নারীর জন্যে পুরুষ মানদণ্ড স্থির ক’রে রেখেছে, তাকে হ’তে হবে সতীসাধ্বী; মণি স্বামীর জন্যে স্তিাব করে নতুন মানদণ্ড : ‘যে আমার ক্ষমার পাত্ৰ, সে আমার প্রণয়ী আমার স্বামী হইবার যোগ্য নহে; আমার স্বামীতে আমি সুৰ্য্যের মত জ্যোতিষ্মান গৌরবমণি দেখিতে চাই। সংসার যেমনই হীেক, পৃথিবীতে সে আমাকে স্বৰ্গ দেখাইবে, আমি তাহাতে দেবতা পাইব।’ পুরুষ যেমন জন্মজন্মান্তর ধ’রে সতী চায়, মণিও চায় সৎ পুরুষ : ‘আমার স্বামীর বর্তমানটুকু লইয়াই আমি সস্তুষ্ট নহি, অতীতে, বৰ্ত্তমানে ভবিষ্যতে তাহার সমস্ত জীবনে আমি আপনাকে বিরাজিত দেখিতে চাই, তাহার জীবনের কোন ভাগ যে আমাছাড়া ছিল বা তাহার সম্ভাবনা আছে, আমার সৰ্ব্বগ্রাসী প্ৰেমাকাজক্ষা এ চিন্তা সহ্য করিতে পারে না, এ সম্বন্ধে আমার হৃদয় পুরুষের ন্যায়, পুরুষ পত্নীতে যেরূপ অক্ষুন্ন অমর পবিত্ৰতা, অনাদি অনন্ত নিষ্ঠতা চাহেন, আমি তেমন আমার স্বামীব সমস্ত জীবনই আমার বলিযা অনুভব করিতে চাহি৷’ এতোদিন ধরে নারীর কাছে পুরুষ যা চেয়ে এসেছে, মণি তা-ই দাবি করে পুরুষের কাছেঃ দ্বৈতমানদণ্ড লোপ ক’রে দিয়ে সে হয়ে উঠেছে। পুরুষের সমান : ‘আমি কি করিয়া বুঝাইব যে, আমি তাঁহাকে ক্ষমা করিতে পারি, বিবাহ করিতে পারি–তিনি আমার স্বামী হইতে পারেন। কিন্তু আমার হৃদয়ের আদর্শ আকাঙক্ষা তিনি পূর্ণ করিতে পরিবেন। না… রমণীতে এরূপ পৌরুষিক হৃদয়ভাবের কি সহানুভূতি আছে?’ মণি তার হৃদয়ভাবকে ‘পৌরুষিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে, তবে সেও জানে ভাবে কোনো লৈঙ্গিক পার্থক্য নেই; সংস্কৃতিই ওই পার্থক্য সৃষ্টি ক’রে রেখেছে। সে অস্বীকার করেছে। ওই লৈঙ্গিক পার্থক্যটুকু।
মণি নতুন মূল্যবোধসম্পন্ন অভিনব নারী, তার বিচারও অভিনব; তা গভীর সত্যকে বের ক’রে আনে। রমানাথ আত্মপক্ষ সমর্থন ক’রে জানায় সে ইংরেজ নারীটিকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় নি, ওই নারীই তার প্রতি মোহগ্ৰস্ত হয়েছিলো; তাই সে কোনো অপরাধ করে নি। তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সাথে সায় দেয় প্রথাগত সবাই, কিন্তু মণি সায় দিতে পারে নি; সে বরং সহানুভূতি বোধ করেছে। প্রতারিত ইংরেজ নারীটির প্রতি : ‘তিনি যাহা বলিলেন, তাহাতে সেই ইংরাজ-ললনার উপরই বৰ্ত্তমান সমাজপ্রথার দোষ অধিক পৌছায়।. জানি না, এই বিবরণের জন্য সকলে সেই মুগ্ধা অভিযুক্তা রমণীকে কিরূপ দৃষ্টিতে দেখিতেছেন, আমার কিন্তু এ কথায় তাহার উপর বরঞ্চ মমতা হইল এবং অভিযোগীর উপর যে বড় শ্রদ্ধা বাড়িল-তাহাও নহে।’ সে জানে বর্তমান সমাজপ্ৰথা যাকে অপরাধ মনে করে, তা আসলে অপরাধ নয়; আর যাকে অপরাধ মনে করে না, তাই আসলে অপরাধ। নারীর এক ছক হচ্ছে নারী ক্ষমাশীল, তার কাজ পুরুষকে ক্ষমা ক’রে দেবতার পংক্তিতে বসানো। মনি এর বিরোধী : ‘যেন ভালবাসিালে লোকে ন্যায়ান্যায় জ্ঞান পৰ্যন্ত হারাইয়া ফেলে, অন্যায়কে-ণে যেকে পূজা করাই যেন ভালবাসা! আমি তাঁহাকে যেরূপ ভাল লোক মনে করিয়া ভালবাসিয়াছিলাম-তিনি যে তাহা নহেন, সে যেন আমারি দোষী!’ মণি পুরুষের অত্যাচার ও নারীর অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত; যাহারা স্ত্রীলোকের আবদার সহ্য করিতে না পারিয়া খড়গহন্তে তাহার দমন করিয়া থাকেন, মুহূর্ত্তের জন্য যদি কেবল তাঁহারা দিব্যহৃদয় লাভ করিয়া অনুভব করিতে পারেন… তবে সংসারের রূপ এবং স্ত্রীলোকের ভাগ্য যে অনেকটা পরিবৰ্ত্তিত হইত, তাহাতে সন্দেহ নাই!’ সে জানে বিয়ে তাকে করতে হবে, তবে চায় এমন স্বামী, যা পিতৃতন্ত্র তখনো তৈরি করার কথা ভাবে নি; তার জন্ম হয়েছে শুধু মণির মতো নারীবাদীর ভাবনায; ‘যাহাকে একবার স্বামী মনে করিয়াছি–তিনিই আমার স্বামী হইবেন। তাঁহাকে বিবাহ করিব-কিন্তু প্রতারণা করিব না; আমার মনের ভাব খুলিয়া বালব, যদি ইহাতেও তিনি আমাকে বিবাহ করিতে চাহেন, আমি তাহারি। সমস্ত শুনিয়াও অবশ্যই তিনি আমাকে বিবাহ করিবেন, তাহার প্ৰেম আটল আচল, আমি যাহাই হই, তিনি দেবতা, তাহার প্রেমে তিনি পতিত–আমাকে উদ্ধার করিবেন।’ প্রথাগত নারীর যে-বাসনার কোনো অধিকার নেই, মণি তা-ই দাবি করেছে।
