ক্রিয়ারূপ হচ্ছে সম্মানহীন ‘আসিল। অপেরার সবই অপরাধ; অপেরা বাপের বাড়ি গেছে, তাই তার স্বামীর কথা হচ্ছে, তার মত স্ত্রীর পাপের উপযুক্ত প্ৰায়শ্চিত্ত হচ্ছে, তাকে খুন করে ফেলা।’ শুধু তার স্বামী নয়, তার শ্বশুরবাড়ির অন্য পুরুষেরাও সমান হিংস্ৰ: তার বটুঠাকুর বলে, ‘আমার পরিবার যদি ওরকম হত, তাহলে আমি তাকে লাথির ওপর লাথি, জুতোব ওপর জুতো, ঝাটার ওপর ঝাটা মারতাম!— লাঠির চোটে ভূত জব্দ, মেযেমানুষ তো কোন ছার! শাসন থাকলে মেয়েমানুষ কখনো অমন স্বেচ্ছাচারিণী হতে পারে!’ পুরুষের যে-হিংস্রতার ছবি এঁকেছেন শৈলবালা, তা পুরুষ সম্পর্কে তার মৌল ধারণার প্রকাশ; তিনি পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র পশুরূপে। নারীপুরুষের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কও পশুবৃত্তি : ‘শুধু পশুবৃত্তির উত্তেজনায় যে ক্ষণিক আকর্ষণ, ক্ষণিক সম্মিলন-তাঁহাই কি দাম্পত্য ধৰ্ম্মের শ্ৰেষ্ঠ সার্থকতা? ধিক, এত বড় সাংঘাতিক প্ৰবঞ্চনা, এত বড় মৰ্ম্মান্তিক লাঞ্ছনা মানুষের জীবনে যে আর নাই!’