মণির একটি সুবিধা হচ্ছে বিয়ে না হ’লেও সে দুৰ্দশায় থাকতো না, বিয়ে না হ’লে তার জীবন বিপন্ন হতো না; তবে তার অবস্থায় থেকেও অধিকাংশ তরুণীই ব্যারিস্টার রমানাথের গলায় মালা দিতে ব্যগ্র হতো, কেননা তারা পিতৃতন্ত্রের বাণীতে দীক্ষিত, এবং শারীরিক সুখের জন্যে তারা দ্বিধাহীনভাবে বিক্রি করতে পারে নিজেদের দেহ। রমানাথ যখন তাকে জানায় যে বিয়ে না হ’লে মণির অসুবিধা হবে, তখন সে প্রত্যাখ্যান করে রমানাথকে; বলে, ‘সুবিধার জন্য আমি বিবাহ করতে চাই নে–আপনার সুখ যখন এর উপর নির্ভর কচ্ছে না–তখন আমি অব্যাহতি প্রার্থনা করি।’ পুরুষ তাকে দয়া ক’রে বিয়ে ক’রে উদ্ধার করবে, এমন উদ্ধার সে চায় না। মৃণালিনী যদিও জানে ‘সুপাত্রে ন্যস্ত হওয়াই কন্যাজীবনের চরম সৌভাগ্য, পরম সার্থকতা’, তবু সে বলতে রাজি হয় নি যে ‘আপনি ভাল বাসুন না বাসুন, তাতে কিছু আসে যায় না, আমার মঙ্গলের জন্যই আমি বিয়ে করতে প্ৰস্তুত।’ রমানাথের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যাব সাথে সে প্রেমে, এবং শেষে বিয়েতে জড়িত হয়, সে-ডাক্তার বিনয়কুমার বিলেতের নারীদের প্রশংসা ক’রে বলেছে, ‘আমার সবচেয়ে ভাল লাগত। সে দেশের মেয়েদের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভর ভাব। দিন দিন সে দেশে স্ত্রীলোকের কার্য্যক্ষেত্র বাড়ছেএমন কি, পলিটিক্সে পৰ্যন্ত তাহারা হস্তক্ষেপ করেছে।’ এটা মণিরও ভালো লাগে, সেও চায় নারীকে ঘর থেকে বাইরে যেতে দেখতে। স্মরণ করতে পারি যে কংগ্রেসের অধিবেশনে যে-বাঙালি নারী প্রথম অংশ নিয়েছিলেন, তিনি মণির স্রষ্টা বা মূলসত্তা স্বর্ণকুমারী দেবী। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে এক সময় যে মণি তার বাবাকে চিঠি লেখে : ‘বাবা আমার বিবাহ করিতে ইচ্ছা নাই..আমি খুব ভাল করিয়া হৃদয় পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিতেছি, বিবাহে আমার সুখ নাই।’ এটা শুধু কথার কথা নয়, আসলে বিয়েতে নারীর কোনো সুখ নেই, যদিও বিয়ে করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প সুখও নেই। তবে তার পিতা তাকে দিয়েছে বাস্তবসম্মত পরামর্শ : ‘আমাদের দেশের যে রকম অবস্থা, অবিবাহিত স্ত্রীলোকের পক্ষেই বরঞ্চ এসব কাজে বাধা বিঘ্ন অধিক।. স্ত্রীলোকের ঐহিক, পারমার্থিক, সকল প্রকার মঙ্গলের জন্যই বিবাহ শ্ৰেষ্ঠ, প্রশস্ত পথ।’ এবং সে মেনে নিয়েছে, ‘আমি মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে দুৰ্ব্বল বঙ্গনারী আজ্ঞাবাৰ্ত্তী দুহিতা। জীবন বিসর্জন দিতে পারি–কিন্তু ইহার পরে বিবাহ সম্বন্ধে দ্বিরুক্তি করা আমার পক্ষে অসম্ভব।’ পরে সে রোমাঞ্চকরভাবে বিয়ে করেছে ডাক্তার বিনয়কুমারকে, এবং উপন্যাসের সুপরিকল্পিত প্লট অনুসারে দেখতে পেয়েছে তার প্রথম প্রেমই অনন্ত প্রেম, ডাক্তার বিনয়কুমারই তার বাল্যপ্রেমিক ছোটু। তবে মণি ভেঙে দিয়েছে কুমারীর প্রথাগত ভাবমূর্তি, সে স্বামীকে দেবতা ব’লে মনে কবে নি, বিয়েতেই নারীজীবনের সার্থকতা ব’লে বিশ্বাস করে নি, এবং বিশ্বাস করে নি পিতৃতান্ত্রিক সতীত্বে।
